রাজনৈতিক সীমানা আপাতদৃষ্টিতে চিরস্থায়ী মনে হলেও ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। রোমান সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে সোভিয়েত ইউনিয়ন কিংবা যুগোস্লাভিয়ার মতো একসময়ের প্রভাবশালী বহু রাষ্ট্র আজ কেবলই ইতিহাসের পাতায় টিকে আছে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জলবায়ু পরিবর্তন যেমন উপকূলরেখা ও প্রাকৃতিক সম্পদকে হুমকির মুখে ফেলছে, তেমনি রাজনৈতিক ও জাতিগত চাপে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে ঔপনিবেশিক আমলের পুরোনো সীমানাগুলোর। নিউজব্রেক ও ইউরোজিনের মতো তথ্যসূত্র বলছে, আগামী ৫ দশকে বর্তমান বিশ্বের বেশ কিছু দেশ চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে কিংবা খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে নতুন রূপ নিতে পারে।
মালদ্বীপ
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সামান্য উঁচুতে অবস্থিত দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ আক্ষরিক অর্থেই ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছে। সাগরের জলস্তর বৃদ্ধির কারণে দেশটি ইতিমধ্যেই তাদের জনগণের জন্য বিকল্প বাসস্থানের খোঁজে বিদেশে জমি কেনা শুরু করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এ যুগে কোনো দেশ যদি সম্পূর্ণ সাগরে তলিয়ে যায়, তবে আন্তর্জাতিক আইনে তার রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব থাকবে কিনা মালদ্বীপের ভবিষ্যৎ হয়তো বিশ্বকে সেই উত্তরই দেবে।
বেলজিয়াম
বেলজিয়ামের রাষ্ট্রীয় নীতি ‘একতাই বল’ হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ফ্ল্যান্ডার্স ও ওয়ালোনিয়া অঞ্চলের মানুষ ভাষা, রাজনীতি ও গণমাধ্যমের দিক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, যেন এক দেশে দুই ভিন্ন রাষ্ট্র। ১৮৩০ সালের সমঝোতার ফসল রাজধানী ব্রাসেলসই এখন পর্যন্ত দেশটিকে জোড়াতালি দিয়ে টিকিয়ে রেখেছে। তবে ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক উত্তেজনা যেভাবে বাড়ছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে দেশটির বিভক্তি অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।
কিরিবাতি
গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে ভূমিকা না রেখেও জলবায়ু পরিবর্তনের চরম মূল্য দিচ্ছে কিরিবাতি। দেশটির নিচু প্রবাল দ্বীপগুলো সাগরে তলিয়ে যাচ্ছে, লবণাক্ত পানি নষ্ট করছে সুপেয় জলের উৎস। ভবিষ্যৎ বিপর্যয় মোকাবিলায় সরকার ফিজিতে ৬ হাজার একর (প্রায় ২ হাজার ৫০০ হেক্টর) জমি কিনে রেখেছে, যাতে নাগরিকরা সেখানে অভিবাসন নিতে পারে। দ্বীপগুলো হারিয়ে যাওয়ার পর দেশটির সার্বভৌমত্ব বজায় থাকবে কিনা এখন সেটাই বড় প্রশ্ন।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা
১৯৯৫ সালের ডেটন চুক্তির মাধ্যমে বসনিয়ার জটিল রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি হয়েছিল। দেশটিতে তিনটি প্রধান জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী তিনজন প্রেসিডেন্ট রয়েছেন এবং এটি দুটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলসহ বেশ কিছু বিশেষ প্রশাসনিক এলাকায় বিভক্ত। বর্তমানে ‘রেপুব্লিকা সর্পস্কা’ অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী সুর ও ক্রোয়াট অঞ্চলের নিজস্ব স্বায়ত্তশাসনের দাবি দেশটির রাজনৈতিক অচলাবস্থাকে দীর্ঘায়িত করছে, যা এর দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
উত্তর কোরিয়া
বহু পতনের ভবিষ্যদ্বাণী ভুল প্রমাণ করে কিম রাজবংশ টিকে থাকলেও উত্তর কোরিয়ার ভবিষ্যৎ এখনো অন্ধকারাচ্ছন্ন। কৃষি খাতে ব্যাপক জোর দেয়ার পরও দেশটিতে খাদ্য সংকট কাটছে না। পাশাপাশি, চোরাচালানের মাধ্যমে আসা বিদেশী গণমাধ্যম ও তথ্য দেশটির কঠোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণকে শিথিল করছে। কিম রাজবংশের পতন হলে ক্ষমতার শূন্যতা বা আন্তর্জাতিক চাপে দুই কোরিয়ার পুনরেকত্রীকরণের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার একক অস্তিত্ব বিলীন হতে পারে।
ইয়েমেন
মানচিত্রে ইয়েমেনের অস্তিত্ব থাকলেও দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ দেশটিকে খণ্ড-বিখণ্ড করেছে। বর্তমানে উত্তর-পশ্চিমে হুথি বিদ্রোহী, দক্ষিণে আনুষ্ঠানিক সরকার ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে দেশটির নিয়ন্ত্রণ বিভক্ত। ১৯৯০ সালে উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন একত্রিত হয়েছিল। বর্তমান ভঙ্গুর অবকাঠামো ও গভীর সংকট দেশটির সেই অতীত বিভাজনকেই আবার ফিরিয়ে আনছে।
টুভালু
পুরোপুরি ডুবে যাওয়ার আগেই টুভালু বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে জোয়ারের পানিতে গ্রামের কেন্দ্রস্থলগুলো অগভীর হ্রদে পরিণত হয়েছে এবং বাসিন্দাদের যাতায়াত করতে হচ্ছে হাঁটুপানি মাড়িয়ে। ফসল নষ্ট ও সুপেয় পানির সংকটের কারণে মানুষ দেশ ছাড়ছে। নিউজিল্যান্ডের বিশেষ ভিসা লটারি এর বড় প্রমাণ। দেশের চেয়ে বেশি নাগরিক যখন বিদেশে বাস করবে, তখন রাষ্ট্র হিসেবে টুভালুর কী সংজ্ঞা থাকবে?
