কৃষি ভাবনা

ফলন বৃদ্ধিতে ইনব্রেড ও হাইব্রিড ধানের গবেষণার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে এসিআই রাইস জেনেটিক্স

গাজীপুরের মাওনায় প্রায় ৩৩ একর জমির ওপর গড়ে উঠেছে এসিআইয়ের আধুনিক ধান গবেষণা ও প্রজনন কেন্দ্র। এখানে ইনব্রেড ও হাইব্রিড ধানের জার্মপ্লাজম মূল্যায়ন, প্যারেন্ট লাইন উন্নয়ন, সংকরায়ন, রোগ প্রতিরোধ স্ক্রিনিং, মলিকুলার বিশ্লেষণ এবং বহুল পরিবেশভিত্তিক মাঠ মূল্যায়ন পরিচালিত হচ্ছে

বাংলাদেশের কৃষির গল্প মূলত ধানের গল্প। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষকের জীবিকা এবং কোটি মানুষের প্রতিদিনের আহার-সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এ ফসল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি শুধু খাদ্যের উৎস নয়, বরং আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তবে সময়ের সঙ্গে কৃষির বাস্তবতাও বদলেছে। একসময় মূল লক্ষ্য ছিল উৎপাদন বৃদ্ধি; এখন চ্যালেঞ্জের পরিধি অনেক বিস্তৃত। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা, বন্যা, লবণাক্ততা, নতুন রোগবালাই এবং পানির সংকট কৃষিকে প্রতিনিয়ত নতুন পরীক্ষার মুখোমুখি করছে। একই সঙ্গে ভোক্তারা এখন শুধু বেশি উৎপাদন নয়, উন্নত মান, পুষ্টিগুণ এবং নিরাপদ খাদ্যও প্রত্যাশা করেন। ফলে কৃষক, ভোক্তা এবং পরিবেশ-তিন পক্ষের চাহিদার সমন্বয় ঘটানো আজকের সময়ের বড় দায়িত্ব। এ প্রেক্ষাপটে দেশের কৃষি আর শুধু জমির পরিমাণের ওপর নির্ভর করছে না; বরং নির্ভর করছে বীজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা জেনেটিক সম্ভাবনা, বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনের ওপর। একটি ক্ষুদ্র দানার মধ্যেই রয়েছে উন্নত জিন, আণবিক প্রযুক্তি এবং জলবায়ু অভিযোজনের অসীম সম্ভাবনা। আজ গবেষণাগারে যে বৈশিষ্ট্য নির্বাচন করা হচ্ছে, আগামী দিনে সেটিই কৃষকের উৎপাদন, আয় এবং খাদ্য ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নির্ধারণ করবে।

বাংলাদেশের ধান গবেষণার আজকের অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান অনস্বীকার্য। কয়েক দশকের ধারাবাহিক গবেষণার ফলে জাতীয় বীজ বোর্ডের মাধ্যমে এ পর্যন্ত প্রায় ১৫৪টি ইনব্রেড ধানের জাত অবমুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে, হাইব্রিড ধানের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। জাতীয় বীজ বোর্ডের ১১৫তম সভা (২০২৬) পর্যন্ত দেশে প্রায় ২৭৪টি হাইব্রিড ধানের জাত নিবন্ধিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৬টি জাত দেশীয় গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবিত। আশার কথা হলো, স্থানীয়ভাবে উদ্ভাবিত এসব হাইব্রিড জাতের বড় একটি অংশ এসেছে বেসরকারি খাতের গবেষণা কার্যক্রম থেকে। এটি প্রমাণ করে যে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনও দেশের কৃষি গবেষণায় নতুন গতি এনে দিচ্ছে। শুধু নতুন জাত উদ্ভাবন নয়, গবেষণার ফল দ্রুত কৃষকের কাছে পৌঁছে দেয়া, মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন এবং প্রযুক্তির বাণিজ্যিক সম্প্রসারণেও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ ধারাবাহিকতায় এসিআই আধুনিক প্রজনন প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, বহুল পরিবেশভিত্তিক মাঠ মূল্যায়ন এবং কৃষককেন্দ্রিক গবেষণার মাধ্যমে উচ্চ ফলনশীল, রোগ সহনশীল, জলবায়ু অভিযোজিত এবং উন্নত মানের ধান উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে গবেষণা, মাঠ মূল্যায়ন, বীজ উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষক প্রশিক্ষণ এবং বাজার সম্প্রসারণ-সমগ্র প্রক্রিয়াকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে। ফলে নতুন প্রযুক্তি দ্রুত কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে এবং উৎপাদিত ধান ভ্যালু এডিশনের মাধ্যমে উন্নত খাদ্যপণ্যে রূপান্তরিত হচ্ছে।

