অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ২০২৬ সালের ১১ জুন জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেছেন। এ বাজেটে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক মোট বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ, যার পরিমাণ ৫৭ হাজার ৩০২ কোটি টাকা। দেশের আনুমানিক জিডিপি ৬৮ দশমিক ৩ লাখ কোটি টাকা ধরে এ বরাদ্দ জিডিপির প্রায় দশমিক ৮৪ শতাংশ। অন্যদিকে কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সঙ্গে একত্রে বিবেচনা করলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে মোট বরাদ্দ দাঁড়ায় ৭৫ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ১ দশমিক ১১ শতাংশের সমতুল্য। অর্থাৎ, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সামগ্রিক শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত হলেও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির মাত্র দশমিক ৮৪ এবং কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা যুক্ত করলে তা ১ দশমিক ১১ শতাংশে পৌঁছায়।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ৩১ দফা কর্মসূচির ২৫ নম্বর দফার আলোকে অর্থমন্ত্রী আগামী পাঁচ বছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার অঙ্গীকার করেছেন। আমরা সবাই জানি, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অর্থ ও যন্ত্রের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষ। যেকোনো বাজেটের লক্ষ্য অর্জনে মানবসম্পদই সবচেয়ে বড় শক্তি, শিক্ষা খাতে এ সত্য আরো বেশি প্রযোজ্য। আমাদের সন্তানদের উন্নত শিক্ষা নিশ্চিত করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন শিক্ষক সমাজ। শিক্ষকদের জ্ঞান, নিষ্ঠা, আদর্শ চরিত্র, শিক্ষাদানের পদ্ধতি, দক্ষতা এবং তাদের ন্যায্য আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত না হলে জাতি কখনো শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত ফল পাবে না।
প্রথমত, শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে কেবল সেরা শিক্ষার্থীদের এবং তাদের জন্য নিশ্চিত করতে হবে আকর্ষণীয় বেতন ও সম্মানজনক জীবনযাত্রা। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের উপলব্ধি করতে হবে শিক্ষকতা কেবল জীবিকানির্বাহের পেশা নয়; এটি জাতি গঠনের এক মহান ব্রত। তৃতীয়ত, শিক্ষকদের এমন চরিত্রের অধিকারী হতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইয়ের বাইরেও তাদের কাছ থেকে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিখতে পারে। এসব একদিনে অর্জিত হবে না, কিন্তু এখনই এ প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। শিক্ষকদের জন্য কঠোর নৈতিক মানদণ্ড, সময়নিষ্ঠা, উত্তম চরিত্র ও মূল্যবোধ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে আমাদের সন্তানরা তাদের অপপ্রবৃত্তি থেকে নিরাপদ থাকে। যারা বিপুল অর্থ উপার্জন বা বিলাসী জীবনযাপনের উদ্দেশ্যে পেশা বেছে নিতে চান, তাদের শিক্ষকতা পেশায় আসার প্রয়োজন নেই। বর্তমান সরকার শিক্ষা ব্যবস্থাকে কেবল সনদ অর্জনের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং জাতীয় পুনর্গঠন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং কর্মসংস্থানমুখী অর্থনীতি গঠনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অর্থমন্ত্রী এমন একটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্ন দেখিয়েছেন, যারা জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতায় সমৃদ্ধ হয়ে সৎ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখবে। তিনি প্রশিক্ষিত ও দক্ষ শিক্ষক তৈরি, কর্মক্ষেত্র উপযোগী দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে জ্ঞান সৃষ্টি, কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ ও মানোন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা গঠন, শ্রমবাজার-উপযোগী পাঠ্যক্রম প্রণয়ন এবং শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব ও চরিত্র বিকাশকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
