পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের চেয়ে রক্ষণাবেক্ষণের চ্যালেঞ্জ বেশি

পদ্মা ব্যারাজের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শুরু হবে নির্মাণ শেষ হওয়ার পরে। বাংলাদেশে অবকাঠামো নির্মাণের চেয়ে রক্ষণাবেক্ষণে দুর্বলতা বেশি দেখা যায়। সঠিক তদারকি না থাকলে স্পিলওয়ে, স্লুইসগেট এবং ড্রেজিং ব্যবস্থা দ্রুত অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে

বাংলাদেশে বড় প্রকল্প মানেই সাধারণ মানুষের মনে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জাগরণ। একদিকে সবার মনে আশা আর অন্যদিকে সংশয়। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পও সেই একই দ্বৈত অনুভূতির জন্ম দিয়েছে। প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার এ উদ্যোগকে সরকার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি সংকট, নদী শুকিয়ে যাওয়া, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং কৃষি সংকট মোকাবেলার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কি সত্যিই বাংলাদেশের নদীনির্ভর সভ্যতাকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ, নাকি আরেকটি উচ্চাভিলাষী প্রকল্প যার বাস্তবতা ভবিষ্যতের হাতে বন্দি?

অবশ্য পদ্মা ব্যারাজকে শুধু একটি অবকাঠামো হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে বাংলাদেশের পানি ও নদীকেন্দ্রিক রাজনীতি, কৃষি অর্থনীতি, জলবায়ু সংকট এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির মিলিত প্রতিফলন। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু নদী গত কয়েক দশকে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। গড়াই, মধুমতী, বড়াল, ইছামতী কিংবা চন্দনা-বারাশিয়ার মতো নদীগুলো কেবল ভৌগোলিক রেখা নয়। এটি এ অঞ্চলের অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং জনজীবনের ধারক ছিল। নদী শুকিয়ে যাওয়ার অর্থ শুধু পানির সংকট নয়, কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়া, মাছের প্রজাতি হারিয়ে যাওয়া, নৌপথ সংকুচিত হওয়া এবং মানুষের জীবিকা ধ্বংস হয়ে যাওয়াও।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি সংকটের পেছনে ফারাক্কা ব্যারাজের প্রভাব নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে উজানে পানি প্রত্যাহারের ফলে পদ্মা এবং তার শাখা নদীগুলোতে পানিপ্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ফলে নদীর তলদেশে পলি জমেছে, নাব্যতা নষ্ট হয়েছে এবং কোথাও কোথাও নদী কার্যত মৃত খালে পরিণত হয়েছে। একসময় যে অঞ্চলে নৌকাই ছিল প্রধান বাহন সেখানে এখন শুকনো নদীর বুকে ধুলা ওড়ে। এমন পরিস্থিতিতে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে অনেকেই বাংলাদেশের পানিনিরাপত্তার প্রতিরক্ষামূলক কৌশল হিসেবে দেখছেন। প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ এবং ২৯ লাখ হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ দেয়ার পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে উচ্চাভিলাষী। সরকার বলছে, এতে বছরে অতিরিক্ত ২৪ লাখ টন ধান এবং দুই লাখ টনের বেশি মাছ উৎপাদন সম্ভব হবে। যদি বাস্তবায়ন সফল হয়, তাহলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলে, কাগজের হিসাব আর বাস্তবতার নদী এক জিনিস নয়।

বাংলাদেশের নদীগুলো জীবন্ত সত্তার মতো আচরণ করে। তাদের গতিপথ বদলায়, চর জাগে, ভাঙন হয়, আবার নতুন স্রোতও তৈরি হয়। তাই নদীকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রতিটি প্রচেষ্টার মধ্যেই ঝুঁকি থাকে। পৃথিবীর বহু দেশে বড় বাঁধ বা ব্যারাজ নির্মাণের ফলে পরিবেশগত বিপর্যয়, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট হওয়া এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হওয়ার নজির রয়েছে। বাংলাদেশেও তিস্তা ব্যারাজ কিংবা গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্প নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, দুর্বল পরিকল্পনা এবং নদীর স্বাভাবিক গতিশীলতা সম্পর্কে সীমিত ধারণার কারণে প্রত্যাশিত সুফল পুরোপুরি মেলেনি। ফলে পদ্মা ব্যারাজের ক্ষেত্রেও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো এটি কি সত্যিই নদীকে পুনরুজ্জীবিত করবে, নাকি কেবল পানির প্রবাহকে কাগজে-কলমে পুনর্বিন্যাস করবে?

