কম্প্যানিয়ন ইকোনমি: চীনে একাকীত্বকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে কোটি টাকার ব্যবসা

চীনে এখন এমন পেশাদার মানুষ পাওয়া যায়, যারা টাকার বিনিময়ে আপনার সাথে সিনেমা দেখবে, রেস্তোরাঁয় খাবে, শপিংয়ে যাবে কিংবা পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে ব্যাগ বয়ে দেবে ও ছবি তুলে দেবে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের মতে, এ খাতের আর্থিক মূল্য বর্তমানে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ইউয়ান

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চীনে একাকীত্ব ব্যাপক সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ১৪০ কোটি জনসংখ্যার দেশটির ২০ কোটিরও বেশি মানুষ বর্তমানে তীব্র একাকীত্বে ভুগছেন। ভুক্তভোগীরা অধিকাংশই তরুণ। তবে এ মানসিক সংকটকে পুঁজি করেই দেশটিতে গড়ে উঠেছে আকর্ষণীয় ও বৈচিত্র্যময় সব ব্যবসায়িক উদ্যোগ। যার পোশাকি নাম ‘কম্প্যানিয়নের ইকোনমি’ বা সহযাত্রী অর্থনীতি।

টাকা দিলেই মিলবে সঙ্গী

ব্যস্ত জীবন আর দীর্ঘ কর্মঘণ্টার চাপে চীনের তরুণদের নিজস্ব কোনো সামাজিক জীবন নেই বললেই চলে। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়া বা প্রেম করার সময়টুকুও তাদের মিলছে না। আর এ শূন্যতা পূরণ করছে ‘পেইড সঙ্গী’।

চীনে এখন এমন পেশাদার মানুষ পাওয়া যায়, যারা টাকার বিনিময়ে আপনার সাথে সিনেমা দেখবে, রেস্তোরাঁয় খাবে, শপিংয়ে যাবে কিংবা পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে ব্যাগ বয়ে দেবে ও ছবি তুলে দেবে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের মতে, এ খাতের আর্থিক মূল্য বর্তমানে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ইউয়ান!

এখানেই শেষ নয়, ২০২৫ সালে দেশটিতে ‘দেমুমু’ নামের একটি মোবাইল অ্যাপ চালু হয়। একাকী মানুষের জরুরি মুহূর্তে অপরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগের এ অ্যাপটির জনপ্রিয়তা এখন আকাশচুম্বী। বর্তমানে এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় এক কোটি। প্রথমে বিনামূল্যে সেবা দিলেও বর্তমানে এটি একটি পেইড সার্ভিসে পরিণত হয়েছে, যার মাসিক সাবস্ক্রিপশন ফি ৮ ইউয়ান। মাত্র ১ হাজার ইউয়ান খরচ করে বানানো এ অ্যাপের ১০ শতাংশ মালিকানা বিক্রির জন্য ১ কোটি টাকারও বেশি প্রস্তাব দেয়া হয়েছে!

কেন এ অদ্ভুত প্রবণতা?

চীনে তরুণদের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি বর্তমানে বেশ বিতর্কিত। ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের মতে, ক্রমবর্ধমান যুব বেকারত্বের কারণে অনেক তরুণ পণ্য সরবরাহ, রাইড শেয়ারিং ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অস্থায়ী এবং ‘ফ্লেক্সিবল’ কাজ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। আর এ কাজের পেছনেই তাদের দিনের সিংহভাগ সময় চলে যাচ্ছে, যা কেড়ে নিচ্ছে তাদের বিনোদন ও সামাজিক যোগাযোগের সময়। এ ব্যস্ততা ও সীমিত অবসরের কারণেই ‘পেইড’ সঙ্গী বেছে নেয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

সমাজবিজ্ঞানীরা অবশ্য ভিন্ন কথা বলছেন। তাদের মতে, বর্তমান তরুণ সমাজ তীব্র ‘প্রত্যাখ্যানের ভয়ে’ ভোগে। নতুন কারো সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে যে সময় ও মানসিক শ্রম দিতে হয়, ব্যস্ত জীবনে সেই ঝুঁকি তরুণরা নিতে চায় না। সাইকোথেরাপিস্টদের মতে, বাস্তব সম্পর্কে ‘না’ শোনার ভয় থাকে, কিন্তু পয়সা খরচ করে সঙ্গী ভাড়া করলে সবসময় ‘হ্যাঁ’ উত্তর পাওয়া যায়।

সংকট নাকি সুযোগ?

একদিকে যখন একাকীত্ব সমাজকে গ্রাস করছে, অন্যদিকে চীনের বেকার তরুণ ও শিক্ষার্থীদের জন্য এটি হয়ে উঠেছে আয়ের দারুণ উৎস। ২৪ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী টাং জুনক্সিং যেমন জানালেন, মানুষকে ঘুরিয়ে আর গাড়ি চালিয়েই তিনি মাসে প্রায় ৭০ হাজার টাকা আয় করছেন। তার প্রধান গ্রাহক মূলত তরুণীরা, যারা একটু মানসিক শান্তি আর নিরাপদে ঘোরার জন্য এ অর্থ খরচ করতে দ্বিধা করেন না।

আরও