লিবিয়া
২০১১ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর থেকে লিবিয়া দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী সরকারের মধ্যে বিভক্ত। ঔপনিবেশিক শাসনের আগে ত্রিপলিতানিয়া, সাইরেনাইকা ও ফেজ্জান অঞ্চলগুলো যেভাবে আলাদাভাবে চলত, বর্তমান পরিস্থিতি ঠিক তেমনই। বিশাল তেলের মজুদ থাকলেও তা জাতীয় ঐক্য ফেরাতে পারেনি। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কেন্দ্রীয় শাসনের অনুপস্থিতি দেশটির স্থায়ী বিভাজনকেই উস্কে দিচ্ছে।
যুক্তরাজ্য
ব্রেক্সিটের পর থেকে যুক্তরাজ্যের অখণ্ডতা বড় ধরনের হুমকিতে পড়েছে। স্কটল্যান্ডের নাগরিকরা ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে ভোট দিলেও তাদের জোরপূর্বক বের করে নেয়ায় সেখানে স্বাধীনতার দাবি তীব্র হয়েছে। অন্যদিকে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে ব্রেক্সিট-পরবর্তী জটিলতা ও জনমিতির পরিবর্তন আয়ারল্যান্ডের পুনরেকত্রীকরণের সম্ভাবনাকে বাস্তব করে তুলছে। ফলে অনাগত দিনে যুক্তরাজ্যের মানচিত্র বদলে যেতে পারে।
সোমালিয়া
সোমালিয়া এখন কার্যকর রাষ্ট্রের চেয়ে একটি ‘স্বীকৃত ধারণা’ মাত্র। গত ৩০ বছর ধরে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ কেবল রাজধানী মোগাদিশুতেই সীমাবদ্ধ। ১৯৯১ সাল থেকে ‘সোমালিল্যান্ড’ নিজস্ব সরকার, মুদ্রা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে স্বাধীন দেশের মতো চললেও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি। কেন্দ্রীয় সরকারের দুর্বলতার কারণে এ বিভাজনকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে।
স্পেন
আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদ স্পেনের অভ্যন্তরীণ ফাটলকে স্পষ্ট করেছে। দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রও কতটা ভঙ্গুর হতে পারে তার স্পষ্ট প্রমাণ ২০১৭ সালের কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা সংকট। আইনের শাসন ও শক্তি প্রয়োগ করে স্পেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখলেও কাতালোনিয়ার শক্তিশালী অর্থনীতি ও স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। পাশাপাশি বাস্ক অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসনও বিচ্ছিন্নতাবাদের আগুন জিইয়ে রাখছে।
ইরাক
ঔপনিবেশিক আমলে টানা ইরাকের সীমানা দেশটির জাতিগত ও ধর্মীয় বিভাজনকে চিরকালই উপেক্ষা করেছে। বর্তমানে কুর্দিস্তান অঞ্চলটি নিজস্ব নিরাপত্তা ও তেল বিক্রির মাধ্যমে প্রায় স্বাধীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ২০১৭ সালের গণভোট সফল না হলেও কুর্দিদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এখনো প্রবল। শিয়া নেতৃত্বাধীন সরকার ও সুন্নি অঞ্চলের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ইরাককে জাতিগত ভিত্তিতে নতুন করে বিভক্ত করতে পারে।
হাইতি
রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অপরাধী চক্রের সহিংসতার কারণে হাইতির রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব হুমকির মুখে। রাজধানী পোর্ট-অউ-প্রিন্সের সিংহভাগ গ্যাংদের নিয়ন্ত্রণে এবং গ্রামীণ অঞ্চলগুলো সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নানা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও হাইতির শাসনব্যবস্থা এতটাই ভঙ্গুর যে আমূল পরিবর্তন বা বিদেশি হস্তক্ষেপ ছাড়া দেশটির পতন এড়ানো অসম্ভব।
সাইপ্রাস
১৯৭৪ সাল থেকে সাইপ্রাস দুটি ভাগে বিভক্ত—আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘রিপাবলিক অব সাইপ্রাস’ এবং কেবল তুরস্কের স্বীকৃতি পাওয়া ‘নর্দার্ন সাইপ্রাস’। ইউরোপীয় ইউনিয়নের চাপ ও শান্তি আলোচনা সত্ত্বেও জাতিগত বিভেদ মেটেনি। বাফার জোনের দুই পাশে চার দশক ধরে গড়ে উঠেছে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন সমাজ। ফলে পুনরেকত্রীকরণের সম্ভাবনা যত কমছে, আনুষ্ঠানিক বিভাজনের পথ ততটাই প্রশস্ত হচ্ছে।
মলদোভা
ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনে মলদোভা এক অনিশ্চিত দোলাচলে রয়েছে। ১৯৯২ সাল থেকে দেশটির একটি অংশ ‘ত্রান্সনিস্ত্রিয়া’ নামে রুশ-পন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নয়। এর সাথে যুক্ত হয়েছে প্রোপাগান্ডা ও রুশ-পন্থী গাগাউজিয়া অঞ্চল। বর্তমান ইউক্রেন সংকটের কারণে মলদোভার ভবিষ্যৎ আরো নড়বড়ে হয়ে পড়েছে; যা একে রোমানিয়ার সাথে একীভূত হওয়া কিংবা সম্পূর্ণ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকিতে ফেলেছে।