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পলি ব্যবস্থাপনা। পদ্মা বিশ্বের অন্যতম পলিবাহী নদী। ব্যারাজ নির্মাণের ফলে যদি স্বাভাবিক পলিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে নদীর নাব্যতা এবং অবকাঠামোর স্থায়িত্ব দুটোই হুমকির মুখে পড়তে পারে। বাংলাদেশে বহু প্রকল্পের মতো যদি ড্রেজিং কার্যক্রম দুর্নীতি, অদক্ষতা কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের শিকার হয়, তাহলে এ মেগা প্রকল্পও ধীরে ধীরে ব্যয়বহুল বোঝায় পরিণত হতে পারে। তবুও এ প্রকল্পকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল বাংলাদেশের সবচেয়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি। লবণাক্ততা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টি এবং নদী শুকিয়ে যাওয়ার ফলে কৃষি উৎপাদন কমছে। অনেক এলাকায় সুপেয় পানির সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এ অঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন বৈষম্যের অভিযোগ করে আসছে।

পদ্মা ব্যারাজ সফল হলে সেটি শুধু কৃষিতে নয়, সামাজিক কাঠামোতেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। পানিপ্রবাহ ফিরলে নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি আবার সক্রিয় হতে পারে। মৎস্যসম্পদ বাড়তে পারে, ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রসারিত হতে পারে, নৌযোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত হতে পারে। সাতটি স্যাটেলাইট শহর এবং পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে। কিন্তু এখানেও একটি সতর্কতা জরুরি। বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো প্রায়ই স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বাস্তব চাহিদার চেয়ে রাজনৈতিক প্রতীকী শক্তিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। পদ্মা সেতুর পর পদ্মা ব্যারাজও সহজেই জাতীয় গৌরবের প্রতীকে পরিণত হতে পারে। তখন প্রকল্পের কার্যকারিতা, পরিবেশগত প্রভাব কিংবা অর্থনৈতিক টেকসইতা নিয়ে সমালোচনাকে উন্নয়নবিরোধিতা হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। ৩৫ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির জন্য বিশাল বিনিয়োগ। তাই এ প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। নির্মাণ ব্যয়, জমি অধিগ্রহণ, ড্রেজিং, পুনর্বাসন এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন সবকিছুই জনসমক্ষে আনা প্রয়োজন। কারণ বাংলাদেশের মানুষ এরই মধ্যে বহু মেগা প্রকল্পে ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং দীর্ঘসূত্রতার অভিজ্ঞতা দেখেছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নদী পুনরুজ্জীবনের প্রশ্নকে কেবল প্রকৌশলগত সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। নদীকে বাঁচাতে হলে আন্তঃসীমান্ত পানি কূটনীতি, সুষ্ঠু নদী ব্যবস্থাপনা, অবৈধ দখল বন্ধ এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু একটি ব্যারাজ নির্মাণ করলেই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সব সংকট দূর হবে না। পদ্মা ব্যারাজ আসলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন দর্শনের একটি পরীক্ষা। এ প্রকল্প সফল হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল নতুন অর্থনৈতিক প্রাণ ফিরে পেতে পারে। ব্যর্থ হলে এটি আরেকটি ব্যয়বহুল স্মৃতিস্তম্ভে পরিণত হবে, যার পাশে শুকিয়ে যাওয়া নদী ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেবে যে প্রকৃতিকে কেবল কংক্রিট দিয়ে জয় করা যায় না।