একই সঙ্গে এসিআইয়ের রিটেইল চেইন ‘স্বপ্ন’-এর মাধ্যমে কৃষিপণ্য সরাসরি ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ গবেষণাগার থেকে শুরু করে কৃষকের মাঠ এবং সেখান থেকে ভোক্তার খাবার টেবিল পর্যন্ত পুরো রাইস ভ্যালু চেইনকে একটি সুসংহত ব্যবস্থার মধ্যে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। কৃষি গবেষণার প্রকৃত সফলতা তখনই আসে, যখন তার সুফল কৃষক ও ভোক্তা উভয়ের কাছে পৌঁছে যায়।

আধুনিক প্রযুক্তিতে এগোচ্ছে ধান গবেষণা

একটি নতুন ধানের জাত উদ্ভাবন কোনো একদিনের কাজ নয়। এর পেছনে থাকে দীর্ঘ গবেষণা, অসংখ্য পরীক্ষা এবং বছরের পর বছর ধৈর্যশীল প্রচেষ্টা। প্রথমে উন্নত প্যারেন্ট লাইন নির্বাচন করা হয়, এরপর জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন লাইন বাছাই করা হয়। ফলন বৃদ্ধির জন্য কার্যকর কুশির সংখ্যা, শীষের দৈর্ঘ্য, দানার সংখ্যা এবং পরিপক্বতার সময়ের মতো বৈশিষ্ট্যগুলো গুরুত্ব পায়। পাশাপাশি ব্লাস্ট ও ব্যাকটেরিয়াল লিফ ব্লাইটের মতো গুরুত্বপূর্ণ রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হয়।

বর্তমানে এসিআইয়ের গবেষণায় উচ্চ ফলনের পাশাপাশি উন্নত চালের মান, স্বল্প জীবনকাল, জিঙ্কসমৃদ্ধ পুষ্টিকর চাল, খরা ও লবণাক্ততা সহনশীলতা এবং রপ্তানিযোগ্য সুগন্ধি ধান উন্নয়ন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ ভবিষ্যতের ধান গবেষণায় শুধু উৎপাদন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; কৃষকের লাভজনকতা ও ভোক্তার পছন্দকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

আণবিক প্রযুক্তি বদলে দিচ্ছে ধান প্রজননের গতি

আধুনিক আণবিক প্রযুক্তি ধান গবেষণায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। বর্তমানে মলিকুলার ব্রিডিং, মার্কার-সহায়িত নির্বাচন, জিনোমিক নির্বাচন এবং প্রিসিশন ফেনোটাইপিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন জাত উন্নয়নের কাজ আরো দ্রুত ও নির্ভুলভাবে করা সম্ভব হচ্ছে।

একসময় একটি নতুন ধানের জাত উদ্ভাবনে ১০ থেকে ১২ বছর সময় লাগত। এখন উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে গবেষকরা দ্রুত শনাক্ত করতে পারছেন কোন লাইনে খরা সহনশীলতা রয়েছে, কোন লাইনে রোগ প্রতিরোধী জিন রয়েছে এবং কোন জিনোটাইপ উন্নত চালের গুণাগুণ বহন করছে। ফলে গবেষণার সময় ও ব্যয় কমছে এবং নতুন জাত উদ্ভাবনের গতি বাড়ছে।

