কিন্তু ১৪ জুন সন্ধ্যায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু বৈরুতে হামলার নির্দেশ দিলে চুক্তিটি প্রায় ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়। হোয়াইট হাউজ থেকে একের পর এক ফোনালাপের মাধ্যমে ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া ঠেকানো যায়। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আশ্বাস দেয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত চুক্তিটি রক্ষা পায়। ফলে ট্রাম্পের বহু প্রতীক্ষিত ‘রোমান কলোসিয়ামের খাঁচার লড়াইয়ের’ মতো রাজনৈতিক প্রদর্শনী এগিয়ে নেয়া সম্ভব হয়।
ট্রাম্পের মেজাজ তখনো খারাপ ছিল। তিনি অ্যাক্সিওসকে বলেন, ‘নেতানিয়াহু কেন এমন হামলা চালাতে গেলেন? আমি ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম। আমি তাকে সেটা জানিয়েছি। তার বিচারবুদ্ধি বলে কিছু নেই। আমি তাকে তা জানিয়েছি।’
ট্রাম্পের এ প্রশ্নের উত্তর হলো, ইরানের সঙ্গে তার করা চুক্তি সম্ভবত নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক মৃত্যুদণ্ডে পরিণত হতে পারে। তাই মধ্যপ্রাচ্যে তৃতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধের আগুন আবার জ্বালিয়ে তোলার যথেষ্ট প্রণোদনা তার রয়েছে। তিনি নিজের ও ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ বাজি রেখেছিলেন এ প্রত্যাশায় যে ট্রাম্প ইরানে শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাবেন। সেই বাজি এখন তার ওপর বিস্ফোরিত হয়েছে।
ট্রাম্পকে আবার নিজের পক্ষে টেনে আনা নেতানিয়াহুর জন্য সহজ হবে না। ‘একবার ঠকালে দোষ তোমার, দ্বিতীয়বার ঠকালে দোষ আমার’—এ প্রবাদ অনুসারে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দ্বারা প্রতারিত রয়েছেন এমনটি মনে করার যথেষ্ট কারণ ট্রাম্পের রয়েছে। একই অনুভূতি ইসরায়েলের ভোটারদের মধ্যেও দেখা দিতে পারে, যাদের সামনে অক্টোবরের শেষ নাগাদ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
নেতানিয়াহু ট্রাম্প ও নিজ দেশের জনগণকে এ ধারণা দিয়েছিলেন যে ৪৭ বছর পর অবশেষে ইরানের ধর্মতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠীর পতনের সময় এসে গেছে। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র জন্য প্রয়োজন ছিল কেবল কয়েকটি প্রাণঘাতী লক্ষ্যভিত্তিক হামলা; এরপর ইরানের জনগণই বাকি কাজ সম্পন্ন করবে বলা হয়েছিল।
ভূরাজনৈতিক বাজি ধরার ক্ষেত্রে খুব কম ক্ষেত্রেই এত দ্রুত পরিস্থিতি উল্টে যেতে দেখা গেছে। যুদ্ধ শুরু করতে ট্রাম্পকে রাজি করানোর ক্ষেত্রে নেতানিয়াহু তার প্রতি আত্মমুগ্ধতাকে কাজে লাগিয়েছিলেন। কিন্তু সেই একই আত্মমুগ্ধতা এখন নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ যেকোনো যুক্তি বা প্রলোভনের প্রতি বধির হয়ে থাকতে পারে। ফলে ইসরায়েলি নেতার সামনে অপ্রীতিকর এক সিদ্ধান্ত দাঁড়িয়ে আছে। হয় তাকে এমন একটি চুক্তি মেনে নিতে হবে, যা ২৮ ফেব্রুয়ারির আগের তুলনায় ইরানকে অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে রেখে যাবে; নয়তো চুক্তি ভণ্ডুল করার চেষ্টা করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধে জড়াতে হবে। তার সামনে মাঝামাঝি কোনো পথ সম্ভবত খোলা নেই। সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার ৬০ দিনের মধ্যেই যা করার করতে হবে।
ওয়াশিংটনে আগের তুলনায় তার সমর্থকও কমে গেছে। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র প্রথম দিকে মার্কিন রাজধানীতে নবরক্ষণশীল (নিওকন) চিন্তাধারার এক ক্ষণস্থায়ী পুনর্জাগরণ দেখা গিয়েছিল। তাদের কাছে এটি ছিল ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের ক্ষতিকর এবং ইরানকে শক্তিশালী করে তোলা উত্তরাধিকার মুছে ফেলার সুযোগ। একই সঙ্গে ট্রাম্পকে তাদের বিশ্বদৃষ্টির দিকে টেনে আনার সম্ভাবনাও ছিল। সরল রাজনৈতিক ভাষায় বলতে গেলে, ইরানে প্রাথমিক ‘শিরশ্ছেদমূলক’ হামলাগুলো ছিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মতো কঠোরপন্থীদের জন্য ভালো সময় এবং ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ঘরানার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের জন্য খারাপ সময়।
