প্রস্তাবিত জ্বালানি বাজেটে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ সম্ভাবনায় জোর দিচ্ছে সরকার

ড. সাকিব বিন আমিন, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের অ্যাক্রেডিটেশন প্রজেক্ট টিমের পরিচালক।

পাশাপাশি তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ডারহামে পিএইচডি এবং পোস্টডক্টরাল গবেষণা সম্পন্ন করেন। এছাড়া তিনি এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, সানেম, ক্লাইম্যাট ফাইন্যান্স এশিয়ার মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছেন। ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে সরকারের ঘোষিত জ্বালানি নীতি ও উদ্যোগ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমিরুল আবেদিন

এবারের বাজেটকে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও নাজুক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পুনরুদ্ধারমূলক পথনকশা বলে অভিহিত করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেটে জ্বালানি নীতির মাধ্যমে কাঠামোগত কিছু সংকট নিরসনের উদ্যোগের কথা রয়েছে। এগুলো আমাদের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনতে কতটা সহায়ক হবে বলে মনে করছেন?

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জ্বালানি বাজেটকে দেশের জ্বালানি খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখছি। দীর্ঘদিন আমরা আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি অনুসরণ করায় যেকোনো বৈশ্বিক সংকটে মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ এবং বাড়তি ভর্তুকি মূল্য পরিশোধের মতো সমস্যায় পড়ি। এবারের বাজেট প্রস্তাবনায় এর কাঠামোগত সমাধানের ইঙ্গিত মিলেছে। এক্ষেত্রে ইতিবাচক দিকটি হলো, সরকার একদিকে দেশীয় খনিজ ও গ্যাস অনুসন্ধান এবং উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ে জোর দিয়েছে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানি অবকাঠামোকেও আধুনিকায়নে সমান গুরুত্ব দিয়েছে। যেমন বাপেক্সের মাধ্যমে ২০টি নতুন কূপ খনন, ৩১টি কূপে ওয়ার্ক ওভার, ২৭০ কিলোমিটারজুড়ে ভূতাত্ত্বিক জরিপ চালানোর উদ্যোগ রয়েছে। এছাড়া টুডি ও থ্রিডি সিসমিক জরিপের পরিকল্পনাও জ্বালানি সক্ষমতা বাড়াতে ইতিবাচক পদক্ষেপ। দীর্ঘদিন পর দেশীয় সম্ভাবনাকে অনুসন্ধানের কার্যক্রমকে কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার পাওয়ার বিষয়টি আশাব্যঞ্জক। এদিকে অফশোর খাতে নতুন বিডিং রাউন্ডের ঘোষণার মাধ্যমে বিদেশী তেল-গ্যাস কোম্পানির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য অংশীদারত্ব বণ্টনে পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ সময়োপযোগী। আবার বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানো, বিস্তৃত সিসমিক জরিপের পরিকল্পনাও দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সক্ষমতার ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় তৈরির চেষ্টারই প্রতিফলন বলে মনে হচ্ছে। নতুন ৫০ লাখ টন সক্ষমতার ক্রুড অয়েল রিফাইনারি, দ্বিতীয় ইস্টার্ন রিফাইনারি, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং এবং কৌশলগত জ্বালানি মজুদ গড়ে তোলার পরিকল্পনাও তাৎপর্যপূর্ণ। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে জ্বালানি আমদানি, পরিশোধন ও সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।

