যুদ্ধ শেষ হওয়ার আশায় বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের অবসান ও হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়ার লক্ষ্যে একটি কাঠামোগত সমঝোতায় পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান।

এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্ববাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারে বড় উত্থান হয়েছে গতকাল। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪ ডলারের বেশি কমেছে। খবর এপি।

বিনিয়োগকারীরা আশা করছেন, কয়েক মাস ধরে চলা অস্থিরতার পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে। এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে।

যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার খোলার আগেই বাজারের পূর্বাভাস ইতিবাচক ছিল। গতকাল এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ফিউচার বেড়েছে ১ দশমিক ২ শতাংশ। ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ ফিউচার বেড়েছে দশমিক ৯ শতাংশ।

ইউরোপের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোয়ও ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়। জার্মানির ডিএএক্স সূচক ১ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ২৪ হাজার ৯৪২ পয়েন্টে পৌঁছায়। ফ্রান্সের সিএসি-৪০ সূচক ১ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ৪৪৪ পয়েন্টে। যুক্তরাজ্যের এফটিএসই-১০০ সূচকও দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের বড় অংশ এ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে সমঝোতার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের অনুমতিও দেন।

অন্যদিকে ইরানও সমঝোতার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে দেশটি জানিয়েছে, আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরের আগে বাস্তবায়ন শুরু হবে না। পাকিস্তান জানিয়েছে, সমঝোতা স্মারকে আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর হওয়ার কথা।

যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আগামী ৬০ দিন আলোচনা চলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সমঝোতার খবরে সবচেয়ে বড় প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে জ্বালানি বাজারে। গতকাল প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪ ডলার ৩৭ সেন্ট কমে ৮২ ডলার ৯৬ সেন্টে নেমে আসে। একই সময় যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক অপরিশোধিত তেলের দাম ৪ ডলার ৫৩ সেন্ট কমে ৮০ ডলার ৩৫ সেন্টে দাঁড়ায়।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের কারণে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গিয়েছিল। ফলে পেট্রল, পরিবহন ও বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে শুরু করে। তবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও তেলের বাজার পুরোপুরি স্থিতিশীল হতে সময় লাগবে।

এসপিআই অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের বিশ্লেষক স্টিফেন ইনেস বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়া বাজারের জন্য স্বস্তির খবর। তবে শুধু ঘোষণা নয়, চুক্তির বাস্তবায়নও গুরুত্বপূর্ণ। বাজার এখনো পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারেনি।’

তবু সামগ্রিকভাবে খবরটি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি করেছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে এশিয়ার শেয়ারবাজারে। গতকাল জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক ৫ শতাংশ বেড়ে নতুন রেকর্ড গড়েছে। সূচকটি ৬৯ হাজার ৩১৭ পয়েন্টে পৌঁছেছে। এ সময় বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতের শেয়ারগুলোর চাহিদা বেড়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ার কেনায় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেশি ছিল। গত এক বছরে জাপানের শেয়ারবাজারে বড় উত্থানের অন্যতম কারণও এআই খাত।

মনেক্সের প্রধান কৌশলবিদ তাকাশি হিরোকি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমার সম্ভাবনা ও তেলের দাম হ্রাস বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়িয়েছে। বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও বাজারে সক্রিয়ভাবে শেয়ার কিনছেন।’

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গতকাল দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক ৫ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। হংকংয়ের হ্যাংসেং সূচক দশমিক ৫ শতাংশ ও চীনের সাংহাই কম্পোজিট সূচক ১ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে।

এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার এসঅ্যান্ডপি/এএসএক্স ২০০ সূচক ১ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। তাইওয়ানের তাইএক্স সূচক ২ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ভারতের সেনসেক্স সূচক ১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে।

এর আগে গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের বাজারও ইতিবাচক ধারায় লেনদেন শেষ করে। বিশেষ করে মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের শেয়ারবাজারে আত্মপ্রকাশ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করে। লেনদেনের প্রথম দিনই কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ১৯ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। ফলে স্পেসএক্সের বাজারমূল্য প্রায় ২ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।

এদিকে চলতি সপ্তাহে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সিদ্ধান্তের দিকেও নজর রয়েছে বিনিয়োগকারীদের। গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) ও ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সুদহার নিয়ে সিদ্ধান্ত জানাবে। পাশাপাশি আজ জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতি ঘোষণা করবে।

মুদ্রাবাজারেও কিছু পরিবর্তন দেখা গেছে। গতকাল লেনদেনের শুরুতে মার্কিন ডলারের বিপরীতে জাপানি ইয়েনের বিনিময় হার সামান্য কমেছে। অন্যদিকে ইউরোর মূল্য ডলারের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিকভাবে চালু হলে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ কিছুটা কমবে। এতে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, পরিবহন ব্যয় কমতে পারে এবং বৈশ্বিক বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে সহায়তা করবে।

আরও