কী করা হবে তা বলা সহজ, কিন্তু কীভাবে করা হবে, কোন পদ্ধতিতে করা হবে এবং কার নেতৃত্বে তা বাস্তবায়ন হবে—এ প্রশ্নের উত্তর আরো গুরুত্বপূর্ণ। নেতৃত্ব যদি অদক্ষ বা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, তবে পুরো উদ্যোগই ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। যদিও অর্থমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় বিদ্যমান ব্যাপক দুর্নীতি এবং তা মোকাবেলার সুনির্দিষ্ট কৌশল নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি, তবে তিনি ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা, জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং একটি কার্যকর পুঁজিবাজার গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
বাংলাদেশের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত যখন সচরাচর আমলে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যাংকসহ একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান একজন দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও স্বৈরাচারী সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় প্রায় ধ্বংসের মুখে পৌঁছেছিল। বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ অনেকাংশে নির্ভর করছে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা এবং উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের ব্যবসায়িক আত্মবিশ্বাসের ওপর। ব্যাংক খাতে সরকারের নিয়োগনীতিই জনগণের কাছে সরকারের সদিচ্ছা ও অঙ্গীকারের প্রতিফলন। অযোগ্য, দুর্নীতিগ্রস্ত, বিতর্কিত বা রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেয়া জাতির জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।
বাংলাদেশে চাকরিতে যেকোনো ধরনের কোটা বা পক্ষপাতমূলক নিয়োগের পরিবর্তে মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কেবল মেধা ও নৈতিকতাই একজন প্রার্থীর যোগ্যতার মাপকাঠি হওয়া উচিত। যদি অর্থ ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে দূর করা না যায়, তবে আমরা কখনই সেরা মানুষকে সঠিক পদে আনতে পারব না। বর্তমান সরকার যদি অতীতের স্বৈরাচারী শাসনের অনৈতিক চর্চা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারে, তবে ফলও ভিন্ন হবে না।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষা পাঠ্যক্রমকে এমনভাবে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যাতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা, নেতৃত্বগুণ ও মানবিক চরিত্র গড়ে ওঠে। তিনি বলেছেন, শিক্ষা মানুষ ও সমাজ গঠনের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম এবং আনন্দময় শিক্ষা হবে সমসাময়িক, দক্ষতাভিত্তিক ও বাস্তবজীবনমুখী, যেখানে নৈতিকতা, মূল্যবোধ এবং চরিত্র গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে।
নিঃসন্দেহে এগুলো একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের জন্য মহৎ প্রত্যাশা। অতীতের প্রায় সব সরকারই এ ধরনের সুন্দর কথা বলেছে, কিন্তু বাস্তবে দেশের অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি। আশা করি এবার নীতিনির্ধারকদের আন্তরিকতার কারণে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটবে। আমাদের কেবল ‘সুন্দর কথা’ নয়, ‘সুন্দর কাজ’-এর মাধ্যমে জাতিকে রূপান্তর করতে হবে, সেই পরিবর্তন শুরু করতে হবে নিজেদের থেকেই।
যদি শিক্ষার্থীরা প্রকৃত শিক্ষা ছাড়াই কেবল ব্যক্তিগত পরিচয় বা যোগাযোগের জোরে বেশি অর্থ, ক্ষমতা ও উচ্চপদ লাভ করতে পারে, তবে তারা কেন ভালো ফলাফল ও উৎকর্ষ সাধনের জন্য কষ্ট করবে? সরকারকে শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে সর্বত্র মেধাভিত্তিক পুরস্কারের নিশ্চয়তা দিতে হবে। শিক্ষার্থীরা যেন কেবল শিক্ষকদের কাছ থেকেই নয়, বরং জাতীয় নেতৃত্ব এবং সমাজের কাছ থেকেও সততা ও নৈতিকতার মূল্য শিখতে পারে। আমরা নিজেরা পরিবর্তন না হলে আমাদের সন্তানরা কেন ও কীভাবে হবে?