বিদ্যুৎ খাতেও বাজেট নতুন দিকনির্দেশনা দিয়েছে। সরকার ব্যয়বহুল ও অদক্ষ বিদ্যুৎ কেন্দ্র পর্যায়ক্রমে অফশোরে পাঠানো, বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি ও ক্যাপাসিটি পেমেন্ট পর্যালোচনা এবং লিস্ট কস্ট জেনারেশন নীতি অনুসরণের যে ঘোষণা দিয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতা ও দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করবে। বিশেষত বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপ কমানো এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার উদ্যোগকে প্রশংসা করতে হয়। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে তা ৩০-৫০ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যটি উচ্চাভিলাষী। তবে সময়ের বাস্তবতায় প্রয়োজনীয়। সৌরবিদ্যুৎ খাতে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত শূন্য করহার এবং গ্রাহকদের জন্য কর রেয়াত বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে উৎসাহ দেবে। তবে বাজেটের গুণগত মান নির্ভর করে তা বাস্তবায়নের সফলতার ওপর। সরকার যেসব উদ্যোগ ও লক্ষ্যমাত্রার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তা বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। যদি ধারাবাহিকতা বজায় রাখা যায় তাহলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি থেকে সরে আত্মনির্ভর, বৈচিত্র্যময় ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে এগোতে পারবে।

বাজেট প্রস্তাবনায় আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতির ঝুঁকি কমাতে অভ্যন্তরীণ উৎসে জোর দেয়া হয়েছে। এটি আমাদের কৌশলগত মজুদ গড়তে কতটা সহায়ক হবে বলে মনে করেন?

দেশের জ্বালানি নীতির প্রধান দুর্বলতাই হলো আমদানিনির্ভরতা। এর সঙ্গে রয়েছে সীমিত পরিশোধন ও সংরক্ষণ সক্ষমতা। সরকার এজন্যই চট্টগ্রামে নতুন ক্রুড অয়েল রিফাইনারি, দ্বিতীয় ইস্টার্ন রিফাইনারি ও সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এগুলো শুধু অবকাঠামোগত বিনিয়োগ নয়, বরং জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা ও কৌশলগত সক্ষমতা বাড়ানোর পদক্ষেপ। বর্তমানে আমরা পরিশোধিত জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল। নতুন রিফাইনারি স্থাপন করা গেলে আমরা আরো বেশি ক্রুড অয়েল পরিশোধন করতে পারব। তাতে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির প্রয়োজন কমবে। দেশের অভ্যন্তরেই মূল্য সংযোজন তৈরি হবে। অন্যদিকে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিংয়ের মাধ্যমে দ্রুত, নিরাপদ ও কম খরচে জ্বালানি খালাস করা যাবে। এতে লজিস্টিক ব্যয় কমানোর পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা ও দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে ছয় লাখ টন কয়লা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হয়েছে। যমুনা ও মেঘনা নদীর বালি থেকে জিরকন ও মোনাজাইটের মতো মূল্যবান খনিজ সংগ্রহের কাজও চলছে। মহেশখালীতে একটি ল্যান্ড-বেজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সরকারের সক্ষমতা কেমন বলে মনে করছেন?

বাজেটে সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাগুলো উচ্চাভিলাষী হলেও এগুলো বাস্তবভিত্তিক ও ভবিষ্যৎমুখী হিসেবে দেখতে হবে। বোঝা যাচ্ছে, সরকার জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং দেশীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের লক্ষ্যে একটি সুস্পষ্ট কৌশল নীতি অনুসরণ করেছে। কয়লা উৎপাদনের ক্ষেত্রে বড়পুকুরিয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের আছে, তাই কারিগরিভাবে ছয় লাখ টন কয়লা উৎপাদন অসম্ভব নয়। এছাড়া বড়পুকুরিয়ার দ্বিতীয় পর্যায় এবং দীঘিপাড়া কয়লা ক্ষেত্র উন্নয়নের উদ্যোগ দেশীয় জ্বালানি সম্পদের ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এক্ষেত্রে পরিবেশগত ভারসাম্য, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ এবং আধুনিক খনন ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে সরকারকে। যমুনা ও মেঘনা নদীর বালি থেকে জিরকন ও মোনাজাইটের মতো মূল্যবান খনিজ আহরণের উদ্যোগকে দেশের খনিজ সম্পদ ব্যবস্থাপনায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখি। তবে এটি একটি প্রযুক্তিনির্ভর ও বিশেষায়িত খাত। বাণিজ্যিকভাবে সফল হতে হলে উন্নত প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক মানের ড্রেজিং ব্যবস্থা, গবেষণা সক্ষমতা ও কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় প্রয়োজন হবে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব ও বেসরকারি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