এ বাস্তবতায় দেশের বেসরকারি খাতে হাইব্রিড ধান গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এসিআই। উন্নত প্যারেন্ট লাইন উন্নয়ন, জার্মপ্লাজম মূল্যায়ন, হেটেরোসিস ব্রিডিং, আধুনিক জেনেটিক নির্বাচন এবং আণবিক গবেষণার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি নতুন প্রজন্মের হাইব্রিড ধান উন্নয়নে কাজ করছে। গবেষণার অংশ হিসেবে বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত জার্মপ্লাজমের বৈশিষ্ট্য মূল্যায়ন, প্যারেন্টাল লাইনের বিশুদ্ধকরণ, সাইটোপ্লাজমিক মেল স্টেরাইল লাইন উন্নয়ন, রেস্টোরার ও মেইনটেইনার লাইন নির্বাচন এবং সংকরায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

হাইব্রিড ধানের বীজ উৎপাদন একটি অত্যন্ত বিজ্ঞানভিত্তিক ও সূক্ষ্ম প্রক্রিয়া। এখানে প্যারেন্ট লাইনের বিশুদ্ধতা, ফুল ফোটার সময়ের সমন্বয়, রোপণ অনুপাত, আইসোলেশন দূরত্ব এবং পরাগায়ন ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসিআই গবেষণা ও বীজ উৎপাদনে উচ্চমানের হাইব্রিড বীজ উৎপাদনের চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে গ্রো-আউট টেস্ট, মার্কার ভ্যালিডেশন এবং কঠোর সীড কোয়ালিটি অ্যাসিউরেন্স কার্যক্রমের মাধ্যমে বীজের বিশুদ্ধতা ও মান নিশ্চিত করা হচ্ছে।

ফলে আজ ধান গবেষণা শুধু নতুন জাত উদ্ভাবনের গল্প নয়, এটি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, মানসম্পন্ন বীজ এবং কৃষকের কাছে দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার একটি সমন্বিত যাত্রা। আর সেই যাত্রায় সরকারি গবেষণার শক্ত ভিত্তির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বেসরকারি উদ্ভাবন, যা বাংলাদেশের কৃষিকে আরো আধুনিক, উৎপাদনশীল ও টেকসই করে তুলতে সহায়তা করছে।

মাওনায় গড়ে উঠেছে আধুনিক গবেষণা অবকাঠামো

গাজীপুরের মাওনায় প্রায় ৩৩ একর জমির ওপর গড়ে উঠেছে এসিআইয়ের আধুনিক ধান গবেষণা ও প্রজনন কেন্দ্র। এখানে ইনব্রেড ও হাইব্রিড ধানের জার্মপ্লাজম মূল্যায়ন, প্যারেন্ট লাইন উন্নয়ন, সংকরায়ন, রোগ প্রতিরোধ স্ক্রিনিং, মলিকুলার বিশ্লেষণ এবং বহুল পরিবেশভিত্তিক মাঠ মূল্যায়ন পরিচালিত হচ্ছে। গবেষণার গতি আরো বাড়াতে এখানে র‌্যাপিড জেনারেশন অ্যাডভান্সমেন্ট সুবিধাও যুক্ত করা হয়েছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বল্প সময়ে একাধিক প্রজন্ম অগ্রসর করা সম্ভব হচ্ছে, ফলে নতুন জাত উন্নয়নের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসছে।

বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশে একটি জাতের সফলতা শুধু গবেষণাগারের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না; সেটিকে বিভিন্ন অঞ্চল ও পরিবেশে স্থিতিশীল ফলন দিতে হয়। এ কারণেই এসিআই দেশের বিভিন্ন কৃষি-পরিবেশ অঞ্চলে ছয়টি পিডিএস স্থাপন করেছে, যেখানে নতুন লাইনগুলো বাস্তব কৃষি পরিবেশে মূল্যায়ন করা হয়।

সীমিত জমিতে অধিক উৎপাদন এবং উন্নত চালের মান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরিচালিত কার্যক্রমের ফল হিসেবে ইতোমধ্যে এসিআইয়ের পাঁচটি ইনব্রেড ও পাঁচটি হাইব্রিড ধানের জাত জাতীয় বীজ বোর্ডের মাধ্যমে অবমুক্ত করেছে, যা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।

খরা মোকাবেলায় নতুন প্রজন্মের ধান

এসিআইয়ের গবেষণা পাইপলাইনে থাকা ‘এসিআই ধান৪’ বর্তমানে বিশেষ আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। এটি একটি খরা সহনশীল ইনব্রেড ধানের লাইন। বাংলাদেশে প্রায় ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন হেক্টর জমি বিভিন্ন মাত্রায় খরা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বোরো ও আমন মৌসুমে পানির স্বল্পতা কৃষি উৎপাদনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই চাপ আরো বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে কম পানিতে সন্তোষজনক ফলন দিতে সক্ষম জাত কৃষকের জন্য কার্যকর সমাধান হতে পারে। শুধু সহনশীলতাই নয়, এসিআই ধান৪-এর চিকন দানা, ঝরঝরে ভাত এবং উন্নত ভোক্তা গ্রহণযোগ্যতাও এটিকে সম্ভাবনাময় করে তুলেছে।

বাসমতি ধরনের সুগন্ধি চালে নতুন সম্ভাবনা

অন্যদিকে ‘এসিআই ধান৫’ একটি দীর্ঘ দানার সুগন্ধি ধান, যা বাসমতি ধরনের চালের বাজারকে লক্ষ্য করে উন্নয়ন করা হয়েছে। দেশে প্রতি বছর প্রায় ৮০০ থেকে ১,০০০ কোটি টাকার প্রিমিয়াম সুগন্ধি চাল আমদানি হয়, যা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। এসিআই ধান৫-এর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো-এটি উচ্চ ফলনশীল, স্বল্পমেয়াদি এবং রান্নার পর চালের দৈর্ঘ্য প্রায় দ্বিগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। আন্তর্জাতিক বাজারে এই ধরনের কুকিং কোয়ালিটি অত্যন্ত মূল্যবান হিসেবে বিবেচিত হয়।

গবেষকদের প্রত্যাশা, জাতটি অবমুক্ত হলে দেশের উচ্চমানের সুগন্ধি চালের চাহিদা পূরণে অবদান রাখার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় বাজারে রপ্তানির নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে। এর মাধ্যমে কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়-দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বেসরকারি গবেষণায় নতুন মাইলফলক; এসিআই ধান২ ও ধান৩: নতুন যুগের সূচনা

বাংলাদেশের ধান উন্নয়ন কার্যক্রমে সম্প্রতি একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হয়েছে। জাতীয় বীজ বোর্ডের ১১৪তম সভায় এসিআই উদ্ভাবিত দুটি নতুন ইনব্রেড বোরো জাত-এসিআই ধান২ ও এসিআই ধান৩-অবমুক্তির অনুমোদন পেয়েছে। এই দুটি জাত ফলন, চালের মান এবং রোগ সহনশীলতার সমন্বয়ে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

এসিআই ধান২: বোরো মৌসুমে প্রথম সুগন্ধি জাতের নতুন সংযোজন

এসিআই ধান২ দেশের বোরো মৌসুমে সুগন্ধি ও ছোট দানার একটি নতুন জাত। এটি হেক্টরপ্রতি প্রায় ৬-৭ টন ফলন দিতে সক্ষম, যা প্রচলিত অনেক সুগন্ধি জাতের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। জনপ্রিয় সুগন্ধি জাত ব্রি ধান৩৪-এর তুলনায় এর উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি।

