সিনেমা হলের মৃত্যু নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী নতুন নয়। একসময় বলা হতো— সিনেমাকে শেষ করে দেবে টেলিভিশন। পরে একই কথা শোনা গেছে হোম ভিডিও, স্যাটেলাইট টিভি, ওটিটি প্লাটফর্ম এবং সর্বশেষ কভিড-১৯ মহামারীকে ঘিরে। কিন্তু বারবার সংকটের মুখোমুখি হয়েও প্রেক্ষাগৃহ টিকে আছে। সম্প্রতি প্রকাশিক বিশেক চৌহানের বই ‘সিনেমাস ফরএভার’ সেই দীর্ঘ সংগ্রাম, পরিবর্তন ও টিকে থাকার গল্পই তুলে ধরেছে।
বইটি নিয়ে দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বলিউড হাঙ্গামা। যেখানে সিনেমার এ বাকবদল-কে ভারতীয় সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে।
১৯৪০-এর দশক ছিল যুক্তরাষ্ট্রে সিনেমার স্বর্ণযুগ। ১৯৪৭ সালে দেশটিতে প্রায় ১৮ হাজার প্রেক্ষাগৃহ ছিল। তখন সিনেমা ছিল গ্রোসারি পণ্য ও মোটরগাড়ির পর যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় বৃহত্তম খুচরা ব্যবসা। প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৯ কোটি মানুষ সিনেমা দেখতে যেত, যা ছিল দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশ। ওই বছরই যুক্তরাষ্ট্রে রেকর্ড ৪৭০ কোটি সিনেমার টিকিট বিক্রি হয়েছিল।
তবে একই সময় শুরু হয় নতুন চ্যালেঞ্জ। ১৯৪৭ সালে প্রায় ১০ লাখ মার্কিন পরিবারের কাছে টেলিভিশন ছিল। ১৯৫৪ সালের মধ্যে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২ কোটি ৬০ লাখে। ফলে প্রেক্ষাগৃহে দর্শক কমতে শুরু করে। ১৯৭০ সালের মধ্যে বার্ষিক টিকিট বিক্রি নেমে আসে মাত্র ১০০ কোটিতে। অর্থাৎ ২৩ বছরে সিনেমা হলের দর্শকসংখ্যা প্রায় ৭৫ শতাংশ কমে যায়।
এ সংকট মোকাবিলায় জন্ম নেয় মাল্টিপ্লেক্স ধারণা। ১৯৬৩ সালে এএমসির স্ট্যানলি ডারউড বিশ্বের প্রথম স্বীকৃত মাল্টিপ্লেক্স চালু করেন। এক ছাদের নিচে একাধিক সিনেমা প্রদর্শনের মাধ্যমে এ মডেল ব্যবসাকে নতুন প্রাণ দেয়। পরে এটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে ভারতের শহরাঞ্চলে সিনেমা প্রদর্শনের ধরন বদলে দেয়।
তবে বিশেক চৌহানের মতে, ভারতের ভবিষ্যৎ শুধু বিলাসবহুল মাল্টিপ্লেক্সের ওপর নির্ভর করতে পারে না। কারণ ভারতের মূল সমস্যা দর্শকের আগ্রহ নয়, বরং প্রেক্ষাগৃহের ঘাটতি।
বর্তমানে ১৪০ কোটির বেশি জনসংখ্যার দেশে বছরে প্রায় ৯০ কোটি সিনেমার টিকিট বিক্রি হয়। অন্যদিকে ৩৪ কোটির যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৪ সালে বিক্রি হয়েছে ৮০ কোটিরও বেশি টিকিট, যা তাদের জনসংখ্যার প্রায় আড়াই গুণ। ভারতের মাথাপিছু সিনেমা দেখার হার যদি যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি পৌঁছায়, তাহলে বছরে ৩৫০ কোটিরও বেশি টিকিট বিক্রি সম্ভব।
এ সম্ভাবনার বড় বাধা পর্দার সংখ্যা। ভারতে বর্তমানে প্রায় ৯ হাজার ৭০০টি স্ক্রিন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে প্রায় ৪২ হাজার এবং চীনে প্রায় ৮১ হাজার। মাত্র ৫ কোটি ২০ লাখ মানুষের দেশ দক্ষিণ কোরিয়াতেও স্ক্রিনের সংখ্যা ২ হাজার ৭০০-এর বেশি।
