এ বাজেট ঘিরে ব্যাপক জনপ্রত্যাশা রয়েছে। এর অন্যতম কারণ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর নির্বাচিত সরকারের তথা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট এটি। এছাড়া কয়েক বছর ধরে অর্থনীতিতে যে বহুমুখী চাপ রয়েছে তা প্রশমনের উপায় জানতেও বাজেটের দিকে মুখিয়ে আছে সবাই।
এবারের বাজেটের সম্ভাব্য প্রতিপাদ্য ‘গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ: ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ’। এ প্রতিপাদ্য ও জনপ্রত্যাশাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে বাজেটে থাকতে হবে অন্তুর্ভুক্তিমূলক ও দেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির জন্য স্বস্তিদায়ক উদ্যোগ। আর এ স্বস্তি তখনই আসবে যখন সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে। এজন্য প্রয়োজন সার্বিক ভারসাম্য রক্ষা করা।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্যনিরাপত্তা, বেসরকারি খাতের বিকাশ, ব্যবসা পরিবেশের উন্নয়ন এবং বৈদেশিক বাণিজ্য—কোনোটিই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে সুশাসন, দুর্নীতি প্রতিরোধ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ঋণ ব্যবস্থাপনা, রফতানি সম্প্রসারণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো মৌলিক ক্ষেত্রগুলোর যেকোনো একটিতে অবনতি পুরো অর্থনীতিকে নাজুক করে তুলতে পারে। এ বাস্তবতায় বাজেট প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণ হতে হবে সুবেবিচ্য ও দূরদর্শীসম্পন্ন।
সীমিত সম্পদ বিবেচনায় নিয়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণ, ঘাটতি ব্যবস্থাপনা, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ সামাজিক খাতে বরাদ্দ—সবকিছুর সমন্বয়ই বাজেটের মূল কাজ। অর্থনৈতিক নীতি ব্যবস্থাপনায় এটি একধরনের ‘ইকোনমিক জাগলিং’, যেখানে একাধিক চাপকে একই সঙ্গে সামলাতে হয়। দক্ষতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ধারাবাহিক নীতির সমন্বয় ছাড়া এ ভারসাম্য রক্ষা সম্ভব নয়।
বাস্তবতা হলো দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সব উপাদানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় পর্যায় থেকে এ চ্যালেঞ্জ উদ্ভূত হয়েছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে। এর প্রভাব পড়ছে আমদানি ব্যয়, জ্বালানি মূল্য এবং বিনিয়োগপ্রবাহে। অভ্যন্তরীণভাবে বিভিন্ন খাত-উপখাতেও কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে, যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি শ্লথ করেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিম্ন-নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ওপর আর্থিক চাপ বাড়িয়েছে। অন্যদিকে প্রকৃত মজুরি হার মূল্যস্ফীতির অনুপাতে বাড়েনি। এতে সমাজে বৈষম্য প্রকট হচ্ছে। দারিদ্র্য বাড়ছে। আবার ব্যবসা-বিনিয়োগের মন্দাভাবের কারণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ব্যাহত হয়েছে। এতে বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, বিশেষত উচ্চশিক্ষিত বেকার।
এসব পরিপ্রেক্ষিতে বাজেটের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো বাস্তবতা ও প্রত্যাশার মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করা। অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষী প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য কিংবা রাজস্ব আয়ের অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ইত্যাদি নয়, বরং বাস্তবায়নযোগ্য নীতিমালা ও সুস্পষ্ট অগ্রাধিকারই হওয়া উচিত মূল ভিত্তি। কারণ অর্থনীতির প্রতিটি সূচক একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত; একটি খাতে ব্যর্থতা অন্য খাতকেও প্রভাবিত করে।
