আজ বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধ দিবস

বনায়ন ও পানি ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে হবে

ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ দুর্যোগপ্রবণ। আবহমানকাল থেকেই বন্যা, নদীভাঙন ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হয় এ দেশের জনগণকে।

কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তীব্র তাপপ্রবাহ ও খরাও বড় দুর্যোগ আকারে দেখা দিয়েছে, বিশেষ করে দেশের উত্তরবঙ্গে। এ অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে ভূগর্ভের পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। অন্যদিকে দিন দিন বৃষ্টিপাতও কমছে। এতে বাড়ছে উষ্ণতা। সব মিলিয়ে বলা যায় উত্তরাঞ্চলের মানুষ একপ্রকার খরা ও তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। এর পেছনে ভৌগোলিক অবস্থানের চেয়ে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বেশি রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। বর্তমানে বনায়ন ও পানি ব্যবস্থাপনায় নজর না দিলে পরিস্থিতি আরো নাজুক হয়ে উঠবে।

খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রতি বছর ১৭ জুন বিশ্ব মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধ দিবস পালন হয়ে আসছে। সরকারও এক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ নেবে এটাই প্রত্যাশা।

খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধে বনায়ন এবং দক্ষ পানি ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই। গাছপালা মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে, ভূমিক্ষয় রোধ করতে এবং স্থানীয় জলবায়ুর ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একই সঙ্গে বনাঞ্চল তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও কার্বন শোষণের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতেও সহায়ক ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, নদী-খাল-বিল ও জলাভূমি রক্ষা এবং সেচকাজে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট অনেকাংশে কমানো সম্ভব। খরা ও তাপপ্রবাহ থেকে কৃষি এবং জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় সবুজ পরিসর বাড়ানো ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকারে রাখতে হবে।

সরকার এরই মধ্যে দেশের জলাধার সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারে বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে, যার মধ্যে খাল খনন কর্মসূচি অন্যতম। এটি ইতিবাচক। পাশাপাশি আরো কিছু উদ্যোগ প্রয়োজন। যেমন উত্তরাঞ্চলের বরেন্দ্র ভূমিতে পানির স্তর নেমে যাওয়া বড় উদ্বেগের কারণ। এ অঞ্চলের উৎপাদিত অন্যতম ফসল হলো বোরো ধান, যা মূলত সেচনির্ভর। সেচের জন্য ভূগর্ভের পানির অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে যে পানির স্তর নেমে যাচ্ছে তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। এক্ষেত্রে পানি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। অন্য কোনো উৎস থেকে কীভাবে সেচের পানির চাহিদা মেটানো যায় তা সরকারকে ভাবতে হবে। কিংবা এ অঞ্চলে সেচনির্ভর ফসল উৎপাদন কমিয়ে আনতে হবে। সেক্ষেত্রে ফসলের বাড়তি চাহিদা কীভাবে পূরণ করা হবে তা নিয়েও সরকারকে কাজ করতে হবে। এর বাইরে রয়েছে বনভূমির পরিমাণ বাড়ানো।

বিশ্ব মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধ দিবসে এবারের প্রতিপাদ্য—‘চারণভূমি: স্বীকৃতি, সম্মান, পুনরুদ্ধার’। প্রতিপাদ্যটি শুধু চারণভূমির গুরুত্বের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় না, বরং ভূমি, পানি, জীববৈচিত্র্য ও খাদ্য ব্যবস্থার পারস্পরিক নির্ভরশীলতার বিষয়টিও সামনে আনে। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে ভূমির অবক্ষয় ও খরা যে বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়েছে, এ প্রতিপাদ্য তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। ফলে দেশব্যাপী সবুজের পরিসর বাড়ানোও আবশ্যক।

একই সঙ্গে গবেষণা, প্রযুক্তি ও তথ্যনির্ভর পরিকল্পনায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। স্যাটেলাইট তথ্য, আধুনিক আবহাওয়া পূর্বাভাস, ড্রোন প্রযুক্তি এবং কৃষি তথ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে খরা মোকাবেলার সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ এবং জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ২০২৩-৫০-এর মতো উদ্যোগগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্বব্যাপী মরুকরণ বর্তমানে অন্যতম বড় পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ। বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ভূমি এরই মধ্যে বিভিন্ন মাত্রায় অবক্ষয়ের শিকার। জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, প্রতি বছর নতুন নতুন অঞ্চল মরুকরণের আওতায় চলে যাচ্ছে। ফলে কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা কমছে। জীববৈচিত্র্যও কমছে। এতে আগামী দশকগুলোয় মরুকরণ ও খরায় বিশ্বের প্রায় ৭৫ কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

একসময় মরুকরণ, খরা আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা ভারতের শুষ্ক অঞ্চলের সমস্যা হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু বর্তমানে বরেন্দ্র অঞ্চলের বাইরেও দেশের মধ্যাঞ্চল, দক্ষিণাঞ্চল এমনকি উপকূলীয় এলাকায়ও খরার ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলোয় আরবান হিট আইল্যান্ডের প্রভাব নাগরিক জীবনকে কঠিন করে তুলছে। ফলে খরা ও মরুকরণের প্রভাব আর কেবল কৃষি খাতে সীমাবদ্ধ থাকছে না। জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও বড় প্রভাবক হিসেবে এটিকে দেখতে হবে।

বাংলাদেশে মরুকরণের প্রধান লক্ষণগুলো এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জমির শুষ্কতা বাড়ছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে, নদী-খাল-বিল শুকিয়ে যাচ্ছে এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন এসেছে। এসব লক্ষণ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে দৃশ্যমান হলেও তা ভবিষ্যতে দেশের মধ্যভাগ ও উপকূলীয় অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।

খরা ও ভূমি অবক্ষয়ের সবচেয়ে বড় আঘাত পড়ে কৃষিতে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, আগামী তিন দশকে বিশ্বে খাদ্যের চাহিদা প্রায় ৬০ শতাংশ বাড়বে। ঠিক সেই সময়েই যদি খরা ও মরুকরণের বিস্তার বাড়তে থাকে, তাহলে খাদ্য উৎপাদন বড় ধরনের চাপে পড়বে। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও কৃষিনির্ভর দেশের জন্য এটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কৃষি উৎপাদন কমে গেলে শুধু খাদ্যনিরাপত্তাই নয়— মূল্যস্ফীতি, পুষ্টিহীনতা ও দারিদ্র্য পরিস্থিতিও আরো জটিল হয়ে উঠবে।

এ বাস্তবতায় মরুকরণ ও খরা মোকাবেলাকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় ইস্যু হিসেবে দেখতে হবে। শুধু দুর্যোগ-পরবর্তী সহায়তা নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন কৌশল। জলাধার ও জলাভূমি সংরক্ষণ, নদী পুনরুদ্ধার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির টেকসই ব্যবহার এবং খরাসহিষ্ণু ফসলের সম্প্রসারণে জোর দিতে হবে। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার কমিয়ে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার উদ্যোগও জরুরি। বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন ভূমি, পানি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া না হলে দেশ আরো বড় পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও জনস্বাস্থ্যগত বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।

আরও