মহেশখালী ল্যান্ড-বেইজড এলএনজি টার্মিনালটি বর্তমান ভাসমান এলএনজি টার্মিনালগুলোর তুলনায় দীর্ঘমেয়াদে বেশি স্থিতিশীল, নির্ভরযোগ্য ও ব্যয়-সাশ্রয়ী সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান গ্যাস চাহিদা মোকাবেলা ও শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকার এসব উদ্যোগের মাধ্যমে দেশীয় সম্পদের ব্যবহার ও জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বৃদ্ধিকে সমান্তরালভাবে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো সরকার শুধু আমদানিনির্ভর সমাধানের ওপর নির্ভর করছে না, বরং বাপেক্সের মাধ্যমে ব্যাপক ভূতাত্ত্বিক জরিপ, সিসমিক সার্ভে, নতুন কূপ খনন এবং অফশোর অনুসন্ধান কার্যক্রম সম্প্রসারণেও পরিকল্পনা নিয়েছে। ফলে জ্বালানি খাতে একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন আমরা দেখতে পাচ্ছি।

হ্যাঁ, এসবের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি মূল্য অস্থিরতা, অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। এ উদ্যোগগুলোর সফলতা নির্ভর করবে সময়মতো বাস্তবায়ন, সুশাসন, দক্ষ প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের সক্ষমতার ওপর।

বাজেটে সরকার বিদ্যুচ্চালিত যানবাহন ও ইভিতে কর ও শুল্ক মওকুফের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদিও এখনো এ ধরনের যান এখনো দেশে অতটাও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। তবে এখন বাজেটে এ বিষয়ে নির্দেশনা আসায় এটি আমাদের পরিবহন ব্যবস্থায় কেমন পরিবর্তন আনতে পারে?

বৈশ্বিক জ্বালানি ও জলবায়ুর বাস্তবতায় এটি শুধু পরিবহন খাতের কর সংস্কার নয়, বরং জ্বালানি খাতের জন্যও সময়োপযোগী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ। বাজেটে শুধু ব্যক্তিগত বৈদ্যুতিক গাড়ি নয়, বরং বৈদ্যুতিক বাস, ট্রাক, চার্জিং স্টেশন এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর জন্য প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। সরকার পরিবহন খাতের বিদ্যুতায়নকে একটি সমন্বিত রূপান্তর প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করছে, যার ফলে ভবিষ্যতে গণপরিবহন ব্যবস্থাকে বৈদ্যুতিকরণের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত ভিত্তি আরো শক্তিশালী হয়েছে। আমার মতে গণপরিবহন খাতেই দীর্ঘমেয়াদে এ উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সুফলভোগী হতে পারে, কারণ বাংলাদেশের পরিবহন খাতে ডিজেল ও অন্যান্য তরল জ্বালানির ব্যবহার অত্যন্ত বেশি। যদি ধীরে ধীরে বৈদ্যুতিক বাস ও গণপরিবহন ব্যবস্থা সম্প্রসারিত করা যায়, তাহলে জ্বালানি আমদানি নির্ভরতা কমবে, পরিচালন ব্যয় হ্রাস পাবে এবং সামগ্রিকভাবে পরিবহন খাতের দক্ষতাও বাড়বে। তবে বাস্তবতা হলো আমাদের দেশের অধিকাংশ গণপরিবহন ব্যক্তি মালিকানাধীন, ব্যক্তি মালিকানাধীন এবং অপারেটরদের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত। বৈদ্যুতিক বাসের প্রাথমিক ক্রয়মূল্য প্রচলিত ডিজেল বা সিএনজি বাসের তুলনায় বেশি হওয়ায় শুধু শুল্ক ও কর কমানোই যথেষ্ট হবে না। গণপরিবহনে এ রূপান্তরকে আরো গতিশীল করতে পরিবহন অপারেটরদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি এবং স্বল্প সুদে গ্রিন ফাইন্যান্সিং, বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে চার্জিং অবকাঠামো সম্প্রসারণ জরুরি। একই সঙ্গে বড় শহর ও আন্তঃজেলা রুটগুলোতে ধাপে ধাপে বৈদ্যুতিক বাস অন্তর্ভুক্তির জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন করা যেতে পারে।

