জীবন এক দীর্ঘ ম্যারাথনের মতো—যেখানে গতি নয়, অবিচলতাই শেষ কথা। এ সত্যকে নিজের পায়ে মেপে প্রমাণ করেছেন বাংলাদেশী শিক্ষাবিদ ড. চৌধুরী রাশাদ শাবাব। সম্প্রতি তিনি ১০০তম আনুষ্ঠানিক ম্যারাথন সম্পন্ন করেছেন। ক্রীড়া জগতে অবদানের পাশাপাশি রাশাদ শাবাব এগিয়ে নিয়েছেন তার একাডেমিক জীবনও। তিনি বর্তমানে যুক্তরাজ্যের বিশ্বখ্যাত সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্কুলের অ্যাসোসিয়েট ডিন (শিক্ষা ও শিক্ষার্থী বিষয়ক) হিসেবে কর্মরত আছেন।
খেলাধুলা ও একাডেমিক জীবন যে একসঙ্গে কতটা সুন্দরভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব ড. রাশাদের গল্প তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ম্যারাথনের এ সেঞ্চুরি হিসাবটি কিন্তু সহজ কোনো সমীকরণ নয়। এখানে কেবল সেসব আনুষ্ঠানিক ম্যারাথনকেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেগুলোর দূরত্ব অন্তত ৪২ দশমিক ২ কিলোমিটার বা তার বেশি এবং যেগুলো জাতীয় অ্যাথলেটিক্স নিয়ন্ত্রক সংস্থা—যুক্তরাজ্যের ‘ইংল্যান্ড অ্যাথলেটিক্স’-এর অনুমোদনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাশাদের এ ম্যারাথনের হিসাব যুক্তরাজ্যের মর্যাদাপূর্ণ ‘১০০ ম্যারাথন ক্লাব’ স্বাধীনভাবে যাচাই ও অনুমোদন করেছে। ক্লাবের নিয়ম অনুযায়ী, আগামী জুলাই মাসে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এ ক্লাবের আজীবন সদস্যপদ লাভ করবেন।
এ গৌরবময় সংখ্যার বাইরে রয়ে গেছে তার আরো প্রায় ডজনখানেক অনানুষ্ঠানিক দৌড়, যেগুলো তিনি কেবল প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে ম্যারাথন দূরত্বে দৌড়েছিলেন। এমনকি যেসব আল্ট্রা-ম্যারাথনের দূরত্ব একাধিক ম্যারাথনের সমান, সেগুলোকে এ তালিকায় কেবল একটি ‘ম্যারাথন’ হিসেবেই গণনা করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, রাশাদ প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে যে ১০০ মাইল (প্রায় ১৬১ কিলোমিটার) দৌড় সম্পন্ন করার ইতিহাস গড়েছিলেন—দূরত্ব প্রায় চার গুণ বেশি হওয়া সত্ত্বেও এ তালিকায় সেটি যুক্ত হয়েছে মাত্র একটি ম্যারাথন হিসেবেই।
আজকের এ আন্তর্জাতিক মানের অ্যাথলেটের দৌড়ানোর গল্পটা কিন্তু কোনো ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড থেকে শুরু হয়নি। যখন তিনি পিএইচডি গবেষণা করছিলেন, তখন তীব্র একাডেমিক চাপ, মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখার এক তাগিদ থেকেই ম্যারাথন দৌড় শুরু করেন।
ড. রাশাদ যখন তার পিএইচডি সফলভাবে শেষ করেন, তখন তার বিভাগের একজন শিক্ষকের মন্তব্য ছিল মনে রাখার মতো। তিনি রাশাদকে বলেছিলেন, তুমি চার বছরে পিএইচডি শেষ করেছ, এ পিএইচডির মাঝে তোমার দুটো সন্তান হয়েছে, তাতেও আমি অতটা ইম্প্রেসড নই। তার চেয়ে অনেক বেশি ইম্প্রেসড হলাম যখন শুনলাম যে তুমি এরি মাঝে ৩৯টা ম্যারাথন দৌড়েছ।
নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে ড. রাশাদ অনুভব করেছেন শিক্ষার্থীদের সুস্থতার জন্য শরীরচর্চার গুরুত্ব কতটা অপরিসীম। আর তাই তিনি সবসময় শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার জন্য অ্যাক্টিভ লাইফস্টাইল বা শরীরচর্চার গুরুত্ব সক্রিয়ভাবে প্রচার করেছেন। ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স বিজনেস স্কুলের ‘ডিরেক্টর অব স্টুডেন্ট এক্সপেরিয়েন্স’ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি পাঁচ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থীর কল্যাণ ও সার্বিক সহায়তার বিষয় অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে দেখভাল করেছেন।
শিক্ষার্থীদের প্রতি তার এ দায়বদ্ধতারই আরেকটি অনন্য উদাহরণ তৈরি হলো তার এ শততম ম্যারাথন উদযাপনে। নিজের এ ঐতিহাসিক অর্জনকে তিনি কেবল নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি; এ ১০০তম ম্যারাথন উপলক্ষে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘হার্ডশিপ ফান্ড’-এর জন্য অর্থ সংগ্রহ করছেন। এই তহবিল থেকে সংগৃহীত অর্থ পরবর্তীতে আর্থিক সংকটে থাকা অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জরুরি সহায়তায় ব্যবহৃত হবে।
ড. চৌধুরী রাশাদ শাবাব বণিক বার্তাকে বলেন, সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি যে সমর্থন ও উৎসাহ পেয়েছিলাম, তা শুধু পড়াশোনার ক্ষেত্রেই নয়, দৌঁড়ের ক্ষেত্রেও আমাকে সফল হতে সাহায্য করেছে। আমার পারিবারিক ও কর্মজীবনকে বদলে দিয়েছে। প্রতিটি চাকরি এবং প্রতিটি পরিবারের নিজস্ব চাপ ও টানাপোড়েন থাকে এবং দৌঁড় আমাকে সেগুলো কার্যকরভাবে সামলাতে সাহায্য করে।
তিনি আরো বলেন, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বড় হয়েছি এবং আমি জানি বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ভালো করার জন্য কতটা কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। আমি বাংলাদেশের প্রতিটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে পড়াশোনার পাশাপাশি ছাত্র ছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের সমর্থনে বিনিয়োগ করতে আহ্বান জানাচ্ছি। এটি একইসাথে মানসিক সুস্থতা এবং আনন্দ দেবে, যা মানুষকে সারাজীবন সফল হতে সাহায্য করতে পারে। দৌড় শুধু আমাকে স্বাস্থ্যবান ও কর্মক্ষমই করেনি, বরং এটি আমাকে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সুখী করেছে। আমার সন্তান ও বাবা, সবাই নিয়মিত দৌড়ায় এবং যে অনুষ্ঠানে আমি আমার ১০০তম ম্যারাথন সম্পন্ন করেছি, সেখানে তারা ৫ কিলোমিটার দৌড় শেষ করেছে।