মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধ দিবস

উর্বর কৃষিজমি বাড়াতে চারণভূমি সংরক্ষণে গুরুত্ব দেয়া জরুরি

পরিবর্তনশীল বিশ্বে উর্বর ও সতেজ মাটির পরিমাণ সীমিত। পৃথিবীতে ফসল আবাদের উপযোগী উর্বর ভূমির পরিমাণ ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন হেক্টর, যা গোটা বিশ্বের ভূমির মাত্র ১০ শতাংশ।

মাটির পুষ্টিগুণ আর আবাদের সক্ষমতার ওপর ভূমি উর্বরতা নির্ভর করে। বর্তমান বিশ্বে ৮৩০ কোটি মানুষের জন্য খাদ্য উৎপাদনে সহায়তা করছে এ ১০ শতাংশ। ২০৫০ সাল নাগাদ ৯৫০ কোটি মানুষের জন্য খাদ্য উৎপাদনের চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। এজন্য মানুষের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে মাটিকে সতেজ ও দূষণমুক্ত রাখা জরুরি। তবে সীমিত উর্বর ভূমিও আজ মরুকরণ ও খরার কারণে বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে। ভবিষ্যতের স্বার্থে মাটির দূষণ কমিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত চারণভূমিগুলো উদ্ধার করে মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধের সঠিক ব্যবস্থাপনাও দরকার।

মরুকরণ ও খরা বাড়ায় নানাবিধ সমস্যার সমাধানে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রতি বছর ১৭ জুন বিশ্ব মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধ দিবস পালন করা হয়। এবারো দিবসটি বিশ্বের নানা দেশেই পালন করা হচ্ছে। চলতি বছর জাতিসংঘ দিবসটির প্রতিপাদ্য রেখেছে, ‘চারণভূমি: স্বীকৃতি, সম্মান, পুনরুদ্ধার’ (রেঞ্জল্যান্ডস: রেকগনাইজ, রেস্পেক্ট, রিস্টোর)। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের রাজশাহীকে কেন্দ্রবিন্দু ধরে শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার পশ্চিমে কাকনহাটে জাতীয়ভাবে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ১৯৯৫ সালে বিশ্ব মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়।

চারণভূমি বা উন্মুক্ত বিস্তীর্ণ ভূমি পৃথিবীর মোট স্থলভাগের প্রায় অর্ধেক জুড়ে বিদ্যমান। জলবায়ু সহনশীলতা, খাদ্য ও সুপেয় পানির নিরাপত্তা এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় চারণভূমির অবদান অপরিসীম। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রভাব যেমন বন্যা, খরা এবং লবণাক্ততা ব্যবস্থাপনা করে সমাজ, অর্থনীতি ও পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে চারণভূমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব, ভূমি দূষণ ও দখলের কারণে চারণভূমির অবনতি বর্তমান সময়ের একটি বৈশ্বিক ও স্থানীয় সমস্যা। বিশ্বজুড়ে চারণভূমি ও শুষ্ক অঞ্চলের পরিবেশের অবনতি হওয়ায় চারণভূমি এবং মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধিই এবারের প্রতিপাদ্যের প্রধান লক্ষ্য।

দীর্ঘ সময় ধরে চলা শুষ্ক আবহাওয়া, অপরিমিত বৃষ্টিপাত এবং অধিক পরিমাণে বাষ্পীভবন ও প্রস্বেদন হলে খরা অবস্থার সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশে খরা একটি মৌসুমি ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। খরা দেশের কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও জীবন জীবিকায় মারাত্মক প্রভাব ফেলে। বিশাল জনসংখ্যা আর জনঘনত্বের আমাদের এ বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে মানুষের বিভিন্ন চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাপক হারে বেড়েছে। মূলত জনসংখ্যা ও ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ বাড়ছে এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে (বাংলাদেশ ক্লাইমেট অ্যান্ড ডিজাস্টার রিস্ক অ্যাটলাস) বলা হয়, ১৯৭৮ ও ১৯৭৯ সালের খরায় দেশের প্রায় ৪২ শতাংশ জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ১৯৯৭ সালের খরায় কৃষিতে ৫০ কোটি ডলার সমপরিমাণ ক্ষতি মোকাবেলা করতে হয় বাংলাদেশকে। ওই প্রতিবেদনে দেশের ২২টি জেলা খরার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। মানুষের আবাসস্থল ভূমিকে আমাদের বিভিন্ন প্রয়োজনে নষ্ট করে ফেলেছি, এখন আমাদের প্রয়োজন এ ভূমিকে সম্মিলিতভাবে পুনরুদ্ধার করে খরা পরিস্থিতির প্রকোপ থেকে দেশকে রক্ষা করা। যদিও বিপর্যস্ত ভূমিকে কখনো পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এজন্য বন উজাড় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একটি দেশের স্বাভাবিক পরিবেশের জন্য মোট আয়তনের ২৫ ভাগ বনভূমি প্রয়োজন, কিন্তু সরকারি হিসাবে আমাদের দেশে ১৭ ভাগ বনভূমি বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে তা ১৩-১৪ ভাগের বেশি হবে না। তাই আমরা যদি খরা পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পেতে চাই, এখন থেকেই আমাদের পরিকল্পিত উপায়ে গাছ লাগাতে ও এর যথাযথ পরিচর্যা করতে হবে। খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের পক্ষে প্রতিরোধ করা কঠিন। তবে সময়মতো ব্যবস্থা নিলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।

