বিজ্ঞানীদের রহস্য উন্মোচন

মেক্সিকোর বুনো গুল্ম যেভাবে রূপ নিল আধুনিক তুলায়

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি চাষ হওয়া তুলার প্রজাতি হলো ‘গসিপিয়াম হিরসুটাম’, যা সাধারণত আপল্যান্ড তুলা নামে পরিচিত। বর্তমানে বিশ্ববাজারে মোট উৎপাদিত তুলার প্রায় ৯০ শতাংশই এই প্রজাতির দখলে। গবেষণায় দেখা গেছে, মেক্সিকোর ইউকাতান উপদ্বীপের উত্তর-পশ্চিম অংশে প্রথম এ বিশেষ জাতের তুলার চাষ শুরু হয়। ওই অঞ্চলে বিখ্যাত মায়া সভ্যতার বিকাশ ঘটারও অনেক আগে, প্রায় চার থেকে সাত হাজার বছর আগে এ কৃষি বিপ্লব ঘটেছিল।

বন্য ও কাঠের মতো শক্ত এক ধরনের গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ থেকে কীভাবে আজকের আধুনিক তুলা তৈরি হলো, সেই ইতিহাস সফলভাবে খুঁজে বের করতে সক্ষম হয়েছেন বিজ্ঞানীরা। উন্নত জিনগত গবেষণার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে উৎপাদিত উচ্চ ফলনশীল ‘আপল্যান্ড’ তুলার চাষ হাজার হাজার বছর আগে প্রথম শুরু করেছিলেন মেক্সিকোর প্রস্তর যুগের কৃষকরা। সম্প্রতি বিজ্ঞান সাময়িকী ‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস’-এ এই যুগান্তকারী গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়।

গবেষণায় তুলা কীভাবে একটি প্রভাবশালী বৈশ্বিক শিল্পে পরিণত হলো, তার পেছনে থাকা জিনগত পরিবর্তনের বিশদ বিবরণ দেয়া হয়েছে। আধুনিক চাষ করা তুলার জিনগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে বিভিন্ন বন্য জাতের তুলনা করে গবেষকরা এ উদ্ভিদের সঠিক ভৌগলিক উৎপত্তিস্থল চিহ্নিত করতে পেরেছেন। একই সঙ্গে এটি প্রাচীন আমলের কৃষি পদ্ধতি সম্পর্কেও নতুন ধারণা দিচ্ছে।

গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি চাষ হওয়া তুলার প্রজাতি হলো ‘গসিপিয়াম হিরসুটাম’, যা সাধারণত আপল্যান্ড তুলা নামে পরিচিত। বর্তমানে বিশ্ববাজারে মোট উৎপাদিত তুলার প্রায় ৯০ শতাংশই এ প্রজাতির দখলে। গবেষণায় দেখা গেছে, মেক্সিকোর ইউকাতান উপদ্বীপের উত্তর-পশ্চিম অংশে প্রথম এ বিশেষ জাতের তুলার চাষ শুরু হয়। ওই অঞ্চলে বিখ্যাত মায়া সভ্যতার বিকাশ ঘটারও অনেক আগে, প্রায় চার থেকে সাত হাজার বছর আগে এ কৃষি বিপ্লব ঘটেছিল।

আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী জোনাথন ওয়েনডেল জানান, প্রাচীনকালের মানুষেরা বন্য জাতের এ উদ্ভিদের প্রতি বিশেষ আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। বন্য তুলার গাছগুলো আসলে দীর্ঘজীবী এবং কাষ্ঠল গুল্ম বা ছোট গাছের মতো ছিল। আধুনিক খামারে চাষ করা তুলার তুলনায় সেগুলোর ফুল ছিল খুবই কম এবং ফল ও বীজও ছিল আকারে অনেক ছোট। গবেষক দলটি ইউকাতান, ফ্লোরিডা এবং ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের পুয়ের্তো রিকো ও গুয়াদেলুপে পাওয়া বন্য প্রজাতির জিনের সঙ্গে চাষ করা তুলার জিনের তুলনা করে চাষের সঠিক স্থানটি নির্ধারণ করেছেন।

আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির আরেকজন জিনবিজ্ঞানী করিন গ্রোভার বলেন, প্রাচীন প্রস্তর যুগের কৃষকরা এ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বন্য গাছের তুলার আঁশের মধ্যে দারুণ সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেন। প্রাচীনকালের তাঁতিরা আবিষ্কার করেছিলেন, হাত দিয়েই এ গাছের আঁশ থেকে সুতা তৈরি করা সম্ভব। আর সেই সুতা দিয়ে কাপড় বোনা, মাছ ধরার জাল, দড়ি ও অন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস তৈরি করা যেত। হাজার বছর ধরে মানুষের পছন্দ এবং ধারাবাহিক উন্নতির মাধ্যমে বুনো উদ্ভিদটিই আজকের আধুনিক ফসলে রূপান্তরিত হয়েছে।

গবেষণায় আরো বলা হয়েছে, বন্য তুলার ছোট, খসখসে ও বাদামী রঙের আঁশ থেকে আজকের সূক্ষ্ম ও সাদা টেক্সটাইল তন্তুতে রূপান্তরের প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল ছিল। তবে দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের ক্রমাগত বাছাই প্রক্রিয়ার কারণে আধুনিক তুলা গাছের জিনগত বৈচিত্র্য বা ‘জেনেটিক ডাইভারসিটি’ অনেকাংশে কমে গেছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, জিনগত বৈচিত্র্য কমে যাওয়ায় আধুনিক তুলা পরিবেশগত পরিবর্তন ও রোগবালাইয়ের ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে। তাই ভবিষ্যতের কৃষির স্বার্থে বুনো তুলার বৈচিত্র্য রক্ষা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

১৬ শতকে আমেরিকায় স্প্যানিশ বিজয়ের পর আপল্যান্ড তুলা দ্রুত বিশ্বের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে চীন, ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিল বিশ্বের শীর্ষ তুলা উৎপাদনকারী দেশ। আঠারো শতকের শেষের দিকে কটন জিন বা তুলা থেকে বীজ আলাদা করার যন্ত্র আবিষ্কারের ফলে তুলার চাষ অত্যন্ত লাভজনক হয়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে দাসপ্রথার বিস্তারের একটি বেদনাদায়ক ইতিহাসও রয়েছে। তবে তা সত্ত্বেও তুলা বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে এবং বিশ্ববাজারে এর চাহিদাও ক্রমাগত বাড়ছে।

—রয়টার্স অবলম্বনে

আরও