আইন ভেঙে ঢাকার ভালো মাঠ-পার্ক অভিজাত সোসাইটিকে দিচ্ছে রাজউক ও সিটি করপোরেশন

সবার সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিতে নগরীর পার্ক-মাঠ দখলমুক্ত করা হোক

২০২২ সালে রাজধানীর গুলশান ২ নম্বরে অবস্থিত শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি পার্ক সরকারি অর্থের প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনের পর সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

এর দুই বছরের মাথায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) পার্ক পরিচালনার দায়িত্ব দেয় গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের হাতে। বণিক বার্তার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তিনটি পার্কের চিত্র। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুলশান ইয়ুথ ক্লাব পার্কের নাম পরিবর্তন করে নিজস্ব অফিস, ক্যাফে এমনকি অন্য স্থাপনা গড়ে তুলেছে। এমনকি পার্কে খেলার জন্য ঘণ্টাপ্রতি হাজার থেকে আট হাজার টাকার ফি আদায় হচ্ছে। শুরুতেই সংস্থাটি বিদ্যমান আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়েছে। এদিকে একই এলাকার শহীদ ডা. ফজলে রাব্বি পার্ক উদ্বোধনের সময় দেশের প্রথম ‘স্মার্ট পার্ক’ বলে মনোযোগ পায়। পার্কটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকার কথা হলেও গুলশান-নিকেতন সোসাইটির নির্দেশনায় প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্ধ রাখা হয়। এভাবে স্থানীয় বাসিন্দাদের নির্মল বিনোদন ও শিশুদের খেলাধূলার অধিকারকে অভিজাতদের ইচ্ছের কারণে ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে। এছাড়া বনানীর কামাল আতাতুর্ক পার্ক থেকে ডিএনসিসি নিজেই মেলা, কনসার্টের মাধ্যমে রাজস্ব আয় করছে। তিনটির প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও একটি বিষয় স্পষ্ট। জনগণের অর্থে তৈরি এসব জনপরিসরে ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণাধীন আধা-বাণিজ্যিক স্থানে রূপ নিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে উন্মুক্ত এসব জনপরিসর দখল হয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

পার্ক ও খেলার মাঠ নগরের সবচেয়ে গণতান্ত্রিক স্থাপনার একটি। এখানে আয়, পরিচয় বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সবার সমান প্রবেশাধিকার থাকার কথা। গুলশান, বনানী বা ফজলে রাব্বি পার্কের ঘটনাগুলো দেখায়, কীভাবে ‘রক্ষণাবেক্ষণ’ ও ‘ব্যবস্থাপনা’র মতো প্রশাসনিক পরিভাষার আড়ালে ধাপে ধাপে জনপরিসর সংকুচিত হয়ে যেতে পারে এবং কীভাবে তদারক সংস্থাগুলো নিজেরাই এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়তে পারে। আইন স্পষ্ট থাকলেও তার প্রয়োগ নির্ভর করছে প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছা ও জবাবদিহির ওপর। মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান ও প্রাকৃতিক জলাধারের শ্রেণীর পরিবর্তন আনা যাবে না, ভাড়া বা ইজারা দেয়া ছাড়াও অন্য কোনো মাধ্যমে হস্তান্তর করা যাবে না এমনটি আইনে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে। তবে বিভিন্ন সময় পার্কের পরিচালনার দায়িত্ব বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার কাছে দেয়ার মাধ্যমেই আইনের ব্যত্যয় ঘটছে। এমনকি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সদিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতারও অভাব রয়েছে। শহরের অধিকাংশ পার্ক ও জলাশয়ের তত্ত্বাবধানে থাকে রাজউক ও সিটি করপোরেশন। এ দুই প্রতিষ্ঠান একই সঙ্গে পার্ক-মাঠের অভিভাবক এবং অনেক ক্ষেত্রে রাজস্ব আদায়ের কেন্দ্রে—এ দ্বৈত ভূমিকাই সমস্যার মূল কারণ। কামাল আতাতুর্ক পার্কের ক্ষেত্রে ডিএনসিসি নিজেই স্বীকার করেছে, তারা পার্কটি বিভিন্ন সংস্থাকে ভাড়া দিয়ে আয় করে। যে প্রতিষ্ঠানের কাজ হওয়া উচিত জনপরিসর সংরক্ষণ ও উন্মুক্ত রাখা, সেই প্রতিষ্ঠানই যখন সে স্থানকে আয়ের উৎস হিসেবে দেখে, তখন সংরক্ষণ ও বাণিজ্যিকীকরণের মধ্যে কাঠামোগত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। ফলে সংরক্ষণের কাজ ধারাবাহিকভাবে আর করা হয় না।

