জিডিপির আকার নিয়ে আবারো বিবিএসের অতিরঞ্জিত তথ্য

বিবিএসের তথ্যে আস্থাহীনতা সরকারের সঠিক নীতিগ্রহণ বাধাগ্রস্ত করছে

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জিডিপির হিসাব প্রকাশ নিয়ে আবারো শুরু হয়েছে পরিচিত বিতর্ক।

সম্প্রতি বিবিএসের প্রকাশিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাময়িক জিডিপির হিসাবে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের আকার ৫০১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং প্রবৃদ্ধির হার দেখানো হয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। দেশে রফতানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি, বেসরকারি ঋণপ্রবাহ ঐতিহাসিক নিম্নে, শিল্প খাতে মন্দা, কারখানা বন্ধ, শ্রমিক ছাঁটাইয়ের মতো বাস্তবতার মধ্যে ঘোষিত এ প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে নানা মহলে।

বিবিএসের পরিসংখ্যানগত ভুল, বিভ্রান্তি এবং সংস্থাটির তথ্য নিয়ে অবিশ্বাস নতুন নয়। এ নিয়ে অতীতেও বণিক বার্তা ধারাবাহিকভাবে দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এ সংকট বরাবরই দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি বড় কাঠামোগত প্রতিবন্ধক। বিষয়টি অনুধাবনের পরও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সংস্থাটির সংস্কারে উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের জিডিপি পরিসংখ্যানকে ‘সি’ রেটিং দিয়েছে, যা সংস্থাটির দ্বিতীয় সর্বনিম্ন গ্রেড। আইএমএফের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে জিডিপি গণনার পদ্ধতি পুরনো, ‘সাপ্লাই অ্যান্ড ইউজ টেবিল’ হালনাগাদ নেই এবং বার্ষিক জিডিপির তথ্য প্রকাশে গড়ে আট মাস বিলম্ব হয়। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত শ্বেতপত্র কমিটির তদন্তে উঠে এসেছে, ২০০৯-১৯ সালের মধ্যে বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি গড়ে প্রায় ২ দশমিক ৮ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়িয়ে দেখানো হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের ২০২২ সালের প্রতিবেদনেও একই সিদ্ধান্তে আসা হয়, এ সময়ে সরকারি হিসাবে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দাবি করা হলেও প্রকৃত হার ছিল ৪ দশমিক ২ শতাংশ। সিটি ব্যাংক ক্যাপিটাল রিসোর্সেসের বিদ্যুৎ ব্যবহার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপির আকার ছিল প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার। অর্থনীতিবিদদের হিসাবে, কৃত্রিম প্রবৃদ্ধি বাদ দিলে জিডিপির আকার ৩২২ বিলিয়ন ডলারে নামতে পারে। বিবিএস পরিচালিত ‘ব্যবহারকারী সন্তুষ্টি জরিপ ২০২৪’ আরো বিব্রতকর চিত্র উপস্থাপন করেছে। অনেকেই সংস্থাটির ৩৩ দশমিক ১৬ শতাংশ ব্যবহারকারী মূল্যস্ফীতির তথ্যকে নির্ভরযোগ্য মনে করেন না। ২৬ শতাংশ মানুষ ন্যাশনাল অ্যাকাউন্ট পরিসংখ্যান নিয়ে সন্দিহান।

চব্বিশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বিবিএসের এ সংকট অনুধাবন করে অন্তর্বর্তী সরকার পরিসংখ্যান সংস্কারের কথা বলেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সংস্কারের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এক্ষেত্রেও ছিল দ্বিধা, কারণ জিডিপি সংশোধন করলে ঋণ-জিডিপি অনুপাত ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের কাছে বাংলাদেশের ঋণ সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। এ সমস্যা উত্তরাধিকার সূত্রেই পেয়েছে নতুন সরকার। তবে ভুল পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভর করে নীতিনির্ধারণ অনেকাংশে মরীচিকার পেছনে ছোটা। বাজেট প্রণয়ন থেকে শুরু করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা থেকে ঋণ ব্যবস্থাপনাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে জিডিপির সঠিক আকার জানা অপরিহার্য। বিবিএসের তথ্য অবিশ্বাসযোগ্য থাকলে নতুন সরকারের প্রতিটি নীতিগত সিদ্ধান্ত একটি ভুল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে। তাতে বাজেট প্রণয়ন ও নীতিসুবিধা পৌঁছে দেয়ায় সরকারের প্রতিশ্রুতি শতভাগ পূরণ করা কঠিন হয়ে যাবে।

