প্রযুক্তির যুগে এসব প্রশ্নের উত্তর এখন মিলবে হাতের মুঠোয়, মাত্র একটি ক্লিকেই। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) একদল তরুণ শিক্ষার্থী প্রকৃতির সঙ্গে প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটিয়ে তৈরি করেছেন ‘বায়োব্লিটজ’ (BioBlitz) নামের একটি বিশেষ অ্যাপ। এর লক্ষ্য—ক্যাম্পাসের উদ্ভিদ থেকে পাখি, সব প্রাণীর তথ্য এক সুতোয় গেঁথে একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল জীববৈচিত্র্য ডেটাবেজ তৈরি করা। ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগটি নিয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবাদী সংগঠন ‘লাইফ, নেচার অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট রিসার্চ ক্লাব’ (এলআইএনইআরসি)। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে তরুণদের সম্পৃক্ত করার উদ্দেশ্যে তাদের এ আয়োজন।
আয়োজকরা জানান, এটি মূলত একটি প্রযুক্তিনির্ভর নাগরিক বিজ্ঞান উদ্যোগ। প্রাথমিকভাবে নির্দিষ্টসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে এর কার্যক্রম শুরু হলেও ভবিষ্যতে অ্যাপটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। তখন সাধারণ শিক্ষার্থী, গবেষক, প্রকৃতিপ্রেমী ও পরিবেশকর্মীরা যে কেউ ক্যাম্পাসে থাকা বিভিন্ন উদ্ভিদ, পাখি, কীটপতঙ্গ, সরীসৃপ এবং অন্যান্য প্রাণীর তথ্য ও ছবি এ অ্যাপে যুক্ত করতে পারবেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববৈচিত্র্য গবেষণার একটি সমৃদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডারে পরিণত হবে।
বিশ্ব জীববৈচিত্র্য দিবস উপলক্ষে গত ২০ মে অনুষ্ঠিত হয় এ ‘বায়োব্লিটজ’ কার্যক্রমের মূল জরিপ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৯০ জন শিক্ষার্থী এ ডিজিটাল প্রকৃতি শুমারিতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীদের ১৫টি বিশেষ দলে ভাগ করা হয়, যার প্রতিটিতে ছিলেন পাঁচজন করে সদস্য।
সকাল ১০টা থেকে বেলা ৩টা—তীব্র রোদ উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীরা দলবেঁধে চষে বেড়িয়েছেন ক্যাম্পাসের এমাথা-ওমাথা। প্যারিস রোড, বোটানিক্যাল গার্ডেন, কিংবা চারুকলা চত্বর ঘুরে ঘুরে তারা সংগ্রহ করেছেন বিভিন্ন গাছপালা, পাখি ও প্রাণীর নিখুঁত তথ্য ও আলোকচিত্র। আর সেই সংগৃহীত তথ্য ও ছবি সঙ্গে সঙ্গেই আপলোড করা হয়েছে ‘বায়োব্লিটজ’ অ্যাপের ডেটাবেজে। তরুণদের এ প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি করে।
মাঠপর্যায়ের এ জরিপ শেষে ২১ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সেমিনার ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং গবেষণাভিত্তিক তথ্য সংগ্রহের গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সংগৃহীত তথ্য, পর্যবেক্ষণ ও আলোকচিত্রের ওপর ভিত্তি করে সেরা দল ও সেরা আলোকচিত্র নির্বাচন করা হয়। মাঠপর্যায়ে কঠোর পরিশ্রমের স্বীকৃতিস্বরূপ বিজয়ী দলগুলোর হাতে তুলে দেয়া হয় আকর্ষণীয় পুরস্কার। পুরো আয়োজনের মধ্যে নির্বাচিত সেরা ছবিটিকে দেয়া হয় প্রথম পুরস্কার, যা শিক্ষার্থীদের প্রকৃতিচর্চায় আরো বেশি অনুপ্রাণিত করেছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এলআইএনইআরসি সভাপতি মো. আব্দুল বারী। সেমিনারে অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানি বিভাগের প্রফেসর ড. বিধান চন্দ্র দাশ জুওলজি, প্রফেসর হাসানুর রহমান, পরিবেশবিদ মাহাবুবুল ইসলাম পলাশ ও বিভাগের সভাপতি প্রফেসর ড. সাবরিনা নাজ।
বক্তারা এ তরুণদের উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান যুগে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ছাড়া পরিবেশ রক্ষা ও গবেষণা এগিয়ে নেয়া অসম্ভব। প্রযুক্তিনির্ভর এ ‘বায়োব্লিটজ’ অ্যাপটি ভবিষ্যতে রাবির পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণে এক মাইলফলক হয়ে থাকবে।