সামাজিক সুরক্ষায় গুরুত্ব, বাড়ছে কার্ডভিত্তিক সেবা কর্মসূচি

প্রকৃত উপকারভোগী, ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামোও নিশ্চিত করতে হবে

দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ না হওয়া, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, ব্যবসা-বিনিয়োগে মন্দাভাবসহ নানা প্রতিকূলতায় দেশের মানুষ বহুমুখী চাপে রয়েছে।

এ বাস্তবতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা খাতে সরকারের গুরুত্ব প্রতিফলিত হওয়াটা আশাব্যঞ্জক। সরকারের পক্ষ থেকে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ই-হেলথ কার্ড ও প্রবাসী কার্ডের মতো বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করার পরিকল্পনা বাজেট বক্তৃতায় স্পষ্ট করা হয়েছে। সরকারের নেয়া এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন হলে জনজীবনে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফেরার আশা রয়েছে। তবে বাস্তবায়নের পথে কিছু বাস্তবিক চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সরকার যদি চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয় তবে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি কেবল বরাদ্দের অংকে থেকে যাবে; কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়বে না।

সম্প্রতি প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে আগামী অর্থবছরের জন্য ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। সে হিসাবে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ছে ১৭ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা। দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু বরাদ্দকৃত অর্থ প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে পৌঁছবে কিনা তার ওপর এর সাফল্য নির্ভর করবে। আর প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচনই সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে ফলপ্রসূ করার পথে বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির নানা উদ্যোগ আগে থেকেই প্রচলিত রয়েছে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, ভিজিএফ, ভিজিডিসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে এসব কর্মসূচিতে উপকারভোগী নির্বাচনে অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব, অস্বচ্ছতা এবং প্রকৃত দরিদ্রদের বাদ পড়ার অভিযোগ উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, যাদের সহায়তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তারা তালিকাভুক্ত হতে পারেননি, বরং তুলনামূলকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিরা সুবিধাভোগীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন। আবার অনেক সময় একই ব্যক্তি একাধিক কার্ড পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে বরাদ্দ বাড়ার পরও উপকারভোগীর আওতা সীমিত হয়ে পড়ে। সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগী নির্বাচনে একই প্রবণতার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।

উপকারভোগী নির্বাচনে নিরপেক্ষতা ও তথ্যভিত্তিক যাচাইকে প্রাধান্য দিতে হবে। এক্ষেত্রে দক্ষভাবে সহায়তা পাওয়ার সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড, জাতীয় তথ্যভাণ্ডারের ব্যবহার এবং ডিজিটাল যাচাই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এগুলো ছাড়া সামাজিক সুরক্ষার মতো ব্যাপক কর্মসূচি কার্যকরভাবে পরিচালনা করা কঠিন হবে।

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বরাদ্দ ব্যয়ের স্বচ্ছতা। শুধু বরাদ্দ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; বরং সেই অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, কারা সুবিধা পাচ্ছে এবং কর্মসূচিগুলোর বাস্তব প্রভাব কী—এসব বিষয়ে নিয়মিত মূল্যায়ন প্রয়োজন। ডিজিটাল ডেটাবেজ, সরাসরি আর্থিক স্থানান্তর ব্যবস্থা, স্বাধীন নিরীক্ষা ও সামাজিক জবাবদিহির কাঠামো শক্তিশালী করা না গেলে বরাদ্দ ব্যয়ে অপচয় ও অনিয়মের ঝুঁকি থেকেই যাবে। তাই এ কর্মসূচিগুলোকে কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণের অংশ হিসেবে মাধ্যম নয়, বরং দারিদ্র্য হ্রাস ও সামাজিক বৈষম্য কমানোর কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কেননা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্য টেকসইভাবে দারিদ্র্য বিমোচন করা। তাই এ কর্মসূচির সেবাগুলো চরম দরিদ্রদের কাছে পৌঁছে দেয়া জরুরি।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, যারা চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থাকে তারা স্বাভাবিকভাবেই সামাজিক কার্যক্রম ও পরিষেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রেও বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়। কেননা তাদের অনেকেরই ব্যাংক হিসাব, স্থায়ী ঠিকানা কিংবা আনুষ্ঠানিক পরিচয়পত্র নেই। সরকারি সাহায্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রেও অনেক সময় তারা সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হয়ে থাকে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান সরকার ও অংশীজনদের এমন নীতি ও কর্মসূচি গ্রহণ করা চাই, যার মাধ্যমে সরকারি সাহায্যপ্রাপ্তির বাধাগুলো দূর হবে, অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি গৃহীত হবে এবং দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে ভুক্তভোগীদের বের করা সম্ভব হবে। এজন্যও প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত তদারকি এবং বরাদ্দ ব্যয়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। তাহলেই সামাজিক সুরক্ষায় বাড়তি বরাদ্দ জনগণের জীবনমান উন্নয়নে অবদান রাখবে।

তবে এক্ষেত্রে আরো কিছু বিষয় সম্পৃক্ত রয়েছে, বিশেষত আর্থিক সক্ষমতা ও ব্যয়ের দক্ষতা। বাংলাদেশ এখনো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সীমিত রাজস্ব আয় ও উন্নয়ন ব্যয়ের চাপের মুখে রয়েছে। এ অবস্থায় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পরিধি বাড়ানোর অর্থ হলো সরকারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হওয়া। তাই এ খাতে প্রতিটি টাকা ব্যয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর উপকারভোগী ডেটাবেজ, নিয়মিত মূল্যায়ন ও স্বাধীন নিরীক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

কিন্তু এর বাইরেও গুরুত্বপূর্ণ হলো সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা। যেমন সরকারের পক্ষ থেকে ই-হেলথ কার্ড চালুর কথা বলা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, যদি পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য অবকাঠামো না থাকে তাহলে কেবল কার্ড দিয়ে জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাবে না। এক্ষেত্রে জনগণ কেবল কার্ড পাবে, সেবা পাবে না। দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা কমিউনিটি ক্লিনিকের যে দুরবস্থা রয়েছে তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। সুতরাং সরকারে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক বিষয়গুলোর ওপরও নজর দিতে হবে। অর্থাৎ এ কর্মসূচিকে এককভাবে দেখার সুযোগ নেই। সমন্বয়ন অপরিহার্য। তবেই এর যে মূল লক্ষ্য, মানুষের জীবনমান উন্নয়নের সেটি পূরণ হবে। সেজন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সঙ্গে কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা কার্যক্রমের সমন্বয় প্রয়োজন। কেবল নগদ সহায়তা নয়, মানুষের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

আরও