চৌহানের মতে, ভারতের প্রয়োজন আরো ২০-৩০ হাজার নতুন প্রেক্ষাগৃহ, বিশেষ করে ছোট শহর ও গ্রামীণ অঞ্চলে। এসব হলকে বিলাসবহুল হতে হবে না; বরং সাশ্রয়ী, সহজপ্রাপ্য এবং কম পরিচালন ব্যয়ের হতে হবে। তবেই বৃহত্তর জনগোষ্ঠী আবার সিনেমা হলে ফিরবে।
ভারতের অতীতও দেখায় যে প্রেক্ষাগৃহ সংস্কৃতি একসময় কতটা শক্তিশালী ছিল। ১৯৫০ সালে দেশে প্রায় ৩ হাজার ৩৪৮টি সিনেমা হল ছিল। ১৯৭১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ হাজার ৯৮৭টিতে। ১৯৭৩ সালে শুধু তামিলনাড়ুতেই ছিল ১ হাজার ২৩৮টি এবং অন্ধ্র প্রদেশে ১ হাজার ১২২টি প্রেক্ষাগৃহ। দক্ষিণ ভারতে যে শক্তিশালী সিনেমা সংস্কৃতি আজও দেখা যায়, তার শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত।
সিনেমা শিল্পের আরেক বড় পরিবর্তন আসে হোম ভিডিওর মাধ্যমে। ১৯৪৮ সালে প্রেক্ষাগৃহ থেকে চলচ্চিত্রের শতভাগ আয় আসত। কিন্তু ১৯৯৮ সালে সেই হার নেমে আসে ১৯ শতাংশে। ভিএইচএস, ভিসিডি ও ডিভিডির বাজার দ্রুত বিস্তৃত হয় এবং চলচ্চিত্রের জন্য নতুন আয়ের পথ খুলে দেয়।
ভারতেও হোম ভিডিও একসময় গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছিল। ২০০০-এর দশকে একটি ছবির মোট আয়ের ১০-২০ শতাংশ পর্যন্ত আসতে পারত এই খাত থেকে। উদাহরণ হিসেবে, ২০০৯ সালের ব্লকবাস্টার ‘থ্রি ইডিয়াটস’ মুক্তির পর ৭৫-৮০ হাজার ভিসিডি ও ডিভিডি বিক্রি হয়েছিল, যা থেকে প্রায় ৩-৪ কোটি রুপি আয় হয়েছিল।
এরপর আসে স্ট্রিমিং প্লাটফর্মের যুগ। ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নেটফ্লিক্সের গ্রাহক ছিল প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ। ২০১৯ সালের শেষে তা বিশ্বব্যাপী ১৬ কোটির বেশি হয়। ফলে আবারও প্রশ্ন ওঠে—মানুষ কি আর সিনেমা হলে যাবে?
কভিড মহামারী সেই প্রশ্নকে আরো তীব্র করে তোলে। দীর্ঘ সময় প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ থাকার পর অনেকেই মনে করেছিলেন সিনেমা হলের যুগ শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন ছিল।
চৌহান স্মরণ করেন, ২০২১ সালে ‘স্পাইডার-ম্যান: নো ওয়ে হোম’-এর অগ্রিম বুকিং শুরু হওয়ার পর দর্শকদের সাড়া ছিল বিস্ময়কর। বিহার থেকে শুরু করে ভারতের বিভিন্ন স্থানে দ্রুত টিকিট বিক্রি হতে থাকে। একইভাবে ‘গডজিলা ভার্সেস কং’ও প্রমাণ করে যে বড় পর্দায় সম্মিলিতভাবে সিনেমা দেখার আকর্ষণ এখনও অটুট।
এটাই ‘সিনেমাস ফরএভার’ বইটির মূল বার্তা। প্রযুক্তি বদলায়, দর্শকের অভ্যাস বদলায়, নতুন নতুন প্লাটফর্ম আসে। কিন্তু অন্ধকার হলে শত শত মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে হাসা, কাঁদা, বিস্মিত হওয়া বা উত্তেজিত হওয়ার যে অভিজ্ঞতা, তা কোনো টেলিভিশন, ডিভিডি বা স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারেনি।
ভারতের জন্য এই বার্তা আরো গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন চৌহান। দর্শক আছে, সিনেমার প্রতি আবেগও আছে। অভাব শুধু পর্যাপ্ত ও সহজলভ্য প্রেক্ষাগৃহের। সেই ঘাটতি পূরণ করা গেলে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ চলচ্চিত্র বাজারে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা ভারতের সামনে এখনো উন্মুক্ত।