অতিরঞ্জিত পরিসংখ্যানের সবচেয়ে সরাসরি ক্ষতি হয় বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে। রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত, ব্যয়-জিডিপি অনুপাত, ঋণ-জিডিপি অনুপাত—এ সূচকগুলোই বাজেটের কাঠামো নির্ধারণ করে। বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বনিম্ন কর-জিডিপি অনুপাতের দেশ। কিন্তু যদি জিডিপির আকার সংশোধন করা হয় এবং হরটি ছোট হয়, তাহলে কর-জিডিপির আনুষ্ঠানিক হার বাড়বে। কিন্তু আপাত-উন্নতির এ চিত্র আসলে বাস্তবতার প্রতিফলন না হওয়ায় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ও ব্যয় পরিকল্পনা দুটোই অসামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নির্ধারণেও পরিসংখ্যানের প্রভাব সরাসরি। দারিদ্র্যের হার, মাথাপিছু আয়, আয়বৈষম্যের তথ্য যদি বাস্তবের চেয়ে ভালো দেখানো হয়, তাহলে সুবিধাভোগী তালিকা কম হবে। প্রকৃত দরিদ্ররা সুরক্ষা-বলয়ের বাইরে থাকবে। একই সমস্যা দেখা দেয় কর্মসংস্থান পরিসংখ্যানেও। শিল্প-প্রবৃদ্ধি বেশি দেখালে কর্মসংস্থান-ঘাটতির তীব্রতা সরকারি নজর এড়িয়ে যায়। আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের সঙ্গে সম্পর্কেও এ সমস্যা ক্ষতিকর। আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির শর্তগুলো জিডিপি অনুপাতের সঙ্গে যুক্ত। যদি জিডিপির আকার অতিরঞ্জিত হয়, তাহলে একদিকে বেশি ঋণ নেয়ার সুযোগ তৈরি হয়, অন্যদিকে সংস্কারের শর্তগুলো পূরণ হচ্ছে কিনা তার মূল্যায়নও ভুল হয়। এটি দীর্ঘমেয়াদে দেশের আর্থিক স্থায়িত্বের জন্য বিপজ্জনক। বিবিএসের তথ্য গণনার পদ্ধতি ও পরিসংখ্যানগত ভুল বেসরকারি খাতেরও ক্ষতি করে। রফতানি আয়ের অতিরঞ্জিত তথ্য নিয়ে ব্যবসায়ীরা বারবার প্রশ্ন তুলেছেন, কারণ সংখ্যার সঙ্গে তাদের বাজারের বাস্তব অভিজ্ঞতার মিল নেই। বিনিয়োগ পরিকল্পনা, বাজার-আকার নিরূপণ, ভোক্তা চাহিদার পূর্বাভাস—এসবই নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভরশীল। এক্ষেত্রে অনুমাননির্ভর তথ্য ঝুঁকিই বাড়ায়।

বিবিএসসহ অন্য পরিসংখ্যান সংস্থার সমস্যা এখন সর্বজনবিদিত। টাস্কফোর্স রিপোর্ট আছে, শ্বেতপত্র আছে, আইএমএফের মূল্যায়ন আছে। তাই বিবিএসের মতো সংস্থার সংস্কারের জন্য নতুন করে ভাবার বদলে সাহসী পদক্ষেপ নেয়া বেশি জরুরি। এজন্য বিবিএসকে কার্যত স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে হবে। বর্তমানে সংস্থাটি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে। তথ্য বা পরিসংখ্যান প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা উপদেষ্টার অনুমোদন নেয়ার বাধ্যবাধকতার বিষয়টি বন্ধ করা দরকার। বিবিএস যে তথ্য পাবে, তা স্বাধীনভাবে প্রকাশ করার ক্ষমতা ও সাংবিধানিক সুরক্ষা পেতে হবে। পরিসংখ্যান অধ্যাদেশ বা আইনে এ নিশ্চয়তা অন্তর্ভুক্ত করা অপরিহার্য। দ্বিতীয়ত, সংস্থাটিতে পেশাদার নেতৃত্ব গড়া জরুরি। বিবিএসের উচ্চ পদে প্রশাসন ক্যাডারের আধিপত্য পরিসংখ্যানের মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পরিসংখ্যান ক্যাডার বা সমতুল্য পেশাদার দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নেতৃত্বে সংস্থাটি পরিচালিত হওয়া উচিত। টেকনিক্যাল কমিটিতে বাইরের অভিজ্ঞ গবেষক ও পরিসংখ্যানবিদদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এছাড়া জিডিপির পদ্ধতিগত সংস্কার এখনই শুরু করতে হবে। ‘সাপ্লাই অ্যান্ড ইউজ টেবিল’ নিয়মিত হালনাগাদ, ব্যয় ও উৎপাদন উভয় দিক থেকে জিডিপি হিসাব, ত্রৈমাসিক তথ্য যথাসময়ে প্রকাশ—এগুলো ন্যূনতম আন্তর্জাতিক মানদণ্ড। বিবিএসে একটি স্বাধীন কোর ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিট গঠন করে জিডিপির পুনর্মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চালু করা যেতে পারে, যেখানে বিদেশী পরামর্শকও থাকতে পারেন। দীর্ঘমেয়াদে একটি স্বাধীন পরিসংখ্যান কমিশন গঠনের বিষয়টি বিবেচনায় আনা যেতে পারে, যা সরকারের প্রভাবমুক্ত থেকে জাতীয় পরিসংখ্যান কাঠামো তদারক করবে। ভারতের এনএসএস বা সিঙ্গাপুরের স্ট্যাটস এসজি এ ধরনের মডেলের কাছাকাছি উদাহরণ।

জিডিপি সংশোধনের সবচেয়ে বড় বাধা রাজনৈতিক। সংশোধিত জিডিপিতে ঋণ-জিডিপি অনুপাত বাড়বে, মাথাপিছু আয় কমবে, এলডিসি উত্তরণের শর্তগুলো পুনর্মূল্যায়িত হবে। এগুলো স্বল্পমেয়াদে রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে নেয়া নীতি দেশকে সত্যিকারের উন্নয়নের পথে নিয়ে যাবে। রাজনীতিবিদরা আগে যেভাবে পরিসংখ্যানকে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করেছেন, সেই প্রচলন থেকে বেরিয়ে আসার এখনই সময়। নতুন বিএনপি সরকারের সামনে এ সুযোগ রয়েছে। অতীতে জিডিপির আকার বড় দেখিয়ে এলডিসি উত্তরণের যে রাজনৈতিক ইচ্ছা ছিল তা থেকে এ সরকার দূরে রয়েছে। তবে বিবিএসের অতিরঞ্জিত তথ্য অনেক ক্ষেত্রে সে কার্যক্রমের জন্যও চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। বিষয়টি অনুধাবন করে বিবিএসসহ আর্থিক ব্যবস্থাপনায় তথ্য সহযোগিতা দেয় এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্রুত সংস্কার করতে হবে।

আরও