জাতটি সাধারণত ১৩৫-১৪০ দিনে পরিপক্ব হয়। গাছের উচ্চতা ১০০-১১০ সেন্টিমিটার এবং খাড়া প্রকৃতির হওয়ায় হেলে পড়ার ঝুঁকি কম। প্রতি শীষে ২৫০-৩০০টি পর্যন্ত দানা থাকে। রান্নার পর ভাত ঝরঝরে থাকে এবং সুগন্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়। দীর্ঘদিন ধরে বোরো মৌসুমে উন্নত মানের সুগন্ধি ধানের যে চাহিদা ছিল, এই জাত তা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

এসিআই ধান৩: ব্লাস্ট প্রতিরোধী অধিক ফলনের জাত

এসিআই ধান৩ একটি স্বল্পমেয়াদি বোরো ধান, যার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী চর৫৪ জিনের সংযোজন। মার্কার-সহায়িত প্রজনন প্রযুক্তির মাধ্যমে এই জিন নির্বাচন করা হয়েছে। জাতটির গড় ফলন প্রায় ৮ টন প্রতি হেক্টর, অনুকূল পরিবেশে যা ৯ দশমিক ৪ টন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। শক্ত কা-, অধিক কুশি এবং প্রতি শীষে ২০০-এর বেশি দানা এই জাতকে উৎপাদনশীল করে তুলেছে। চাল মাঝারি সরু, রান্নার পর নরম ও ঝরঝরে। এতে প্রায় ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ অ্যামাইলোজ, ৭ দশমিক ৯ শতাংশ প্রোটিন এবং ২৩ দশমিক ৫ পিপিএম জিঙ্ক রয়েছে। হালকা সুগন্ধ যুক্ত হওয়ায় ভোক্তাদের কাছেও এটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে।

মাঠ পর্যায়ে ব্যাপক মূল্যায়ন কার্যক্রম

চলতি বোরো মৌসুমে এসিআই সারা দেশে এই জাত দুটির প্রায় ৫০০টিরও বেশি প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করেছে। এসব প্রদর্শনীতে কৃষক, বীজ ব্যবসায়ী, মিলার এবং অন্যান্য অংশীজন নতুন জাতগুলোর ফলন, চালের মান ও কৃষি উপযোগিতা সরাসরি পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেয়েছেন। ইতোমধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রজনন ও ভিত্তি বীজ উৎপাদন করা হয়েছে এবং আগামী মৌসুমে বৃহৎ পরিসরে প্রত্যয়িত বীজ বাজারজাত করার প্রস্তুতি চলছে।

পাবলিক-প্রাইভেট অংশীদারিত্বের সফল উদাহরণ : রাবি ধান১: কৃষকের কাছে ‘মিনিশাইল’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় অবমুক্ত রাবি ধান১ বর্তমানে ‘মিনিশাইল’ নামে পরিচিত। চিকন দানা, ভালো বাজারমূল্য এবং সন্তোষজনক ফলনের কারণে এটি দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছে। জাতটির জীবনকাল ১২৫-১৩০ দিন এবং ফলন ৬-৭ টন প্রতি হেক্টর। ব্রি ধান৪৯-এর তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৫ টন বেশি ফলনের পাশাপাশি এটি ব্রি ধান১১-এর তুলনায় প্রায় ১০ দিন আগে পরিপক্ব হয়। ফলে কৃষক দ্রুত বাজারজাত করার সুযোগ পান। ব্লাস্ট ও ব্যাকটেরিয়াল লিফ ব্লাইট সহনশীল হওয়ায় রোগ ব্যবস্থাপনার খরচও কমে। ঝরঝরে ভাত, প্রায় ২৬ শতাংশ অ্যামাইলোজ এবং বিভিন্ন কৃষি-পরিবেশে অভিযোজন ক্ষমতা এই জাতের গ্রহণযোগ্যতা আরো বাড়িয়েছে।