রাজস্ব আদায়ের আঙ্গিক বিবেচনায়ও দেশের পার্ক ও খেলার মাঠ পরিচালনার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো জাতীয় গাইডলাইন এখনো নেই। এজন্য পার্ক-মাঠ সাময়িক ‘ব্যবস্থাপনা’ কোন শর্তে, কতদিনের জন্য, কোন জবাবদিহির আওতায় কাকে দেয়া যাবে—তা পুরোপুরি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিবেচনার ওপর নির্ভর করে। আইন সাধারণভাবে শ্রেণী পরিবর্তন নিষিদ্ধ করলেও ‘ব্যবস্থাপনা চুক্তি’ নামক একটি অনির্দিষ্ট পরিভাষার আড়ালে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থেকে যায়। একসময় দুই সিটি করপোরেশনের অধীনে প্রায় ৭০টি খেলার মাঠ ছিল, এখন টিকে আছে মাত্র ২০টির মতো; দুই সিটি করপোরেশনের ১২৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৪১টিতে কোনো খেলার মাঠই নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত মাথাপিছু সবুজ পরিসরের তুলনায় ঢাকার প্রকৃত পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য। এ প্রেক্ষাপটে অভিজাত এলাকার সংস্কারকৃত, তুলনামূলক ভালো অবস্থায় থাকা পার্কগুলোও যখন সীমিত গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তখন প্রকৃতপক্ষে নাগরিকদের জন্য সহজলভ্য উন্মুক্ত স্থানের পরিমাণ আরও কমে যায়।

ঢাকায় অবস্থিত পার্কগুলো যেন সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে সেজন্য ডিএনসিসি ও রাজউককেই উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য প্রথমেই এ সংস্থাগুলোকে জনপরিসর হস্তান্তরের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের সর্বজনগ্রাহ্য নীতিমালা গড়তে হবে। ব্যক্তিগত বিবেচনায় যেন পার্কের দায়িত্ব হস্তান্তরের সুযোগ না থাকে সেজন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। রাজউক ও সিটি করপোরেশন নিজেরাই যেহেতু হস্তান্তরকারী পক্ষ হিসেবে রয়েছে তাই জনপরিসর তদারকির জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষণ সেল বা নাগরিক প্রতিনিধিত্বমূলক কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এমনকি ক্লাব বা সোসাইটিকে পার্ক বা জনপরিসর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেয়া হলে তার শর্তাবলি, মেয়াদ, ফি কাঠামোসহ সবকিছুর তথ্য সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। একবার বাণিজ্যিক ব্যবহার বা শ্রেণী পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া গেলে ওই প্রতিষ্ঠানকে স্থায়ীভাবে অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে যাতে সিলগালা ও পুনরায় হস্তান্তরের মতো পুনরাবৃত্তিমূলক চক্র বন্ধ হয়। একই সঙ্গে পার্ক-মাঠ ভাড়া দিয়ে আয়ের পরিবর্তে বিকল্প অর্থায়নের উৎস (যেমন বিজ্ঞাপন, সম্পত্তি কর সংস্কার) খুঁজতে হবে, যাতে রাজস্বের প্রয়োজনে জনগণের প্রবেশাধিকার বন্ধ করতে না হয়।

পার্ক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কমিউনিটিভিত্তিক মডেল অনুসরণ করা সবচেয়ে ভালো। ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব যদি কোনো স্থানীয় সংগঠনকে দিতেও হয়, তবে তা একটি একক অভিজাত সোসাইটির বদলে এলাকার বিভিন্ন আয়ের ও পেশার মানুষের প্রতিনিধিত্বশীল কমিটির হাতে দেয়া উচিত। এই কমিটির ওপর সিটি করপোরেশনের সরাসরি তত্ত্বাবধান বজায় রাখতে হবে। যে ৪১টি ওয়ার্ডে কোনো খেলার মাঠ নেই, সেগুলোয় বিস্তারিত এলাকা পরিকল্পনা (ডিএপি) অনুযায়ী অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নতুন মাঠ-পার্ক সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে অভিজাত এলাকার পার্ক নিয়ে বিতর্কের ফাঁকে নগরের প্রকৃত সংকট আড়ালে না পড়ে।

আরও