মরুকরণের ফলে সামগ্রিক পরিবেশের ওপর নানা প্রভাব পড়ে। ১৯৭৭ ও ১৯৯৪ সালে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের মরু প্রক্রিয়াসংক্রান্ত সম্মেলনের বিবরণী থেকে দেখা যায়, পৃথিবীর প্রায় ৫ ভাগের ২ ভাগ এলাকা মরুভূমি হয়ে যাওয়ার ভয়াবহ হুমকির সম্মুখীন। প্রতি বছর প্রায় দুই লাখ বর্গমিটার ভূমি মরুতে পরিণত হচ্ছে। ১৯৯২ সালের রিও সম্মেলনে বিশ্বব্যাপী পরিবেশ বিপর্যয় রোধে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে মরুকরণ রোধ (১৯৯৬), জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ (১৯৯৩) ও বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তন (১৯৯৪) কাঠামো তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাংশের চারটি জেলার ৭ হাজার ২৯৬ বর্গমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত বরেন্দ্র এলাকায় মরু প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এ এলাকাগুলো প্রায় ভূমি ক্ষয়ের কবলে পড়ে, বৃষ্টির অভাবে প্রতি বছর খরা হয়। বিএনপি সরকার তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ ও ২০ হাজার কিলোমিটার খাল, নদী-নালা ও জলাধার খনন ও পুনঃখননের বিশাল কার্যক্রম গত জুনে উদ্বোধন করেছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এ কর্মসূচি খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধে একটি অত্যন্ত কার্যকরী প্রাকৃতিক সমাধান হিসেবে পরিবেশকে সুরক্ষিত করতে পারে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে লাগানো গাছগুলো যথাযথ পরিচর্যা করা গেলে গাছের শিকড় মাটিকে আঁকড়ে ধরে মাটির ক্ষয় রোধ ও পানি ধারণক্ষমতা বাড়াবে। এছাড়া বায়ুমণ্ডলে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বাড়িয়ে স্থানীয় তাপমাত্রা কমায়, যা খরাপ্রবণ এলাকায় বৃষ্টিপাত ঘটায় এবং মরুকরণ প্রক্রিয়া প্রতিরোধে সহায়ক হবে। অন্যদিকে দেশব্যাপী আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল, নদী-নালা ও জলাধার খনন এবং পুনঃখননের কর্মসূচিটি জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূগর্ভস্থ পানির সংকট মোকাবেলায় এ বিশাল পানি ব্যবস্থাপনা উদ্যোগটি মরুকরণ প্রক্রিয়াকে ধীর এবং একটি পর্যায়ে থামিয়ে দিতে পারে। মরুকরণ প্রক্রিয়ায় মাটির উপরিভাগের আর্দ্রতা পুরোপুরি হ্রাস পায়। যদি পরিকল্পিতভাবে এ কর্মসূচির মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে খাল, নদী-নালাগুলো খনন করা যায়, তাহলে শুষ্ক মৌসুমেও পর্যাপ্ত ভূ-উপরিস্থ পানি জমা থাকায় কৃষকদের মাটির গভীর থেকে পানি উত্তোলন করা লাগবে না। এছাড়া নদী-খাল থেকে সরাসরি পরিবেশবান্ধব সেচের মাধ্যমে মাটির প্রাকৃতিক পুষ্টিগুণ ও আর্দ্রতা বজায় থাকবে, যা মরুকরণ প্রক্রিয়াকে ধীর করবে।

মরুকরণ ও খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কখনো প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। সুতরাং সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা, অর্থনৈতিক কার্যকলাপ, জনসংখ্যা ও পশুসম্পদের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য আমাদের সবাইকে স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নতুন সরকারের এসব উদ্যোগ ছাড়াও জাতিসংঘের নীতি অনুসারে নিম্নোক্ত উপায়ে খরা ও মরুকরণ প্রক্রিয়াকে ব্যবস্থাপনা করা যেতে পারে। এজন্য দেশের মোট আয়তনের ২৫-৩০ শতাংশ বনভূমি সৃষ্টি ও বনভূমি সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় আইন তৈরি এবং বাস্তবায়ন করা, বাড়ন্ত উদ্ভিদের যত্ন ও সংরক্ষণ, নিয়মিত আগাছা এবং লতাগাছ কেটে পরিষ্কার করা, পরিমিত পরিমাণে পানির ব্যবহার নিশ্চিত করা, চাষাবাদে অতিরিক্ত পানির ব্যবহার বর্জন, নিয়মিত নদী ও খালের নাব্য সংরক্ষণ করা, সংযুক্ত খাল কেটে পানির নিয়মিত প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং ভূগর্ভস্থ পানির নিয়মিত রিচার্জের ব্যবস্থা করা ভালো সমাধান হতে পারে।

ড. মো. ইকবাল সরোয়ার: অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও