পাহাড়ঘেরা এ মায়াবী ক্যানভাসে প্রকৃতি যেন প্রতিদিন তার রূপের ডালি সাজিয়ে বসে। সবুজ অরণ্যের নিবিড় আলিঙ্গনে গড়ে ওঠা এ বিদ্যাপীঠ কেবল শিক্ষা আর গবেষণার চার দেয়াল নয়, এটি এক জীবন্ত প্রাকৃতিক অভয়ারণ্য। যেখানে ছায়া সুনিবিড় বৃক্ষরাজি, মেঘছুঁই পাহাড়, মাতাল হাওয়া আর পাখিদের অবিরাম কিচিরমিচির মিলেমিশে সুর তুলেছে এক অপূর্ব জীবনছন্দের। চবি ক্যাম্পাসের সবুজ বুকে পা রাখলে প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে ছুঁয়ে দেখা যায়। এখানকার প্রতিটি ভোরের আলো যেমন নতুন কোনো গল্পের সূচনা করে, তেমনি প্রতিটি গোধূলিও মেখে থাকে এক চিলতে মন কেমন করা আবেগ। বিশেষ করে ডানায় আলো-ছায়া মেখে পাখিদের ভোরের নীল আকাশে ডানা মেলা আর পড়ন্ত বিকালে চেনা কুটিরে ফিরে আসা এ দুই চিলতে মহাকাব্যিক দৃশ্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে এক অপার্থিব সৌন্দর্যের মঞ্চে রূপান্তর করে।
এখানে ভোরের নীরবতা এক মায়াবী অলংকারে সাজে। সূর্য তার প্রথম কিরণ ছড়ানোর আগেই ক্যাম্পাসের আঙিনা মুড়ে থাকে শীতল চাদরে। কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, আইন অনুষদ, শারীরিক শিক্ষা বিভাগ আর চারপাশের নিঝুম বনানী তখন এক গভীর, শান্ত আবহে মগ্ন থাকে। এ নিস্তব্ধতার বুক চিরেই শুরু হয় পাখিদের নতুন দিনের বন্দনা। গাছের ডালে রাত কাটানো ছোট্ট প্রাণগুলো প্রথমে হালকা ডানার ঝাপটায় আড়মোড়া ভাঙে, তারপর একে একে মেতে ওঠে ভোরের আবাহনে। চারপাশ মুখরিত হয় কলকাকলির মিষ্টি সুরে।
সূর্যদেব পুব আকাশে উঁকি দিতেই শুরু হয় পাখিদের সকালের উড়াল। ঝাঁকে ঝাঁকে ডানা মেলে তারা আকাশের বুকে ভেসে যায় কেউ সোনালি রোদে খাবারের খোঁজে, কেউ দূরের কোনো অচিন সবুজ প্রান্তরে, কেউবা পাহাড়ের ঢালে ছড়িয়ে থাকা আদিম প্রকৃতির কোলে। ভোরের এ উড্ডয়ন যেন এক নীরব পাতার ওপর লেখা জলছাপের সংগীত, যেখানে প্রতিটি ডানার ঝাপটানি নতুন এক আশার দিনের ঘোষণা দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যখন ক্লাসের উদ্দেশ্যে কিংবা হোস্টেলের সীমানা পেরিয়ে বের হন, প্রকৃতির এ অকৃত্রিম আলপনা দেখে মুহূর্তেই তাদের চোখ জুড়িয়ে যায়। এক পশলা ভালোলাগা মনকে ছুঁয়ে যায় প্রতিদিন।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় রূপ নেয় এক চঞ্চল, প্রাণবন্ত শিক্ষাঙ্গনে। ক্লাস, লাইব্রেরির নিরিবিলি পাতা, গবেষণার গম্ভীর টেবিল আর প্রিয় চত্বরের আড্ডায় মেতে ওঠে হাজারো তরুণ প্রাণ। কিন্তু এ কোলাহলের আড়ালেও প্রকৃতি তার আপন খেয়ালে মগ্ন থাকে। বিশাল সব মহীরুহ আর পাহাড়ি কন্দরে পাখিদের মৃদু গুঞ্জন সবসময়ই টের পাওয়া যায়। তবে তারা যেন তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় আর জাঁকজমকপূর্ণ উৎসবটি জমিয়ে রাখে কেবল দিনের শেষ প্রহরটির জন্য।
পশ্চিম আকাশে যখন দিনমণি হেলে পড়ে, গোধূলির আবির ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, তখনই বদলে যায় চবির চেনা দৃশ্যপট। শুরু হয় এক অদ্ভুত, চেনা আকুলতায় ঘরে ফেরার পালা। ক্লান্তি মেখে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে থাকা পাখিরা যেন কোনো এক অলক্ষ্য, অদৃশ্য সংকেতে মেতে ওঠে আপন কুটিরে ফেরার ব্যাকুলতায়।
কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, আইন অনুষদ ও শারীরিক শিক্ষা বিভাগের মাঝের সবুজ চত্বর আর শুভ্র মসজিদের চারপাশের পুরনো, পাতাঝরা গাছগুলো তখন হয়ে ওঠে পাখিদের মিলনমেলা। প্রথমে দু-একটি একলা পাখি, তারপর আকাশ কালো করে দল বেঁধে ধেয়ে আসে হাজারো ডানার ঝাঁক। ডানা ঝাপটানোর শব্দ, কিচিরমিচির গানের জোয়ার আর আগেভাগে ডালে বসার মিষ্টি প্রতিযোগিতা মিলিয়ে পুরো আকাশ যেন এক জীবন্ত কোরাসে রূপ নেয়। সূর্য যত তলিয়ে যায়, প্রকৃতির এ সুরের তীব্রতা ততই হৃদয়ে এসে দোলা দেয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ক্যাম্পাসে এখন পর্যন্ত ২৩১ প্রজাতির পাখির উপস্থিতি রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে আবাসিক, পরিযায়ী ও দুর্লভ আগন্তুক সব ধরনের পাখিই রয়েছে। দোয়েল, বুলবুলি, শালিক, মাছরাঙা, কোকিল, টিয়া, ধনেশ, কাঠঠোকরা, পেঁচা, ঈগল, বাজ, ফিঙে, বাবুই, ঘুঘু, চড়ুই, বনমুরগি, হরিয়াল, বক, পানকৌড়ি, মৌটুসি, ভিমরাজ, নীলকণ্ঠ, খঞ্জন ও সাদা বুক মাছরাঙাসহ নানা প্রজাতির পাখির বিচরণে মুখর থাকে ক্যাম্পাস। শীত মৌসুমে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত পরিযায়ী পাখিও এখানে আশ্রয় নেয়, যা ক্যাম্পাসের পাখি বৈচিত্র্যকে আরো সমৃদ্ধ করে। দেশের মোট পাখি বৈচিত্র্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের আবাসস্থল হওয়ায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে বাংলাদেশের অন্যতম ‘বার্ড হটস্পট’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এ গোধূলিলগ্নে আইন অনুষদ আর খেলার মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা চঞ্চল চোখগুলো হঠাৎ থমকে যায় আকাশের পানে। কেউ ক্লাস শেষে ক্লান্ত পায়ে একটু জিরিয়ে নিতে দাঁড়ান, কেউবা পথ চলতে চলতে মায়ায় পড়ে থমকে যান, আবার কেউ কেউ শুধু এ সুরের মায়াজালে জড়াতে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। পাখিদের এ ঘরে ফেরার আকুলতা যেন মানুষের যান্ত্রিক ও ব্যস্ত জীবনের মাঝেও এক নিমিষের পরম প্রশান্তি এনে দেয়।
পাখিদের এ সান্ধ্যকালীন জলসা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আব্দুল মালেক ইমাদ মুগ্ধতার সুরে বলেন, রোজ সন্ধ্যায় গাছগুলোর ডালে নানা রঙের পাখির কিচিরমিচির শুনি। খুব বেশি তাড়া না থাকলে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি। পাখিদের এ কলকাকলি আমাকে ভীষণ মুগ্ধ করে। যেকোনো প্রকৃতিপ্রেমীর জন্য এ দৃশ্য সত্যিই আনন্দের।’
পাখিদের এ নিত্যদিনের আসা-যাওয়া কেবল এক চিলতে বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, এটি চবি ক্যাম্পাসের পরিবেশগত ভারসাম্যের এক চিরন্তন ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। যুগের পর যুগ ধরে ক্যাম্পাসের এ প্রাচীন ও পরমায়ু পাওয়া গাছগুলো পাখিদের বুক পেতে নিরাপদ আশ্রয় দিয়ে আসছে। আর পাখিরাও পরম আস্থায় এ সবুজ মহীরুহগুলোকেই বেছে নিয়েছে নিজেদের চিরকালের নিবাস হিসেবে।
পড়ন্ত বিকালের পর আঁধার যখন ডানা মেলে, সূর্য যখন পুরোপুরি দিগন্তের ওপারে হারিয়ে যায়, তখন ধীরে ধীরে শান্ত সুশীতল হয়ে আসে পুরো ক্যাম্পাস। কিন্তু গাছের ডালে তখনো চলতে থাকে শেষ মুহূর্তের ফিসফাঁস, যেন সারাদিনের গল্প শেষে নিজেদের ভেতরের শেষ ভালোবাসার কথোপকথন। একসময় সেই মৃদু গুঞ্জনও রাতের গহিনে মিলিয়ে যায়, নেমে আসে এক অতল নীরবতা।
এ নীরবতা শেষের নয়, বরং এর বুকেই লুকিয়ে থাকে আরেকটি নতুন ভোরের অফুরান প্রতীক্ষা।