নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, ছাগল মানুষের কণ্ঠস্বর অনুসরণ করে খাবার খুঁজে বের করতে সক্ষম। বৈজ্ঞানিক সাময়িকী রয়্যাল সোসাইটি ওপেন সায়েন্সে প্রকাশিত গবেষণায় এ তথ্য পাওয়া যায়। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
গবেষকদের মতে, মানুষের কণ্ঠস্বরের দিক অনুসরণ করার এ ক্ষমতা শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে পাওয়া যায়নি। কুকুরের ক্ষেত্রেও এমন আচরণ আগে দেখা গেছে। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, এ দক্ষতার সঙ্গে চারপেয়ে প্রাণীটির গৃহপালিত হওয়ার ইতিহাসের সম্পর্ক থাকতে পারে।
এ বিষয়ে সুইজারল্যান্ডের জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইমন টাউনসেন্ড বলেন, এখানে কণ্ঠস্বর মূলত কোনো কিছুর দিকে নির্দেশনা দেয়ার কাজ করে।
বিষয়টি পরীক্ষা করতে টাউনসেন্ড ও তার সহকর্মীরা মানুষের সবচেয়ে প্রাচীন গৃহপালিত প্রাণীগুলোর একটি—ছাগলকে বেছে নেন। গবেষকরা একটি কাঠের পর্দার দুই পাশে দুটি বালতি রাখেন। প্রথমে কয়েকটি ছাগলকে পরীক্ষার পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত করতে তাদের নাম ধরে ডাকা হয় এবং দৃশ্যমানভাবে একটি বালতিতে খাবার রাখা হয়।
পরবর্তী পরীক্ষাগুলোয় একজন গবেষক পর্দার আড়ালে থেকে একটি বালতিতে কাঁচা পাস্তা রাখেন, যাতে ছাগলটি তা দেখতে না পারে। এরপর দুটি বালতি পর্দার দুই পাশে রাখা হয়।
এরপর গবেষক আড়ালে থেকেই ভিন্ন ভিন্ন ধরনের আচরণ করেন। কখনো খালি বালতির পাশে দাঁড়িয়ে খাবার থাকা বালতির দিকে মুখ করে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে কথা বলেন, কখনো কোনো শব্দ করেন না, আবার কখনো উল্টো দিকে মুখ করে কথা বলেন। পরে আরেকজন গবেষক একটি ছাগলকে ছেড়ে দেন এবং তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয়।
২৯টি ছাগলের ওপর পরিচালিত পরীক্ষায় প্রতিটি প্রাণীকে ১২ বার করে পরীক্ষা করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, গবেষক যখন খাবার থাকা বালতির দিকে মুখ করে উচ্ছ্বসিত শব্দ করেন, তখন ছাগলগুলো গড়ে ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রে সঠিক বালতির দিকে যায়।
অন্যদিকে গবেষক নীরব থাকলে বা উভয় বালতি থেকে মুখ ফিরিয়ে কথা বললে ছাগলের সাফল্যের হার যথাক্রমে ৪৭ ও ৪৯ শতাংশে নেমে আসে, যা প্রায় অনুমানের সমান।
গবেষণা দলের মতে, ফলাফল থেকে বোঝা যায় যে কোনো বিশেষ প্রশিক্ষণ ছাড়াই ছাগল অদৃশ্য একজন মানুষের কণ্ঠস্বরের দিক অনুসরণ করে খাবার খুঁজে নিতে পারে।
গবেষণার প্রধান লেখক জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. স্টুয়ার্ট ওয়াটসন বলেন, এই আবিষ্কার মানুষ ও গৃহপালিত প্রাণীর সহাবস্থানের পেছনে থাকা জ্ঞানগত পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে নতুন ধারণা দিতে পারে। একই সঙ্গে এটি প্রাণিকল্যাণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তিনি আরো বলেন, প্রাণীরা পৃথিবীকে কীভাবে দেখে ও উপলব্ধি করে, তা ভালোভাবে বোঝা আমাদের এবং তাদের উভয়ের জন্যই উপকারী।
গবেষকরা উল্লেখ করেন, মানুষের সংকেত বোঝার ক্ষেত্রে ছাগলের দক্ষতার এটি প্রথম প্রমাণ নয়। আগের গবেষণায় দেখা গেছে, ছাগল মানুষের আঙুলের ইশারা অনুসরণ করতে পারে, মানুষের কণ্ঠে বিভিন্ন আবেগ আলাদা করতে পারে এবং নেতিবাচক মুখভঙ্গির তুলনায় ইতিবাচক মুখভঙ্গি বেশি পছন্দ করে।
ভবিষ্যতে বন্য ছাগলের ওপর একই ধরনের পরীক্ষা চালিয়ে দেখা যেতে পারে এই দক্ষতা জন্মগত কিনা। পাশাপাশি প্রাণীরা একে অপরের কণ্ঠস্বরের দিকও অনুসরণ করে কিনা, সেটিও অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানায় গবেষণা দল।
অধ্যাপক টাউনসেন্ডের ভাষায়, মানব যোগাযোগের কোন বিষয়গুলো সত্যিই অনন্য, তা আমরা ধীরে ধীরে বুঝতে পারছি। আর যতই অনুসন্ধান করছি, ততই মানুষের সঙ্গে অন্যান্য প্রাণীর আচরণের মিল খুঁজে পাচ্ছি।