বাংলাদেশের কৃষিতে হাইব্রিড ধান গবেষণার নতুন বাস্তবতা

বিভিন্ন মৌসুমের জন্য নতুন প্রজন্মের হাইব্রিড ধান উন্নয়নে কাজ করছে এসিআই রাইস জেনেটিক্স। যা থেকে এখন পর্যন্ত পাঁছটি হাইব্রিড জাত জাতীয় বীজ বোর্ডের মাধ্যমে নিবন্ধিত হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য: উচ্চ ফলনশীল এসিআই হাইব্রিড ধান১৭; প্রিমিয়াম মানের সরু দানার চালের জন্য এসিআই হাইব্রিড ধান৪; কম সময়ে বেশি ফলনশীল এসিআই হাইব্রিড ধান১৬; পুষ্টি নিরাপত্তায় জিঙ্কসমৃদ্ধ এসিআই হাইব্রিড ধান২০।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এসব হাইব্রিড জাতের অভিযোজন, ফলন ও কৃষি উপযোগিতা মূল্যায়নের কাজ চলছে। গবেষকদের প্রত্যাশা, উচ্চ ফলন, রোগ সহনশীলতা, উন্নত চালের মান এবং পুষ্টিগুণের সমন্বয়ে এসব জাত ভবিষ্যতে দেশের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ভবিষ্যতের পথে এসিআই রাইস জেনেটিক্স: একটি দানার ভেতরেই আগামী বাংলাদেশের স্বপ্ন

এসিআই রাইস জেনেটিক্স ইনব্রেড ও হাইব্রিড-উভয় ধরনের ধান গবেষণায় কাজ করছে। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতি হেক্টরে ১০ টন ফলনক্ষম ইনব্রেড এবং ১৫ টন ফলনক্ষম হাইব্রিড ধান উদ্ভাবনের লক্ষ্য নিয়ে গবেষণা এগিয়ে চলছে। একই সঙ্গে ব্লাস্ট ও ব্যাকটেরিয়াল ব্লাইট প্রতিরোধী, খরা ও তাপ সহনশীল, জিঙ্কসমৃদ্ধ এবং উন্নত মানের সুগন্ধি ধান উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আধুনিক মলিকুলার ব্রিডিং, জিনভিত্তিক নির্বাচন এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতার মাধ্যমে এসিআই এমন ধান উন্নয়নের চেষ্টা করছে, যা কৃষকের আয় বাড়াবে, ভোক্তার চাহিদা পূরণ করবে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে আরো শক্তিশালী করবে।

এক সময় ধানের একটি জাতের সাফল্য শুধু ফলনের মাধ্যমে বিচার করা হতো। কিন্তু এখন সময় বদলেছে। আজ একটি ধানের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় কৃষকের লাভ, পুষ্টিগুণ, জলবায়ু সহনশীলতা, বাজার চাহিদা এবং ভোক্তার সন্তুষ্টির মাধ্যমে। সেই কারণেই গবেষণাকে শুধু গবেষণাগারে নয়, মাঠ থেকে বাজার এবং বাজার থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে এসিআই।

একটি ছোট্ট ধানের দানা হয়তো দেখতে খুব সাধারণ। কিন্তু সেই দানার ভেতরেই লুকিয়ে আছে একজন কৃষকের স্বপ্ন, একটি পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা এবং একটি দেশের ভবিষ্যৎ। আজ যে গবেষণা শুরু হচ্ছে, তার ফলই হয়তো আগামী দিনের আরো সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশের ভিত্তি গড়ে দেবে।

মোহাম্মদ মিজানুর রহমান: পরিচালক, আরএন্ডডি ও অপারেশনস, এসিআই সীড, এসিআই পিএলসি।

আরও