গতকাল জাতীয় সংসদে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছেন। ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’—প্রতিপাদ্যে ঘোষিত এ বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবে অনুপ্রেরণামূলক, তবে এটি বাস্তবায়নের পথও ততটাই কঠিন। গত অর্থবছরের (২০২৫-২৬) সংশোধিত বাজেটের চেয়ে এবারের বাজেট ১৯ শতাংশ বেড়েছে। এর বিপরীতে সরকার ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আহরণ করতে হবে। বাকি ৯১ হাজার কোটি টাকা এনবিআর-বহির্ভূত কর ও কর-বহির্ভূত রাজস্ব থেকে আদায়ের কথা রয়েছে।
উচ্চাভিলাষী এ বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এ ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক উৎস ও অভ্যন্তরীণ খাত থেকে ঋণ নেবে সরকার। এদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চলতি বাজেটের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এনবিআরের জন্য প্রায় ৪ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা (সংশোধিত)। কিন্তু জুলাই থেকে এপ্রিল এই ১০ মাসে এনবিআর মাত্র ৩ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি। এ সময়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ৪০ দশমিক ৭ শতাংশ। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ খাতে অর্থছাড় হয়েছে খুবই কম। সংশোধিত বাজেটে ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ১৪ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে মূল লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি নিতে হয়েছে। ফলে রাজস্ব ঘাটতির ভার বহন করতে হয়েছে ব্যাংক খাতকেই। এমন এক প্রেক্ষাপটে এনবিআরকে যখন গত অর্থবছরের প্রকৃত আহরণের চেয়ে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা বেশি আহরণ করতে বলা হচ্ছে, তখন ঘাটতি পূরণে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা কতটা পূরণ হবে এ নিয়ে প্রশ্ন জাগে।
অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন থ্রি-আর অর্থাৎ পুনরুদ্ধার, উদ্ধার ও পুনর্গঠন—এ তিন ধাপের কৌশলের মাধ্যমে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা হবে। এজন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি, ডিরেগুলেশন বা বিনিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতের সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং সুশাসনের কৌশল নিয়েছে সরকার। প্রত্যেকটিই প্রয়োজনীয় হলেও এসব অঙ্গীকার পূরণে সফলতার বিষয়ে বিগত সময়ের সরকারের ব্যর্থতাই বারবার আমাদের বিচলিত করে। ডিরেগুলেশন বা বিনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে বাজেটে একটি পূর্ণ অধ্যায় রয়েছে। ব্যবসা সহজীকরণ, এক ছাদের নিচে লাইসেন্স সেবা, বিলম্ব হ্রাসের প্রস্তাব যুক্তিসংগত। তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ ‘ইজ অব ডুইং বিজনেস’ সূচকে বহু বছর ধরে তলার দিকে থেকেছে। আর্থিক খাত পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বর্তমানে ব্যাংক খাতে মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ, খেলাপি ঋণ মোট ব্যাংক ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এ সংকটগ্রস্ত খাতকে পুনর্মূলধনীকরণে চলতি বছরই ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হচ্ছে। অথচ একই ব্যাংক থেকে আবার বাজেট ঘাটতি মেটানোর জন্য ঋণ নিতে হচ্ছে। এমন চক্র আমাদের অর্থনীতির বড় দুর্বলতা। জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টিও বর্তমানে অর্থনীতির জন্য বড় চাপ। দেশে জ্বালানি ভর্তুকির চাপ বেড়ে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ফলে বাজেটের একটি বড় অংশই ভর্তুকিতে চলে যাবে।
প্রতিটি বাজেট মৌসুমেই বড় লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা হয়। অর্থনীতিবিদরা তা নিয়ে সংশয় জানান এবং বছর শেষে বড় ঘাটতি নিয়ে সংশোধিত বাজেট পেশ করতে হয়। কর-জিডিপি অনুপাত এখন মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। সরকার ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে তা ৯ দশমিক ৬ শতাংশে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে নিয়ে যেতে চায়। এদিকে অর্থমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন সংকীর্ণ করমিতি, কর ফাঁকির সংস্কৃতি এবং ডিজিটালাইজেশনের ঘাটতি এক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জ। এনবিআরকে রাজস্বনীতি ও রাজস্ব প্রশাসনে আলাদা করার প্রস্তাব দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় আছে। এ বাজেটেও তা উল্লেখ করা হয়েছে। কর অব্যাহতি হ্রাস, এসআরও-নির্ভর ছাড়ের সুবিধা কমানো এবং সংসদের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা ভালো পদক্ষেপ। কিন্তু এগুলো কার্যকর করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি দরকার শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা।
