ইরানের কৌশলেই হরমুজ প্রণালি থেকে জ্বালানি তেল সরাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

৯ জুন ইরান যে অ্যাপাচি হেলিকপ্টারটি ভূপাতিত করেছিল এবং যার জেরে যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা বোমা হামলা চালায়। সেটিও এই মিশনের অংশ ছিল বলে চারটি সূত্র জানিয়েছে

হরমুজ প্রণালি দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি রফতানি সচল রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী গোপনে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তর কার্যক্রম তদারকি করছে। এ অভিযানে আকাশ ও জলপথের ড্রোন, পাশাপাশি হেলিকপ্টার ব্যবহার করে জ্বালানি তেলবাহী জাহাজের বহরকে অপেক্ষমাণ ট্যাংকারের কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। খবর রয়টার্স।

হরমুজ প্রণালির মুখে পরিচালিত এ কার্যক্রমে এমন একটি ‘শাটলিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে, যা দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরান ব্যবহার করে আসছে। এ বিষয়ে অবগত ১১ জনের তথ্যানুযায়ী, জ্বালানি তেল স্থানান্তরের দুটি নির্দিষ্ট স্থান হলো সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) ফুজাইরাহ উপকূলের কাছে এবং ওমানের সোহার বন্দরের বাইরে। মে মাসের শুরুতে এ কার্যক্রম শুরু হয় এবং রয়টার্সের পর্যালোচনা করা জাহাজ চলাচলের তথ্য ও স্যাটেলাইট চিত্র অনুযায়ী অন্তত ৯২টি জাহাজ এতে যুক্ত ছিল।

পর্যালোচনা করা স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, ১১ জুন পর্যন্তও দুটি স্থানে একযোগে ১৭ জোড়া জাহাজ তেল স্থানান্তর কার্যক্রম পরিচালনা করছিল।

৯ জুন ইরান যে অ্যাপাচি হেলিকপ্টারটি ভূপাতিত করেছিল এবং যার জেরে যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা বোমা হামলা চালায়। সেটিও এই মিশনের অংশ ছিল বলে চারটি সূত্র জানিয়েছে। সূত্রগুলোর মধ্যে হামলার বিষয়ে অবগত সাবেক এক মার্কিন কর্মকর্তাও রয়েছেন। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে রয়টার্স দেখেছে, অ্যাপাচি ভূপাতিত হওয়ার দিন সোহার বন্দরের কাছে ছোট একটি এলাকায় ছয় জোড়া ট্যাংকার পাশাপাশি অবস্থান করছিল।

তবে ওই অভিযানে অ্যাপাচির সুনির্দিষ্ট ভূমিকা কী ছিল, তা রয়টার্স নিশ্চিত করতে পারেনি। বার্তা সংস্থাটির প্রশ্নের জবাবে এক মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেন, সেন্ট্রাল কমান্ডের কোনো বাহিনী সমুদ্রে জাহাজ থেকে-জাহাজে তেল স্থানান্তর কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে না। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্যানুযায়ী, বিধ্বস্ত হেলিকপ্টারের দুই আরোহীকে একটি ড্রোন নৌযান উদ্ধার করে।

জাহাজ থেকে জাহাজে জ্বালানি তেল স্থানান্তরের ব্যাপকতা, এর কার্যপ্রণালি এবং অ্যাপাচির ভূমিকা—এসব তথ্য এর আগে প্রকাশ্যে আসেনি। হোয়াইট হাউজ এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাব দিতে সেন্টকমের দিকে ইঙ্গিত করেছে। ইরান সরকারও কোনো মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

যেখানে এসব স্থানান্তর হচ্ছে, ওমান উপসাগরের সেই এলাকাগুলো হরমুজ প্রণালির বহির্গমন এবং ইরানের নতুন প্রতিষ্ঠান পারসিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি (পিজিএসএ)-র নির্ধারিত সীমানার কাছাকাছি। হরমুজ প্রণালি ব্যবস্থাপনার জন্য গঠিত এ সংস্থার নির্দেশ না মানলে জাহাজগুলো ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকিতে পড়ে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন এই কার্যক্রম চলাকালে ফুজাইরাহ বন্দরও একাধিকবার ইরানি হামলার শিকার হয়েছে। গত সপ্তাহান্তে ব্রিটিশ সামুদ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ভ্যানগার্ড জানায়, ওমান উপকূলের কাছে একটি ট্যাংকারে ‘অজ্ঞাত একটি প্রক্ষেপণাস্ত্র’ আঘাত হানে। এতে কিছু কার্গো লিকেজ হলেও পরিবেশগত ক্ষতি হয়নি এবং নাবিকরা নিরাপদ ছিলেন। তবে ওই ট্যাংকার জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরে যুক্ত ছিল কিনা, তা উল্লেখ করা হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের জবাবে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। সাধারণ সময়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ব্যবহারের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ সংকট সৃষ্টি হয় এবং বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়তে শুরু করে।

ঝুঁকিপূর্ণ ও অদক্ষ হলেও জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তর পদ্ধতিটি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে স্বাভাবিক তেল সরবরাহ পুনরুদ্ধারে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রচেষ্টার অংশ বলে মনে হচ্ছে। একটি শান্তি কাঠামো চুক্তির আওতায় শুক্রবার হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে চুক্তির বিস্তারিত এখনো অস্পষ্ট।

আরও