ঢাকার অলিতে-গলিতে ছড়ানো চায়ের টং দোকান। তেমনই এক গলি কারওয়ানবাজারে। পড়ন্ত দুপুরে আয়েশি মেজাজে চা পানের ফাঁকে চোখে পড়ে পলেস্তারা খসে পড়া দেয়ালে ‘কর্মসংস্থানের জন্য আবেদন’-এর বিজ্ঞপ্তি। এতে অবাক হওয়ার মতো কিছু কি আছে? আপাতদৃষ্টিতে নেই। কেননা এ শহরের ভিআইপি ও আবাসিক স্থাপনা ছাড়া পোস্টার, বিজ্ঞাপনবিহীন দেয়াল খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কবির কথা চুরি করে বলা যায়, ‘দেয়াল ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’। এসব বিজ্ঞপ্তির বেশির ভাগই টু-লেট সংক্রান্ত, বা পড়াতে চাওয়া, কিংবা কবিরাজের ঠিকানা। কিন্তু এ শহরে কাটানো দীর্ঘ সময়ে কখনো চাকরি চলে যাওয়ার কারণ ও চাকরি চাওয়ার আবেদন জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি চোখে পড়েনি। তাই কিছুটা অবাক হতে হয়।
‘কর্মসংস্থানের জন্য আবেদন’ শিরোনামের সেই বিজ্ঞাপনে আবেদনকারী মো. মাহবুব হোসেন লিখেছেন, ‘আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা মাস্টার্স এবং আমার বয়স ৪২, বর্তমানে আমার মা এবং ৩ সন্তানসহ মোট ৬ সদস্যের পরিবার। হঠাৎ করে চাকরি চলে যাওয়ার কারণে পরিবারের সবাইকে নিয়ে ঢাকা শহরে বসবাস করাটা খুবই কষ্টদায়ক হয়ে যাচ্ছে। চাকরির জন্য প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে যাচ্ছি এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করে আছি। বর্তমান সময়ে আমার যুদ্ধ হচ্ছে নিজে বেঁচে থাকা এবং পরিবারের সবাইকে বাঁচিয়ে রাখা।’
চাকরিচ্যুত মাহবুবের পরিবারসমেত বেঁচে থাকার এ যুদ্ধ ও চাকরি খোঁজার লড়াই বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। আর এ বাস্তবতা দীর্ঘদিনের। বহুকাল ধরে অনেকেই বেকার জীবন কাটাচ্ছেন। নিজের ও পরিবারের জন্য দুবেলা খাবারের সংস্থান করতে হিমশিম খাচ্ছেন। উপায়ন্তর না পেয়ে এ-ফোর সাইজের সাদা কাগজে কালো কালির অক্ষরে লিখে দিচ্ছেন ‘চাকরি চাই’। শুধু চাকরি না, দুবেলা ভাতের বিনিময়ে পড়ানোর কথাও দেয়ালে সেঁটে দিচ্ছেন।
মনে পড়ে ২০২২ সালে এমনই এক দেয়াল বিজ্ঞাপনে ছেয়ে গিয়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম; পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যমের খবরে ওঠে আসে সেই আলোচিত বিজ্ঞাপন। ‘শুধুমাত্র দুবেলা ভাতের বিনিময়ে পড়াতে চাই’ শিরোনামে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন বগুড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ আলমগীর কবির। তাতে পেশা হিসেবে লেখা ছিল ‘বেকার’। সঙ্গে ছিল যোগাযোগ নম্বরও। কেন এমন বিজ্ঞাপন প্রশ্নের জবাবে তিনি বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছিলেন— সেসময় তার একটি টিউশনি ছিল। সেখানে রাতে পড়ানোর সময় নাশতা দিত। পরে তাদের নাশতার বদলে ভাত খাওয়ানোর কথা বলেন। এভাবে রাতে খাবারের সংস্থান হলেও সকাল আর দুপুরে খাবারের ব্যবস্থা না থাকায় তিনি ভাতের বিনিময়ে পড়াতে চেয়েছিলেন।
বিবিসি বাংলার বরাতে এও জানা যায়, মো. আলমগীর ছিলেন বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। একটা টিউশনির টাকা দিয়ে হাতখরচ, খাবার, চাকরির পরীক্ষা দিতে যাওয়া সবমিলিয়ে তার জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছিল। মো. আলমগীরের গল্প মূলত শিক্ষিত বেকার সমাজের প্রতিফলন। বর্তমানে দেশে যত বেকার রয়েছে তার মধ্যে উচ্চ শিক্ষিত বেকারের হার সবচেয়ে উচ্চ, প্রায় ১৩ শতাংশ। তিন বেকারের একজন উচ্চ শিক্ষিত। এছাড়া যোগ্যতা অনুসারে দেশের প্রায় এক কোটি মানুষ চাকরি পাচ্ছে না বলে গতবছর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপে উল্লেখ করা হয়। শুধু তাই নয়, সংস্থাটির তথ্যমতে, ২০১৭-২৪ এ আট বছরে দেশে উচ্চ শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে।