এরপর থেকে এ দুই শিবিরের মধ্যে মানসিক অবস্থার যে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। ট্রাম্পের অধিকাংশ সমর্থক তিনি যা-ই করেন, তা বিশ্বাসের ভিত্তিতেই মেনে নেন। তিনি যদি ইরানকে প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেয়ার মতো বোমাবাজি করতে চান, তাতেও তাদের আপত্তি নেই। আবার যদি ইরানের জন্য শত শত কোটি ডলারের অবমুক্ত সম্পদ এবং ভবিষ্যতে আরো বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেন, সেটিও তারা মেনে নেবে। কিন্তু ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণী অঙ্গনে এ দুই পথ এমন দুটি গোষ্ঠীকে প্রতিনিধিত্ব করে, যারা ক্রমে একে অন্যকে ঘৃণা করতে শুরু করেছে। তাদের মধ্যে একমাত্র মিল হলো ট্রাম্পের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত আনুগত্য।
প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প কি এ দুই পক্ষকে একই ছাতার নিচে ধরে রাখতে পারবেন? যেকোনো আলোচনায় হস্তক্ষেপ করা শিবির, যেখানে রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের মতো অনেকেই আছেন, তাদের এখন খুব সতর্কভাবে চলতে হবে। আলোচনায় যদি শুরুতেই বড় কোনো বাধা না আসে, তবে বর্তমান সীমিত লক্ষ্যগুলো ট্রাম্প এবং যারা তাকে এ যুদ্ধে উৎসাহিত করেছিলেন, তাদের জন্য একটি তিক্ত শিক্ষায় পরিণত হবে। যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, বছরের শুরুতে ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হাজারো বিক্ষোভকারীকে সহায়তা করার জন্যই তিনি উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। এখন তিনি সংশোধিত ইরানি শাসন ব্যবস্থার প্রশংসা করছেন।
যুদ্ধের উদ্দেশ্যের দীর্ঘ তালিকা পেরিয়ে এসে ট্রাম্প এখন একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখেছেন—হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়া। বিষয়টি যতই অস্বস্তিকর হোক না কেন, যুদ্ধ শুরুর আগেও প্রণালিটি সচল থাকলেও তার অনুগতরা এটিকে জয় হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করবে। একইভাবে তারা ইরানের প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয়টিকেও স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখাতে চাইবে। তবে কেউ যদি এটিকে ২০১৫ সালের চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে বারাক ওবামার ইরানকে দেয়া ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের নগদ অর্থের সঙ্গে তুলনা করার সাহস দেখায়, তাহলে তার জন্য পরিস্থিতি সুখকর হবে না। ‘এ ধরনের কিছু ট্রাম্পের আমলে হবে না’—অপারেশন এপিক ফিউরির শুরুতে ট্রাম্প এমন প্রতিশ্রুতিই দিয়েছিলেন।
অন্যদিকে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ শিবির ট্রাম্প যে চুক্তিই করুন না কেন, তার প্রশংসা করতে প্রস্তুত থাকবে; এমনকি সেটি ওবামার চুক্তির চেয়ে কম সুবিধাজনক হলেও। তাদের দৃষ্টিতে মধ্যপ্রাচ্যের অন্তহীন যুদ্ধের প্রতি ট্রাম্পের আকর্ষণ শেষ হয়েছে। তিনি আবার সেই পরিচিত প্রেসিডেন্টের রূপেই ফিরে গেছেন। নেতানিয়াহুকে প্রায়ই ইসরায়েলের ‘হুডিনি’ বলা হয়। কিন্তু এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা তার পক্ষেও সহজ হবে না। তিনি যদি ইরানের সঙ্গে আলোচনাকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া কোনো সাংবাদিকের কাছে ক্ষোভ প্রকাশের চেয়েও অনেক বেশি কঠোর হতে পারে।
(ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস থেকে ভাষান্তর করা হয়েছে)
এডওয়ার্ড লুস: ব্রিটিশ সাংবাদিক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক; তিনি ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের যুক্তরাষ্ট্রবিষয়ক সম্পাদক ও প্রধান কলামিস্টের দায়িত্ব পালন করছেন