রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার ৮১ শতাংশই আর্থিক ঝুঁকিতে

পারফরম্যান্স বিবেচনায় এসব প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার বিষয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে

দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের রাজস্ব আয়ের বড় উৎস। তবে এর বিপরীত চিত্রও রয়েছে। একাধিক লোকসানি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখতে সরকারকে বছরের পর বছর ভর্তুকি, অনুদান দিতে হয়।

এমনকি অনেক প্রতিষ্ঠানের ঋণের দায়ও পরিশোধ করতে হয় সরকারের নিজস্ব কোষাগার থেকে। অর্থাৎ লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে রাজস্ব আহরণ হয় কম, ব্যয় হয় বেশি। সীমিত রাজস্বের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। এ বাস্তবতায় সরকার যদি দক্ষ রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে চায় তাহলে অবশ্যই রাষ্ট্রায়ত্ত লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্তে আসতে হবে। এখানে প্রণিধানযোগ্য যে সরকারের আসন্ন অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়নে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা উন্নত করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিপুল অংকের ঘাটতি রাখা হয়েছে। রাজস্ব আহরণ অপ্রতুল হওয়ায় এ ঘাটতির বড় অংশ পূরণ করা হবে দেশী-বিদেশী উৎস থেকে ঋণ নিয়ে। ঋণ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সহায়ক হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সুদ ও কিস্তি পরিশোধের চাপ বাড়তে থাকে। এ চাপ এরই মধ্যে দেশের অর্থনীতির বাস্তবতা। অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে (জুলাই-মার্চ) মোট ৪ লাখ ৮ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা ব্যয়ের মধ্যে পরিচালন খাতেই খরচ হয়েছে ৩ লাখ ৪২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ। এর মধ্যে একই সময়ে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধেই ব্যয় করতে হয়েছে ৯৯ হাজার ৯০০ কোটি টাকা, যা মোট পরিচালন ব্যয়ের ২৯ শতাংশ। অর্থ বিভাগের প্রাক্কলন অনুযায়ী, আসন্ন অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ২৬ লাখ ৩৩ হাজার ১০০ কোটি টাকায়। ধারণা করা যাচ্ছে, ঋণের দায় পরিশোধের হারও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। ক্রমেই সরকারের এ ঋণনির্ভরতার পেছনে প্রধানতম কারণই হলো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় আয় না হওয়া। সুতরাং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সরকার যদি মনোযোগী না হয় তাহলে এ পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠবে। আর এ মনোযোগের কেন্দ্রে আর্থিক ঝুঁকিতে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাখা সমীচীন হবে।

দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোর ৮১ শতাংশই মাঝারি থেকে অতি উচ্চ আর্থিক ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সম্প্রতি অর্থ বিভাগের মূল্যায়নে উঠে এসেছে। এ তথ্য কেবল কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুরবস্থার চিত্র নয়; এটি রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা, বাজেট ব্যবস্থাপনাসহ সামষ্টিক অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত একটি বিষয়। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য মুনাফা অর্জন নয়—এ কথা সত্য। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গণপরিবহন, পানি সরবরাহ কিংবা নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখার মতো ক্ষেত্রে সরকারি ভর্তুকি, অনুদান অপরিহার্য। এসব খাতে অনেক সময় সামাজিক দায়বদ্ধতা ও জনস্বার্থকে বাণিজ্যিক লাভের ঊর্ধ্বে রাখতে হয়।

কিন্তু প্রশ্ন হলো জনস্বার্থ রক্ষার নামে বছরের পর বছর ধরে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসান, অদক্ষ পরিচালন ব্যবস্থাকে উপেক্ষা করে টিকিয়ে রাখা হবে? সরকারের কোষাগার থেকে বিপুল অংকের টাকা ব্যয়ের পরও কেন এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক পরিস্থিতিতে কোনো রূপান্তর নেই? এমনকি তাদের সেবাও বিশেষ মানসম্পন্ন না। অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত জনবল, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, ধীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান। এর বড় উদাহরণ দেশের গণপরিবহন খাত থেকে শুরু বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এ পরিস্থিতি আরো একটি বিষয়কে স্পষ্ট করে যে এসব প্রতিষ্ঠান জবাবদিহির আওতায়ও নেই। এর পরও প্রতি বছর বাজেট প্রণয়নের সময় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গবেষণা, সামাজিক নিরাপত্তা কিংবা অবকাঠামো উন্নয়নের মতো খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি ওঠে। কিন্তু বাস্তবে সরকারের উল্লেখযোগ্য সম্পদ লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখার পেছনে ব্যয় করতে হয়।

আরো উদ্বেগের বিষয় হলো এসব প্রতিষ্ঠানকে দেয়া আর্থিক সহায়তা সবসময় বাজেটে দৃশ্যমান থাকে না। অধিকাংশ বড় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ঋণের বিপরীতে সরকার সার্বভৌম গ্যারান্টি প্রদান করে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে শেষ পর্যন্ত দায়ভার সরকারের ওপরই বর্তায়। এটি এক ধরনের সুপ্ত আর্থিক ঝুঁকি, যা সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়ায়। এতে প্রশ্ন ওঠে, সব রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান আগামীতেও রাষ্ট্রের মালিকানায় বা টিকিয়ে রাখার প্রয়োজন রয়েছে কিনা।

বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ, গ্যাস ও জ্বালানি অবকাঠামো, পানি সরবরাহ, বাজার স্থিতিশীলতা কিংবা কিছু কৌশলগত পরিবহন সেবার মতো ক্ষেত্র রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে থাকার নানা যুক্তি থাকতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে লোকসান করা চিনিকল, টেক্সটাইল মিল, উৎপাদনমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পরিচালিত অনেক ব্যবসা কেন রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, সেটি সরকারকে ভাববে হবে।

এসব সংকটের সমাধান হিসেবে বেসরকারীকরণ একটি উপায় হতে পারে। তবে এতেও পুরোপুরি সমাধান হবে বলে প্রতীয়মান হয় না। কারণ এখানে পরিচালন দক্ষতাও বড় প্রশ্ন। তাই মোটাদাগে সরকারকে আর্থিক ঝুঁকিতে থাকা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনা। অনেক ক্ষেত্রে সরকার মালিকানা ধরে রেখেও বেসরকারি খাতের দক্ষতা কাজে লাগাতে পারে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ, ব্যবস্থাপনা চুক্তি, যৌথ উদ্যোগ কিংবা শেয়ারবাজারে অংশীদারত্ব সম্প্রসারণের মতো পদ্ধতি বিবেচনা করা যেতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ কমানো। এরপর পারফরম্যান্স মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে।

দেশ এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই। সে বাস্তবতায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে।

আরও