ঔপনিবেশিক অতীত থেকে বেরিয়ে আসতে নাম পরিবর্তন করছে নাউরু

অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্বে প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ২১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ দ্বীপের নাম পরিবর্তনের ইতিহাসও দীর্ঘ। ১৭৯৮ সালে এক ব্রিটিশ নাবিক দ্বীপটির সৌন্দর্য ও স্থানীয়দের আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে এর নাম দেন ‘প্লেজ্যান্ট আইল্যান্ড’। পরে ১৮৮৮ সালে জার্মানি দ্বীপটি দখল করলে নাউরু নামটি সরকারি নথিতে অন্তর্ভুক্ত হয়

বিশ্বের সবচেয়ে ছোট প্রজাতন্ত্র নাউরু শিগগিরই নিজেদের নাম পরিবর্তন করে ‘নাওয়েরো’ রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ডেভিড অ্যাডিয়াং গত জানুয়ারিতে পার্লামেন্টে বলেন, নতুন নামটি দেশের ঐতিহ্য, ভাষা ও পরিচয়কে আরো যথাযথভাবে সম্মান জানাবে।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুসারে, পার্লামেন্টে প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হওয়ার পর প্রায় ১৩ হাজার জনসংখ্যার দ্বীপরাষ্ট্রটিতে এ বিষয়ে গণভোট আয়োজনের পথ খুলে গেছে।

নাউরুবাসীরা নিজেদের ভাষায় দেশটিকে ডাকে ‘নাওয়েরো’। অন্যদিকে দেশটির আদিবাসী নামটি বিদেশীদের জন্য উচ্চারণ করা কঠিন বিবেচিত হওয়ায় ‘নাউরু’ নামটি সরকারি রূপ পায়। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, নামটি তাদের নিজস্ব পছন্দে নয়, বরং সুবিধার জন্য পরিবর্তিত হয়েছিল।

অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্বে প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ২১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ দ্বীপের নাম পরিবর্তনের ইতিহাসও দীর্ঘ। ১৭৯৮ সালে এক ব্রিটিশ নাবিক দ্বীপটির সৌন্দর্য ও স্থানীয়দের আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে এর নাম দেন ‘প্লেজ্যান্ট আইল্যান্ড’। পরে ১৮৮৮ সালে জার্মানি দ্বীপটি দখল করলে নাউরু নামটি সরকারি নথিতে অন্তর্ভুক্ত হয়, যদিও ‘নাওডো’ ও ‘নাভোদা ওনাওয়েরো’ নামও ব্যবহৃত হয়েছিল।

ছবি: এপি

১৯১৯ সালে লিগ অব নেশনসের ম্যান্ডেটের অধীনে অস্ট্রেলিয়া দ্বীপটির প্রশাসনিক দায়িত্ব নেয়ার পরও নাউরু নামটি বহাল থাকে এবং ১৯৬৮ সালে স্বাধীনতার পরও সেটিই সরকারি নাম হিসেবে টিকে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের এভারগ্রিন স্টেট কলেজের ভূগোল ও নেটিভ আমেরিকান স্টাডিজের অধ্যাপক জোলতান গ্রসম্যানের মতে, স্থাননাম পরিবর্তন ঔপনিবেশিক ক্ষমতা প্রয়োগের একটি ঐতিহাসিক উপায়। তার ভাষায়, উপনিবেশবাদীরা মূল জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি মুছে দিতে স্থাননাম বদল করেছে; বিষয়টি শুধু নামের নয়, বরং নাম পরিবর্তনের ক্ষমতা কার হাতে রয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

নাওয়েরো নাম গ্রহণের পক্ষে নাউরু সরকার তুরস্ক থেকে ‘তুর্কিয়ে’ এবং সোয়াজিল্যান্ডের পরিবর্তে ‘এসওয়াতিনি’ নাম গ্রহণের উদাহরণ তুলে ধরেছে। এছাড়া মাইক্রোনেশিয়ার দ্বীপাঞ্চল ‘চুক’-এর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যা একসময় বিদেশী উচ্চারণে ‘ট্রুক’ নামে পরিচিত ছিল।

বর্তমানে ইউনেস্কো নাউরু ভাষাকে ‘গুরুতরভাবে বিপন্ন’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। অনেক নাউরুবাসী পরিবার ও বন্ধুদের মধ্যে ভাষাটি ব্যবহার করেন, কিন্তু বিদ্যালয়ের শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘নাওয়েরো’ নাম গ্রহণ ভাষা সংরক্ষণ ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় সহায়ক হতে পারে।

দেশটির বিখ্যাত কুস্তিগির আর্কমেন উইলিস নাম পরিবর্তনের পক্ষে মত দিয়েছেন। তার মতে, নতুন নাম চালু হলে বিদেশীদেরও সঠিক উচ্চারণ শেখার চেষ্টা করা উচিত। তবে তিনি বলেন, নাম পরিবর্তন হলেও ব্যক্তি হিসেবে তিনি একই থাকবেন—‘এটা শুধু নামের পরিবর্তন, আমাকে বদলে দেয় না।’

আরও