আনুমানিক ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি বাদুড় এসে জড়ো হয় কাসানকার বনে

জাম্বিয়ার ন্যাশনাল পার্কে স্তন্যপায়ী প্রাণীর বৃহত্তম পরিযান

প্রতিটি বাদুড়ের ওজন মাত্র ২৫০ গ্রাম হলেও এদের ডানার বিস্তার প্রায় এক মিটার। প্রতি রাতে ওড়ার জন্য এরা প্রচুর ক্যালোরি খরচ করে এবং নিজেদের ওজনের সমান ফল এক রাতেই সাবাড় করতে পারে। সে হিসাবে, এক এক রাতে ৮০ লক্ষ থেকে ১ কোটি বাদুড় মিলে প্রায় ২৩০ থেকে ২৫০ টন বুনো ফল খেয়ে ফেলে

সূর্য ডুবুডুবু, বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। ঠিক এ মুহূর্তে বনের কোনো এক প্রান্ত থেকে একযোগে জেগে ওঠে কোটি কোটি প্রাণ। চারপাশ ভরে ওঠে কিচিরমিচির, শিস আর তীক্ষ্ণ চিৎকারে। প্রথমে গুটি কয়েক, তারপর একে একে হাজার, লক্ষ, কোটি বাদুড় ডানা মেলে আকাশে। চোখের পলকে পুরো আকাশটা জীবন্ত ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়। সংখ্যার বিচারে পৃথিবীর বুকে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের সবচেয়ে বড় পরিযান বা অভিবাসন এটিই।

বিস্ময়কর এ ঘটনাটি ঘটে জাম্বিয়ার কাসানকা ন্যাশনাল পার্কে। কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত এ জাতীয় উদ্যানটির আয়তন মাত্র ৩৯০ বর্গকিলোমিটার। দিনভর উদ্যানের লেগুন ও প্যাপাইরাস বনের গাছের ডালে ডালে ঝুলে থাকে লাখ লাখ ‘স্ট্র-কালারড ফ্রুট ব্যাট’ বা খড়-রঙা বাদুড়। ডানা থাকায় অনেকে এদের পাখি ভেবে ভুল করলেও, এরা মূলত স্তন্যপায়ী প্রাণী। ডালপালার চেয়ে তারা পরস্পরকে এত শক্ত করে আঁকড়ে ধরে থাকে যে, ভারী ওজনে গাছের ডালগুলো নুয়ে পড়ে। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে মধ্য আফ্রিকা জুড়ে বুনো ফলের ফলন বাড়লে, সে লোভে আনুমানিক ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি বাদুড় এসে জড়ো হয় কাসানকার এ ছোট্ট বনে।

গবেষকদের মতে, এ প্রাণীদের পরিযানের পরিধি ও ক্ষমতা অবিশ্বাস্য। প্রতিটি বাদুড়ের ওজন মাত্র ২৫০ গ্রাম হলেও এদের ডানার বিস্তার প্রায় এক মিটার। প্রতি রাতে ওড়ার জন্য এরা প্রচুর ক্যালোরি খরচ করে এবং নিজেদের ওজনের সমান ফল এক রাতেই সাবাড় করতে পারে। সেই হিসাবে, এক এক রাতে ৮০ লক্ষ থেকে ১ কোটি বাদুড় মিলে প্রায় ২৩০ থেকে ২৫০ টন বুনো ফল খেয়ে ফেলে! আর কাসানকায় অবস্থানকালীন পুরো সময়ে এরা সাবাড় করে প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার টন ফল।

পরিবেশবিদদের মতে, বনায়ন ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এদের ভূমিকা যেকোনো বড় স্থলচর প্রাণীর চেয়ে বেশি। কাসানকা ট্রাস্টের বোর্ড সদস্য এবং পরিবেশবিদ হেলেন টেইলর-বয়েড বলেন, এরা ফল খাওয়ার পর দূর-দূরান্তে মলত্যাগের মাধ্যমে বীজ ছড়িয়ে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, হাতিসহ অন্যান্য অনেক স্থলচর প্রাণীর চেয়েও অনেক দূর পর্যন্ত বীজ সফলভাবে ছড়িয়ে দিতে পারে এই ডানাওয়ালা স্তন্যপায়ীরা।

২০০৫ সালে এক গবেষণায় চারটি বাদুড়ের গায়ে সোলার-পাওয়ার্ড ট্র্যাকিং ডিভাইস বসিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি বাদুড় প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে। এর মধ্যে ‘হারকিউলিস’ নামের একটি বাদুড় উড়েছিল ২ হাজার ৪০০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ!

সাধারণত প্রতি বছরের অক্টোবরের শেষ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত কাসানকার এ উদ্যানে তাদের রাজত্ব চলে। তবে তারা ঠিক কোথা থেকে আসে এবং কাসানকা ছেড়ে জানুয়ারির দিকে কোথায় চলে যায়, সে রহস্যের জট আজও পুরোপুরি খোলেনি। প্রকৃতির বুকে এটি আজও এক অপার বিস্ময়।

আরও