বিষয়টি ইতিবাচক যে সরকার একদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের জন্য কর প্রণোদনা দিচ্ছে, অন্যদিকে পরিবহন খাতকে বিদ্যুতায়নের উদ্যোগ নিচ্ছে। এ দুই নীতির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় রয়েছে। ভবিষ্যতে যদি সোলার এবং অন্যান্য রিনিউয়েবল এনার্জি থেকে আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চাই, যার মাধ্যমে বৈদ্যুতিক যানবাহন পরিচালিত হবে, তাহলে বাংলাদেশের জ্বালানি রূপান্তর আরো টেকসই ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে। দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল হবে বহুমাত্রিক।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০৫০ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতের জন্য একটি স্ট্র্যাটেজি পেপার তৈরি করা হচ্ছে? এ কৌশলপত্র কেমন হওয়া উচিত বলে মনে করেন?

আমি মনে করি ২০৫০ সালের বিদ্যুৎ খাতের কৌশলপত্রকে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা হিসেবে দেখলে হবে না। সরকার এরই মধ্যে ২০২৬ থেকে ২০৫০ সময়কালের জন্য একটি নতুন কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এক্ষেত্রে কৌশলপত্রের পাঁচটি ভিত্তি থাকা দরকার। প্রথমত, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের পদক্ষেপ নেয়া। তারপর ব্যয় কার্যকারিতা ও আর্থিক স্থিতিশীলতা গড়ে তোলা। একই সময়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত সম্প্রসারণ করা জরুরি। পরিবেশগত সংবেদনশীল কৌশল নেয়ার মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনার উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত করা। অবশেষে আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে গোটা ব্যবস্থাপনাকে নিয়ে আসা। আমি আরো মনে করি, এ কৌশলপত্রে স্মার্ট গ্রিড, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (বেজ), স্ক্যাডা, জিআইএস, এএমআই প্রযুক্তির ডিমান্ড সাইড ম্যানেজমেন্ট, রুফটপ সোলার, ইউটিলিটি স্কেল সোলার প্রজেক্ট এবং আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের জন্য সুস্পষ্ট রোডম্যাপ অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়াতে হলে গ্রিডের নমনীয়তা ও বিদ্যুৎ সঞ্চয় প্রযুক্তির উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র, আর্থিক স্বচ্ছতা ও সুশাসনকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে, যাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং ভোক্তারা সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ পেতে পারেন। রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার বিষয়টিও এ দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ খাতে কর প্রণোদনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বেসরকারি বিনিয়োগ ও দেশীয় প্রযুক্তি উৎপাদনের বিষয়গুলো কৌশলপত্রে সমন্বিতভাবে প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন। এ পরিকল্পনা যেন বাস্তবসম্মত চাহিদা পূর্বাভাসের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিদ্যুৎ চাহিদা, জ্বালানি মূল্য, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও জলবায়ু ঝুঁকিকে বিবেচনায় রেখে একটি নমনীয় ও তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। সরকার এরই মধ্যে ক্ষমতা চার্জ, বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি ও লিস্ট কস্ট জেনারেশন নীতি পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি কৌশলপত্রে এ সংস্কারগুলো অন্তর্ভুক্ত হলে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতা আরো শক্তিশালী হবে এবং ভর্তুকির চাপও ধীরে ধীরে কমে যাবে।

সমুদ্রাঞ্চল থেকে গ্যাস উত্তোলনের জন্য ‘বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড’ ঘোষণা করা হয়েছে এবং বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে উৎপাদন বণ্টন চুক্তি সংশোধন করা হয়েছে। তবে অতীতে কোনো বিদেশী প্রতিষ্ঠান এক্ষেত্রে আগ্রহ দেখায়নি। এবার সরকার বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণে কী পদক্ষেপ নিতে পারে বলে মনে করেন?