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সংস্কার, তৃতীয় ভাষার অন্তর্ভুক্তি এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রস্তাব সময়োপযোগী ও অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান, নেতৃত্ব ও উদ্ভাবনী দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি মাধ্যমিক স্তর থেকেই কারিগরি শিক্ষার সূচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ।
বাস্তবজীবনের দক্ষতাহীন বেকার সনদধারী তৈরি বন্ধ করতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। দক্ষতাহীন সনদ অনেক সময় সম্পদ নয়, বরং বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। কাজের ধরন যা-ই হোক না কেন, কাজ ও কর্মী উভয়ের প্রতিই সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। কর্মক্ষম দুটি হাত, কর্মহীন একটি উচ্চ ডিগ্রির সনদের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।
দেশের প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি সরকারি কলেজকে ‘কারিগরি ও পেশাগত বিশ্ববিদ্যালয় (টেকনিক্যাল অ্যান্ড প্রফেশনাল ইউনিভার্সিটি-টিপিইউ)’ হিসেবে উন্নীত করা যেতে পারে, যেখানে শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিক জ্ঞান, কারিগরি দক্ষতা এবং একটি বিদেশী ভাষা শিখে দেশ-বিদেশে উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের জন্য প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের পথও উন্মুক্ত রাখতে হবে, যাতে আগ্রহীরা গবেষণা ও উদ্ভাবনেও অবদান রাখতে পারে।
বাজেটে গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) বিষয়ে তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু চোখে পড়েনি, যদিও বিএনপির ৩১ দফা কর্মসূচির বিভিন্ন স্থানে এ বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। শিল্প-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতার কথা বলা হলেও তা বাস্তবায়নে কোনো সুনির্দিষ্ট প্লাটফর্ম বা কাঠামোর কথা উল্লেখ করা হয়নি। তবে ‘ব্রেইন ড্রেইন’-কে ‘ব্রেইন সার্কুলেশন’-এ রূপান্তর, শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচি, সামার স্কুল, ভিজিটিং স্কলার উদ্যোগ ও যৌথ গবেষণা কর্মসূচির পরিকল্পনা ইতিবাচক।
অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব এবং ওমানের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা ব্যবস্থার সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানি, কীভাবে সরকার গবেষণা ও উন্নয়নকে উৎসাহ দিয়ে উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জিডিপির অনুপাতে গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় বৃদ্ধির কোনো উল্লেখযোগ্য ইঙ্গিত নেই। বর্তমানে বাংলাদেশে গবেষণা ও উন্নয়নে মোট বিনিয়োগ জিডিপির প্রায় দশমিক ৩ শতাংশ, যা উন্নয়নশীল দেশের জন্য ইউনেস্কোর সুপারিশকৃত ন্যূনতম ১ শতাংশ এবং ওইসিডি দেশগুলোর গড় ২ দশমিক ৭ থেকে ৩ শতাংশের তুলনায় অনেক কম।
বর্তমানে দেশে বিচ্ছিন্নভাবে নানাবিধ গবেষণা কার্যক্রম চলছে, কিন্তু ওইসবের তদারকি, সমন্বয় ও জাতীয় অগ্রাধিকারভিত্তিক গবেষণা এজেন্ডা নির্ধারণে কোনো সর্বোচ্চ জাতীয় সংস্থা নেই। উপযুক্ত জাতীয় প্রতিষ্ঠান, শক্তিশালী গবেষণা সংস্কৃতি, কার্যকর দিকনির্দেশনা, পরামর্শদাতা ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত সম্পদের অভাবে বাংলাদেশের বিপুল গবেষণা সম্ভাবনা আজও পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। ৩৭ বছর প্রবাসে শিক্ষকতা ও গবেষণার অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরে আমি বাংলাদেশের গবেষণা এবং জ্ঞান সৃষ্টির পরিবেশ উন্নয়নে আগ্রহী যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলতে ও কাজ করতে প্রস্তুত।
ড. শাহজাহান খান: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া; প্রবাসী ফেলো, বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি; এবং সাবেক উপাচার্য, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ঢাকা