বিশ্বে তৃতীয় ও এশিয়ায় প্রথম

ইউআইইউ গড়ল এশিয়ার নতুন রোভার ইতিহাস

মরুভূমির লালচে বালি আর রুক্ষ পাথুরে ভূখণ্ড—হুবহু যেন মঙ্গল গ্রহের পিঠ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউটা স্টেটের হ্যাঙ্কসভিলে অবস্থিত ঠিক এমনই এক বৈজ্ঞানিক পরিবেশ ‘মার্স ডেজার্ট রিসার্চ স্টেশন’।

আর এ দুর্গম মঞ্চেই বিশ্বের বাঘা বাঘা সব প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে পেছনে ফেলে লাল-সবুজের পতাকা ওড়াল বাংলাদেশের তরুণরা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘দ্য মার্স সোসাইটি’ আয়োজিত বিশ্বমঞ্চের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ‘ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জ ২০২৬’ প্রতিযোগিতায় বিশ্বমঞ্চে তৃতীয় এবং এশিয়ায় প্রথম স্থান অর্জন করেছে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) মার্স রোভার টিম।

এ অভাবনীয় সাফল্য কেবল বাংলাদেশের জন্যই এক গৌরবময় মাইলফলক নয়, বরং অন-সাইট ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জের ২০ বছরের ইতিহাসে এ প্রথম কোনো এশীয় দল বিশ্বমঞ্চের মর্যাদাপূর্ণ পোডিয়ামে (শীর্ষ তিন) নাম লেখানোর এক অনন্য ও ঐতিহাসিক রেকর্ড গড়ল।

টানা পাঁচবার এশিয়ার সেরা

ইউআইইউর ‘সেন্টার ফর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রোবোটিকস’ এর রোভার দলটি হঠাৎ করেই এ সফলতা পায়নি। এর পেছনে রয়েছে বছরের পর বছর ধরে করা কঠোর সাধনা আর ধারাবাহিকতা। বিগত ২০২২ সাল থেকে শুরু করে ২০২৬ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচবার এ প্রতিযোগিতায় এশিয়ার প্রথম দল হওয়ার গৌরব ধরে রেখেছে ‘ইউআইইউ মার্স রোভার টিম’। তবে এবার তারা ছাড়িয়ে গেছে নিজেদের অতীতের সব রেকর্ডকে।

১১৬ দলের লড়াই

ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জ প্রতিযোগিতার মানদণ্ড কতটা কঠোর, তা বোঝা যায় এর বাছাই প্রক্রিয়া দেখলেই। ২০২৬ সালের এ আসরে প্রাথমিকভাবে সারা বিশ্ব থেকে মোট ১১৬টি বিশ্ববিদ্যালয় দল অংশ নিয়েছিল। কয়েক ধাপের অত্যন্ত কঠিন ও পুঙ্খানুপুঙ্খ মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার পর ইউটার চূড়ান্ত মঞ্চে লড়ার টিকিট পায় মাত্র ৩৮টি দল।

যুক্তরাষ্ট্র, পোল্যান্ড, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, জাপান, মেক্সিকো ও তুরস্কের মতো প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত দেশগুলোর সেরা ৩৮টি দলের এ গ্র্যান্ড ফাইনালে ইউআইইউ মার্স রোভার টিম সর্বমোট ৪০০ দশমিক ৪৪ পয়েন্ট পেয়ে বিশ্বমঞ্চে তৃতীয় স্থান ছিনিয়ে নেয়। এ প্রতিযোগিতায় ৪৬৯ দশমিক ৫৭ পয়েন্ট পেয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি ইউনিভার্সিটি অব এসঅ্যান্ডটি মার্স রোভার ডিজাইন টিম এবং ৪১২ দশমিক ৪১ পয়েন্ট পেয়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ নোভা রোভার। পোডিয়ামে জায়গা করে নেয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের এ টিমটি জিতেছে ‘বেস্ট অটোনামাস সিস্টেম’ (সেরা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা)-এর বিশেষ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

চার কঠিন মিশন

চার দিনব্যাপী চলা এ চূড়ান্ত রাউন্ডে রোভারগুলোর কার্যক্ষমতা ও পরিচালন দক্ষতা পরীক্ষার জন্য বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান, স্বয়ংক্রিয় নেভিগেশন, চরম পরিস্থিতি মোকাবেলার সক্ষমতা এবং ইকুইপমেন্ট সার্ভিসিং—অত্যন্ত জটিল চারটি মিশন নির্ধারণ করা হয়েছিল। বাংলাদেশী তরুণদের তৈরি রোভারটি অত্যন্ত নিখুঁত ও সফলতার সঙ্গে এ চারটি মিশনই সম্পন্ন করে বিচারকদের তাক লাগিয়ে দেয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেকানিক্যাল ডিজাইন ও এমবেডেড সিস্টেমের এক নিখুঁত মেলবন্ধন ছিল এ রোভারে।

নেপথ্যের কারিগর

এ ঐতিহাসিক অর্জনের পেছনে দিন-রাত পরিশ্রম করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একঝাঁক স্বপ্নবাজ শিক্ষার্থী। আর পর্দার আড়ালে থেকে তাদের সার্বিক দিকনির্দেশনা দিয়েছেন একঝাঁক গুণী মেন্টর ও পরামর্শক। টিমটির পরামর্শক হিসেবে ছিলেন ইউআইইউ স্কুল অব সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিন প্রফেসর ড. হাসান সারওয়ার এবং কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের প্রধান ড. সুমন আহমেদ। এছাড়া টিমের মেন্টর হিসেবে ছায়ার মতো পাশে ছিলেন সিএসই বিভাগের প্রভাষক মো. আবিদ হোসাইন।

আরও