এল নিনো

প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতা থেকে বৈশ্বিক আবহাওয়ায় অস্থিরতা

বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোয় এল নিনোর প্রভাব সাধারণত তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও অনিয়মিত বৃষ্টির মাধ্যমে দেখা যায়। অনেক সময় বর্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যাও হতে পারে

পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থায় কিছু প্রাকৃতিক ঘটনা আছে, যেগুলোর প্রভাব হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের দেশেও অনুভূত হয়। তেমনই একটি ঘটনা এল নিনো। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টি, খরা ও অস্বাভাবিক আবহাওয়ার আলোচনায় শব্দটি বারবার সামনে আসছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সঙ্গে মিলিত হয়ে এল নিনো এখন আরো ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে।

এল নিনো কী?

এল নিনো প্রশান্ত মহাসাগরকেন্দ্রিক একটি জলবায়ুগত ঘটনা। সাধারণত পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত বায়ু দুর্বল হয়ে পড়লে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।

স্প্যানিশ ভাষায় ‘এল নিনো’ শব্দের অর্থ ‘ছোট ছেলে’ বা ‘খ্রিস্টশিশু’। পেরুর জেলেরা শত বছর আগে বড়দিনের সময় উষ্ণ স্রোত দেখা দিলে এ নাম ব্যবহার শুরু করেন।

কেন তৈরি হয় এল নিনো?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর মূল কারণ সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলের পারস্পরিক পরিবর্তন। স্বাভাবিক অবস্থায় পূর্ব দিকের বায়ু সমুদ্রের উষ্ণ পানিকে এশিয়ার দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু এ বায়ু দুর্বল হলে উষ্ণ পানি পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ে। তখন সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়ে যায় এবং বায়ুমণ্ডলের চাপের ভারসাম্য বদলে যায়।

নাসার তথ্যানুযায়ী, এল নিনোর সময় সমুদ্রের উষ্ণ পানি দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের দিকে সরে আসে এবং স্বাভাবিক বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে যায়। এতে বিশ্বজুড়ে বৃষ্টি, তাপমাত্রা ও ঝড়ের ধরনে বড় পরিবর্তন দেখা দেয়। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বলছে, এল নিনো সাধারণত প্রতি ২-৭ বছর পরপর দেখা দেয় এবং এটি ৯-১২ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ায় কী প্রভাব পড়ে?

বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোয় এল নিনোর প্রভাব সাধারণত তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও অনিয়মিত বৃষ্টির মাধ্যমে দেখা যায়। অনেক সময় বর্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যাও হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহে এল নিনোর প্রভাব স্পষ্ট। দক্ষিণ এশিয়ায় চলতি বছর ৪৫-৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। কৃষি, জনস্বাস্থ্য ও শ্রমনির্ভর অর্থনীতিতে এর বড় প্রভাব পড়ছে।

বিশেষ করে—

  • ফসল উৎপাদন কমে যেতে পারে
  • বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যায়
  • পানি সংকট তৈরি হয়
  • হিটস্ট্রোক ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগ বাড়ে
  • নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন

ছবি: রয়টার্স

বাংলাদেশ কতটা ঝুঁকিতে?

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো অনেকাংশে কৃষি ও আবহাওয়ানির্ভর। ফলে দীর্ঘ তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বর্ষা ও খরার প্রভাব সরাসরি খাদ্য উৎপাদনে পড়ে। একই সঙ্গে শহরাঞ্চলে তাপদাহ জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি করছে। বাংলাদেশে আবহাওয়া বিভাগের তথ্যানুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশে তাপপ্রবাহের সংখ্যা ও স্থায়িত্ব দুটোই বেড়েছে।

কী করণীয়?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনো ঠেকানো সম্ভব নয়, কারণ এটি একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত প্রক্রিয়া। তবে এর ক্ষতি কমানো সম্ভব।

করণীয়গুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • আগাম আবহাওয়া সতর্কতা জোরদার করা
  • তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা
  • শহরে সবুজায়ন ও তাপ সহনশীল অবকাঠামো বাড়ানো
  • কৃষিতে খরাসহনশীল ফসল ব্যবহার
  • শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মঘণ্টা নির্ধারণ
  • পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা উন্নত করা

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে এল নিনো শুধু আবহাওয়ার ঘটনা নয়; এটি অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। তাই অভিযোজন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিকল্প নেই।

আরও