বিশ্বজুড়ে আগামী সংঘাতের অন্যতম কারণ হিসেবে পানিকে দেখা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আফ্রিকা পর্যন্ত বহু অঞ্চলে পানি এখন কেবল প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, কৌশলগত শক্তি। বাংলাদেশও সেই বাস্তবতা থেকে আলাদা নয়। হিমালয়নির্ভর নদীগুলোর ওপর নির্ভরশীল একটি ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অস্তিত্বই অনেকাংশে নির্ভর করে উজানের পানিপ্রবাহের ওপর। ফলে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে কেবল অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন উদ্যোগ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যাবে না। ভারতের সঙ্গে পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের বিকল্প ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে। তিস্তা চুক্তির অমীমাংসিত অবস্থা এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতি একটি বাস্তব চাপ তৈরি করেছে। এ প্রেক্ষাপটে পদ্মা ব্যারাজকে অনেকেই জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। অর্থাৎ যতটুকু পানি পাওয়া যায়, সেটিকে আরো দক্ষভাবে সংরক্ষণ এবং বণ্টন করার চেষ্টা। তবে এখানে আরেকটি বাস্তবতা আছে। নদী কখনো একক দেশের সম্পদ নয়। পদ্মার প্রবাহ, পলি এবং পরিবেশগত চরিত্র বহুমাত্রিক। তাই ব্যারাজ নির্মাণের ফলে যদি নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতিতে বড় পরিবর্তন আসে, তাহলে ভবিষ্যতে নতুন পরিবেশগত এবং কূটনৈতিক জটিলতাও তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যখন বন্যা ও খরার চক্র আরো অনিশ্চিত হচ্ছে, তখন স্থির অবকাঠামো দিয়ে গতিশীল নদীকে নিয়ন্ত্রণ করা কতটা কার্যকর হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন।

বাংলাদেশের উন্নয়ন ইতিহাসে বড় প্রকল্পের একটি মনস্তাত্ত্বিক দিকও আছে। বিশাল অবকাঠামো মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে কাজ করে। পদ্মা সেতুর পর পদ্মা ব্যারাজও সেই আবেগকে শক্তিশালী করবে। কিন্তু উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য কংক্রিটের দৈর্ঘ্যে নয়, মানুষের জীবনে পরিবর্তনে মাপা উচিত। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষক যদি সেচ পায়, জেলে যদি নদীতে মাছ ফিরে পায়, গ্রামের মানুষ যদি নিরাপদ পানি পায়, তবেই এ প্রকল্প অর্থবহ হবে। একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, নদী কেবল অর্থনীতির উপাদান নয়, এটি সভ্যতার স্মৃতি। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে পদ্মা ব্যারাজ শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এটি বাংলাদেশের নদীমাতৃক পরিচয় পুনরুদ্ধারেরও এক প্রতীকী প্রচেষ্টা। কিন্তু প্রতীক দিয়ে নদী বাঁচে না। প্রয়োজন দক্ষতা, সততা, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

পদ্মা ব্যারাজের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শুরু হবে নির্মাণ শেষ হওয়ার পরে। বাংলাদেশে অবকাঠামো নির্মাণের চেয়ে রক্ষণাবেক্ষণে দুর্বলতা বেশি দেখা যায়। সঠিক তদারকি না থাকলে স্পিলওয়ে, স্লুইসগেট এবং ড্রেজিং ব্যবস্থা দ্রুত অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে। তখন নদী পুনরুজ্জীবনের স্বপ্ন আবার কাগজেই আটকে যাবে। এ কারণেই প্রকল্পটিকে শুধু প্রকৌশলীদের হাতে ছেড়ে দিলে চলবে না। পরিবেশবিদ, নদী গবেষক, স্থানীয় কৃষক, জেলে এবং নাগরিক সমাজকে সম্পৃক্ত করতে হবে। কারণ নদীর ভাষা সবচেয়ে ভালো বোঝে নদীর পাড়ের মানুষ। তাদের অভিজ্ঞতা ছাড়া কোনো নদী ব্যবস্থাপনাই পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।

পদ্মা ব্যারাজ তাই বাংলাদেশের সামনে একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও সতর্কবার্তা। এটি সফল হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভাগ্য বদলাতে পারে। ব্যর্থ হলে এটি প্রমাণ করবে, নদীর সঙ্গে লড়াই করে নয়, নদীকে বুঝেই টিকে থাকতে হয়। বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে উন্নয়ন এবং পরিবেশকে আর আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। পদ্মা ব্যারাজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে দেশ বড় প্রকল্পের মোহে আটকে থাকবে, নাকি বিজ্ঞান, জবাবদিহি এবং মানুষের বাস্তব প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে নতুন উন্নয়ন দর্শন গড়ে তুলবে। আগামী দিনে।

এইচ এম নাজমুল আলম: প্রভাষক, ইংরেজি বিভাগ, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি (আইইউবিএটি)

আরও