এবারের বাজেটের সব মূল্যায়ন অবশ্য সমালোচনামূলক নয়। কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে, যা আগের বছর ছিল ৮৭ হাজার কোটি টাকা। পাঁচ বছরে এটিকে জিডিপির ৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকারও আছে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির ১ শতাংশের কিছুটা ওপরে নিয়ে আসা এবং প্রতিটি ইউনিয়নে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তা করবে। এডিপিতে ৩ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং উন্নয়ন ব্যয়ের অনুপাত মোট বাজেটের ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত করা উৎপাদনমুখী বিনিয়োগের দিকে ঝোঁকার ইঙ্গিত দেয়। এছাড়া ডিরেগুলেশন অধ্যায়ে ওয়ান স্টপ ব্যবসায় নিবন্ধন সেবা, কাস্টমসে নীতি ও বাস্তবায়ন শাখা আলাদা করা এবং শুল্কমুক্ত গুদাম সুবিধা সম্প্রসারণের মতো সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে ব্যবসায় পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে ওয়ান স্টপ, আবার বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রণোদনা, কর্মসংস্থান বাড়াতে লক্ষ্যমাত্রা, ক্রিয়েটিভ হাব স্থাপনের পরিকল্পনা, ১৯টি সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণ, উদ্যোক্তা খাতে বরাদ্দ ও ফ্রিল্যান্সারদের আয় করমুক্ত রাখার মতো সিদ্ধান্ত অর্থনীতিতে গতি আনবে, যদি সুষ্ঠুভাবে নীতি বাস্তবায়ন করা যায়।
এবারের বাজেটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক ব্যাংক ঋণনির্ভরতা। বাজেট ঘাটতির ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা আসবে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে। এই পরিমাণ এমন একটি ব্যাংক খাত থেকে নেয়া হবে যার মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত এরই মধ্যে ঋণাত্মক। আইএমএফের ঋণ স্থায়িত্বশীলতা মূল্যায়নে বাংলাদেশকে এরই মধ্যে ‘নিম্ন’ ঝুঁকি থেকে ‘মধ্যম’ ঝুঁকির দেশে নামিয়ে আনা হয়েছে। বৈদেশিক ঋণ এখন ৮ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা আর অভ্যন্তরীণ ঋণ ১০ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা। সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। শুধু সুদ পরিশোধ করতেই মোট বাজেটের প্রায় ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ চলে যাবে। ‘ঋণ ফাঁদে’ পড়া এড়াতে হলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা, রাজস্ব আহরণ, ব্যয় সাশ্রয় এবং সুশাসনে একযোগে মনোযোগ দেয়া জরুরি।
বাজেটের আকার নয়, বরং বাস্তবায়নের মানই এ বাজেটের সফলতার মূলমন্ত্র হওয়া জরুরি। কারণ রাজস্ব বাস্তবতা না মেনে বাজেট প্রণয়নের সংস্কৃতি গড়লে সংশোধিত বাজেটের ঘাটতিই হয়ে ওঠে আসল বাজেট। এমনটি হলে গণতান্ত্রিক ও মানবিক অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়া কঠিন হয়ে পড়বে। সরকার যদি বিশাল আকারের এ বাজেট বাস্তবায়নের মানোন্নয়ন করতে চায় তাহলে সর্বাগ্রে ব্যাংক খাতের সংস্কার করতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়, দুর্বল ব্যাংকের একীভূতকরণ (প্রয়োজনে অবসায়ন) এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালনা নিশ্চিত না করলে বেসরকারি বিনিয়োগ ফিরবে না। সরকার বেসরকারি খাতকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকা বলে অভিহিত করেছে। বেসরকারি খাতকে উৎসাহ দেয়ার জন্য আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান যেন সুষ্ঠুভাবে তাদের আর্থিক প্রতিবেদন দাখিল করে তার বাধ্যবাধকতা ও আইনি কাঠামো রাখা জরুরি। এছাড়া এডিপি বাস্তবায়নের গুণগত মান বাড়াতে হবে। এডিপি বাস্তবায়নের হাত ৪০ শতাংশে আটকে থাকলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির সুফল সাধারণ মানুষ পাবে না। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও সরকারকে সংবেদনশীল হতে হবে। চলতি বছর মে মাসের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। সরকার তা ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামাতে চাইছে। কিন্তু জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, ভর্তুকি সমন্বয় এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে এটি কতটা অর্জনযোগ্য তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিএনপি সরকারের জন্য এবারের বাজেট রাজনৈতিকভাবে একটি বড় মুহূর্ত। দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর প্রথম বড় নীতি ঘোষণা। এবারের বাজেটে প্রতিশ্রুতি অসংখ্য, সংস্কারের সদিচ্ছাও স্পষ্ট। তবে বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সক্ষমতার যে দূরত্ব সেটাই উদ্বেগের বিষয়। দেশের ইতিহাসে বাজেট প্রতি বছর বড় হয়, প্রতিশ্রুতিও বাড়ে, কিন্তু কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ে না। রাজস্ব আহরণের ঘাটতি পূরণ হয় ব্যাংক ঋণ দিয়ে আর ব্যাংক খাতের ঋণ চাপ বাড়তে থাকে বেসরকারি বিনিয়োগকে সংকুচিত করে। এজন্যই সরকারকে বাজেট বাস্তবায়নের মানে জোর দিতে হবে। কর ফাঁকি রোধে কতটুকু প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি কার্যকর হলো, ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কতটুকু কমল, বেসরকারি বিনিয়োগ কতটুকু ফিরল—এ তিন সূচকই হবে পরের বছর এ বাজেটের আসল রিপোর্ট কার্ড। সেই পরীক্ষায় সরকার সফল হোক, এমনটিই প্রত্যাশা।