এবারের বাজেটে নতুন অফশোর বিডিং রাউন্ড ঘোষণা এবং উৎপাদন বণ্টন চুক্তি বা প্রডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট সংশোধনের উদ্যোগকে প্রশংসা করতে হয়। সরকার যে দেশীয় সম্ভাবনাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে, এ উদ্যোগটিই তা বলে দিচ্ছে। অতীতে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলো যেগুলোকে আমরা আইওসিস বলি সেগুলো এ দরপত্রে পর্যাপ্ত আগ্রহ না দেখানোর পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ ছিল। এর মধ্যে অন্যতম ছিল সীমিত ভূতাত্ত্বিক তথ্যভাণ্ডার, দীর্ঘসূত্রতাপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়া এবং বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশার তুলনায় কম প্রতিযোগিতামূলক চুক্তি কাঠামো। সেই বিবেচনায় বর্তমান পিএসসি সংশোধন একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে আরো কয়েকটি বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে। প্রথমত, গ্যাসের মূল্য নির্ধারণে এমন একটি কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে, যা আন্তর্জাতিক বাজার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য বাণিজ্যিকভাবে আকর্ষণীয়। গভীর সমুদ্র অনুসন্ধান অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা স্বাভাবিকভাবেই একটি পূর্বাভাসযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক মূল্য কাঠামো প্রত্যাশা করে।

দ্বিতীয়ত, সরকারের উচিত উন্নতমানের টুডি ও থ্রিডি সিসমিক তথ্যভাণ্ডার আরো সমৃদ্ধ করা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজলভ্য করা। বিশ্বমানের জ্বালানি কোম্পানিগুলো বিনিয়োগের আগে নির্ভরযোগ্য ডেটা বিশ্লেষণ করে তারপর সিদ্ধান্ত নেয়। তাই সাম্প্রতিক জরিপের তথ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি কেন্দ্রগুলোতে বিনিয়োগ প্রচারণা ও রোড শো আয়োজন করা হলে আরো ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।

তৃতীয়ত, অনুমোদন, লাইসেন্সিং ও চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে আরো দ্রুত, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব করতে হবে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায় যে সম্পদের সম্ভাবনার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীরা প্রশাসনিক দক্ষতা ও নীতিগত পূর্বাভাসযোগ্যতাকেও সমান গুরুত্ব দেয়। তাছাড়া বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য মুনাফা প্রত্যাবাসন, বৈদেশিক মুদ্রা রূপান্তর ও আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে একটি নির্ভরযোগ্য ও স্বচ্ছ কাঠামো নিশ্চিত করাও প্রয়োজনীয়। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এসব বিষয় বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এক্ষেত্রে সরকার বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এমনটি করতে পারলে নতুন অনুসন্ধান রিগ সংগ্রহ, সিসমিক জরিপ সম্প্রসারণ ও অফশোর ব্লক উন্মুক্ত করার উদ্যোগ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সক্ষমতার একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় তৈরি করতে পারে। বিশ্বের সফল অফশোর গ্যাস উৎপাদনকারী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখতে পারি যে বিনিয়োগকারীরা শুধু সম্পদের সম্ভাবনা নয়, বরং সরকারের দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত প্রতিশ্রুতি, চুক্তি সুরক্ষা ও নিয়ন্ত্রক স্থিতিশীলতার ওপরও আস্থা রাখতে চায়। এজন্য নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বিষয়টিকেই সরকারকে বেশি জোর দিতে হবে।

আরও