২০২২ সালের আলোচিত দেয়াল বিজ্ঞপ্তি
একদিকে রয়েছে চাকরি না পাওয়ার হতাশাজনক পরিস্থিতি, অন্যদিকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চালু রয়েছে নানা কারণ দেখিয়ে ‘বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো’ কর্মী ছাঁটাইয়ের সংস্কৃতি। যেমনটি ওই বিজ্ঞপ্তিতেও উল্লেখ করা হয়েছে, ‘আমি প্রায় ২০ বছরের বেশি সময় যাবত ক্রেডিট কালেকশন অ্যান্ড রিকভারি (কিস্তি আদায়) পদে বিভিন্ন কোম্পানিতে কাজ করে আসছি। বর্তমান রাজনৈতিক জটিলতা ও ব্যবসা মন্দাজনিত কারণে গত মাসে কোম্পানি আমাকে (আবেদনকারীকে) চাকরি থেকে অব্যাহতি প্রদান করেন।’
বিজ্ঞপ্তি থেকে দৃষ্টি দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানে রাখলে অনেকটা একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক ঈদুল আজহার ছুটি শেষে কারখানা খোলার পর পরই সাভার-আশুলিয়ার বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা গণমাধ্যমের প্রতিবদেন মারফতে সামনে এসেছে। গত জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ছয়টি শিল্প এলাকার ৭৯টি কারখানায় ৭ হাজারের বেশি শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছেন বলে জানা গেছে। আর জানার অন্তরালেও যে বহু সংখ্যা রয়েছে সে কথা বলাই বাহুল্য।
এভাবে হঠাৎ চাকরিচ্যুত হওয়া কোনো সাময়িক প্রতিক্রিয়া না। একই কথা যারা দীর্ঘদিন ধরে চাকরির চেষ্টা করে পাচ্ছেন না, তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এর পেছনে রয়েছে অর্থনীতিতে বিদ্যমান বহুমুখী চাপ ও নীতিগত দুর্বলতা, যার দরুন দেশে কর্মসংস্থানের পরিসর বাড়েনি। নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া এক প্রকার স্থবির হয়ে আছে। গত এক দশকে বাংলাদেশের তরুণদের প্রায় অর্ধেকেরই কর্মসংস্থান হয়নি বলে বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। অর্থাৎ মো. মাহবুব হোসেনের বিজ্ঞাপন সাম্প্রতিক হলেও বেকারত্বের পরিস্থিতি দীর্ঘদিনের— নাজুকও বটে। এ পরিস্থিতির আরো অবনমন ঘটতে থাকে ২০২০ সালে কভিড-মহামারীর প্রেক্ষপটে। পরবর্তী সময়ে ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের নানামুখী প্রভাবের পাশাপাশি কিছু স্থানীয় সংকট দেশের কর্মসংস্থানকে প্রভাবিত করে। যেমন ডলারের বিপরীতে টাকার মানের অবমূল্যায়ন, রিজার্ভ সংকট, ক্রমবর্ধমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যবসা ব্যয় বৃদ্ধি, তীব্র জ্বালানি সংকট ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, বিনিয়োগে ভাটা সবমিলিয়ে দেশে নতুন চাকরির বাজার গড়ে ওঠেনি। বরং এসব কারণে ক্রমেই অনেক শিল্প কলকারখানা বন্ধ হয়ে পড়েছে। উপরন্তু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটেও দেশ দীর্ঘদিন এক ধরনের অস্থিতিশীলতার মধ্যে নিমজ্জিত ছিল। এসময় সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায়ও ধীরগতি লক্ষণীয় ছিল। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থায় কিছুটা স্থিতিশীলতা এসেছে। বর্তমান সরকার ব্যাপক আকারে কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং উদ্যোগ নিচ্ছে। এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে তা ভবিষ্যতের পরিসংখ্যান বলে দেবে। একই সঙ্গে দেয়ালে সাঁটানো বিজ্ঞাপনও জানান দেবে বেকাররা কতটা স্বস্তি পাচ্ছে।