প্রতি অর্থবছরে বাজেটে রাজস্ব আহরণের একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এর বড় অংশ আহরণের দায়িত্ব থাকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপর। কিন্তু প্রতি অর্থবছরই সে লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয় এনবিআর। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসেও রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২-১৩ শতাংশের মধ্যে সীমিত রয়েছে, যেখানে বার্ষিক লক্ষ্য ছিল ৩০ শতাংশের বেশি। এ ব্যবধান শুধু সংখ্যাগত ঘাটতি নয়; বরং রাজস্ব কাঠামোর দুর্বলতাও স্পষ্ট করে। এদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরের ওপরই ন্যস্ত করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো মাত্র ৭-৮ শতাংশের মধ্যে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম নিম্ন। প্রায় এক কোটির বেশি টিআইএনধারীর মধ্যে সক্রিয় করদাতার সংখ্যা সীমিত হওয়ায় রাজস্ব সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না হলে রাজস্ব ঘাটতি এবং ঋণনির্ভর বাজেটের চক্র চলতেই থাকবে।
রাজস্বের বাইরে বাজেট ঘাটতি পূরণে নেয়া হয় ঋণ। সরকারের ঋণের বড় অংশ আসে ব্যাংক খাত থেকে। এক্ষেত্রে বড় অসুবিধা হলো বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে প্রভাব পড়ে। এমনিতেও বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী এবং এ খাতে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধির গতি একেবারেই কম। বেসরকারি খাত যদি এ ধরনের চাপের মুখে পড়ে থাকে তাহলে অর্থনীতিতে কখনই স্বস্তি আসবে না। কেননা দেশের অর্থনীতির সিংহভাগ কর্মকাণ্ড বেসরকারি খাতের।
অন্যদিকে বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হলো বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি)। বাজেট অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হলে এডিপি বাস্তবায়নের দিকে গভীর মনোযোগ প্রয়োজন। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে এটি বাস্তবায়নের হার প্রায় ২০ শতাংশের কাছাকাছি নেমে এসেছে, যা গত দেড় দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর ফলে অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণ প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না। বাজেটে বড় অংক বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবায়নের ঘাটতির কারণে এর অর্থনৈতিক প্রভাব সীমিত থেকে যাচ্ছে। এ চক্র ভাঙা প্রয়োজন। অর্থনীতিকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হলে জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যত্যয় ঘটানো যাবে না। তাই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এডিপি বাস্তবায়নে জোর দেয়া আবশ্যক। এজন্য সরকারের পরিচালন ব্যয়ে লাগাম টানাও প্রয়োজন।
প্রতি অর্থবছরে বাজেটের সিংহভাগ অর্থ ব্যয় হয় পরিচালন ব্যয় এবং ঋণের সুদ-আসল পরিশোধে। এগুলোর লাগাম টানা জরুরি। যেমন ভর্তুকি হিসেবেও সরকারি ব্যয়ের বিপুল অংকের টাকা চলে যায়। বিদ্যুৎ, এলএনজি, সার ও খাদ্যপণ্যে ভর্তুকি বরাদ্দ প্রয়োজন। কিন্তু জনজীবনের স্বস্তি নিশ্চিত করতে এ অর্থায়ন কাঠামো প্রয়োজনীয় হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান নয়। এসব ক্ষেত্রে বিদ্যমান কাঠামোগত ও ব্যবস্থাপনাগত সমস্যাগুলো দূর করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারকে অতীতের মতো ঋণ করে প্রকল্প নেয়ার প্রবণতা কমিয়ে আনতে হবে।
ইতিবাচক দিক হলো, এবার বাজেটে ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’ গঠনের যে পরিকল্পনা রয়েছে, তা নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তি, স্টার্টআপ, সংস্কৃতি ও উদ্যোক্তাভিত্তিক খাতগুলোতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ রয়েছে। তবে এসব খাত বিকাশের জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীল নীতি, সহজ ব্যবসা পরিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ধারাবাহিকতা।
সবশেষে বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আস্থার সংকট মোকাবেলা করা। বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের আস্থা ছাড়া কোনো বাজেটই সফল হয় না। আস্থা তৈরি হয় নীতির ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতার মাধ্যমে।
বৈশ্বিক অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতার মধ্যেও এ বাজেট যদি বাস্তবভিত্তিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে পারে, তবে তা অর্থনীতিতে একটি স্বস্তির বার্তা দিতে সক্ষম হবে।