ছোটবেলায় কোরবানির ঈদের দিন মাংস কাটা বা রাখার জায়গায় পাহারাদার হিসেবে আমাদের অনেককেই দাঁড় করিয়ে দেয়া হতো। কেন? যেন কাকের চঞ্চু ঠোঁটের শিকার থেকে মাংসের টুকরা বাঁচানো যায়। কিন্তু মনে করুন তো, এবারের ঈদে কাক দেখেছেন কি?
কেবল ঈদের দিন নয়, এক সময় গ্রামে-শহরের সকালের রোদে কাকের দেখা মিলত। কখনো বাড়ির উঠানে টাঙানো রশি, জানালার কার্নিশ, পথের বৈদ্যুতিক খুঁটি বা তারে, গাছের মগডাল, ময়লার ভাগাড় বা আধুনিক ডাস্টবিনে হরহামেশাই কাক দেখা যেতো। সবার কাছে কাক পরিচিতি পায় প্রকৃতির ঝাড়ুদার হিসেবে, পরিচ্ছন্নতার কাছে নিয়োজিত থাকে বলে। উচ্ছিষ্ট খেয়ে মানুষকে পচা খাবারের দুর্গন্ধ থেকে রেহাই দিত।
শুধু কি তাই! কাকের উপস্থিতি মানবজীবনে এতই সরব যে বাংলায় প্রবাদ-প্রবচন পাওয়া যায় এই পাখির বৈশিষ্ট্য ঘিরে। যেমন ধৈর্য্যশীল মানুষ বোঝাতে বলা হয় তীর্থের কাক, দীর্ঘায়ু বোঝাতে বলা হয় ভূষণ্ডির কাক। তবে সবচেয়ে প্রচলিত হলো ‘কাক ডাকা ভোর’ বা ‘কাক ভেজা বৃষ্টি’। আর ‘The Thirsty Crow’ গল্প কার না জানা। কাক বুদ্ধিমানও বটে।
আবার চিত্রশিল্পীদের ক্যানভাসে রূপক হিসেবে কাক উঠে এসেছে, কখনো কেবল কাক হিসেবেই। এক্ষেত্রে মনে পড়ে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আঁকা তীর্যক চাহনিরত কাকের ছবি, কখনো মনে পড়ে দুর্ভিক্ষে মৃতপ্রায় মানুষের ওপর বসে থাকা নিঃসঙ্গ কাকের কথা।
জয়নুল আবেদিনের আঁকা দুর্ভিক্ষের ছবি
যুগে যুগে কবিতায়ও কাকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। কবি শামসুর রহমান লিখেছেন, ‘নগ্ন রৌদ্র চতুর্দিকে, স্পন্দমান কাক, শুধু কাক’। কবি জীবনানন্দ দাশ লিখে গেছেন, ‘প্রান্তরের কুয়াশায় দেখিনি কি উড়ে গেছে কাক’।
এসব প্রবাদ, চিত্রকর্ম, কবিতায় কাকের উপস্থিতি এটাই নিশ্চিত করে যে আবহমানকাল ধরে দেশে কাকের আধিক্য ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু বর্তমানে কাক দেখা গেছে কিনা প্রশ্ন করলে মানুষকে কষ্ট করে মনে করতে হয় উত্তর, তখন বিনা পরিসংখ্যানেও বলা যায় যে কাকের সংখ্যা কমে গেছে। এতটাই কমে গেছে যে সচারচর তার দেখা মিলছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাকের বিলুপ্তির পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম কাকের আবাসস্থল ও খাদ্য সংকট। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও নগরায়নের চাপে শহর-গ্রাম উভয় স্থানেই গাছ ও জলাধারের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। আবার বর্তমানে খাবারের উচ্ছিষ্ট, বিশেষত শহরে ডাস্টবিনে ফেলা হয়। কিন্তু বেশিরভাগ সময় ডাস্টবিনের খাদ্যে এমন বর্জ্যে পদার্থ থাকে যা কাকের দেহে বিষক্রিয়া ঘটাতে পারে। সবমিলিয়ে কাকের সংখ্যা কমছে।
কাকের বিলুপ্তি কমিয়ে আনতে হলে পদক্ষেপও বহুমুখী হওয়া চাই। প্রথমত বাসা-বাড়িতে কাক বা পাখিদের জন্য আলাদাভাবে খাবার রাখা। তাদের দেখলে তাড়িয়ে না দেয়া। এর বাইরে দীর্ঘমেয়াদে কিছু উদ্যোগ নিতে হবে। যেমন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। খাদ্য বর্জ্য যেন আলাদাভাবে ডাস্টবিনে রাখা হয় সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
মনে রাখা প্রয়োজন, কাকের সংখ্যা কমে যাওয়া কেবল কাকের বিলুপ্তিকেই নির্দেশ করছে না। আমাদের জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্রেও যে বড় পরিবর্তন এসেছে এটি তার সতর্কবার্তা। আর কেবল কাক নয়, অনেক পাখির সংখ্যাও এরই মধ্যে লক্ষণীয় মাত্রায় কমে গেছে। অথচ যেকোনো পাখি স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।