৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল— অর্ধেকেরও বেশি অর্থের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে ইরান

সূত্রটির মতে, তহবিলটির উদ্দেশ্য হলো চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন করতে উভয় পক্ষকে অর্থনৈতিক প্রণোদনা দেয়া। পরিকল্পনার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না হওয়ার কারণও জানিয়েছে সূত্রটি। তিনি জানান, ওয়াশিংটন ও তেহরান শুক্রবার চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ কারণে বিষয়টি প্রকাশ্যে আনা হচ্ছে না

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাঠামোগত চুক্তি বাস্তবায়ন হলে বড় ধরনের বিনিয়োগ তহবিল পাবে ইরান। এতে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বেসরকারি তহবিল গঠনের পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর অর্ধেকেরও বেশি অর্থের প্রতিশ্রুতি এরই মধ্যে পাওয়া গেছে বলে চুক্তি সম্পর্কে সরাসরি অবহিত একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে।

সূত্রটির মতে, তহবিলটির উদ্দেশ্য হলো চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন করতে উভয় পক্ষকে অর্থনৈতিক প্রণোদনা দেয়া। পরিকল্পনার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না হওয়ার কারণও জানিয়েছে সূত্রটি। তিনি জানান, ওয়াশিংটন ও তেহরান শুক্রবার চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ কারণে বিষয়টি প্রকাশ্যে আনা হচ্ছে না।

গত রোববার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা জানান, তারা যুদ্ধ অবসানের একটি কাঠামোগত চুক্তিতে সম্মত হয়েছেন। চুক্তির আওতায় ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং বৈশ্বিক জ্বালানি তেল ও গ্যাস সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়ার বিষয়ও রয়েছে।

সূত্রটি জানায়, নতুন তহবিলটি একটি বেসরকারি বিনিয়োগ কাঠামো (প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট ভেহিকল)। এটি পুনর্গঠন বা ক্ষতিপূরণ কর্মসূচি নয় এবং এতে কোনো সরকারি অর্থ বা অনুদান থাকবে না।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, উপসাগরীয় আরব দেশগুলো, এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকাভিত্তিক বিভিন্ন কোম্পানি অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি, সরবরাহ ব্যবস্থা (লজিস্টিকস), উৎপাদনশিল্প ও পরিবহন খাত।

রয়টার্সকে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি সূত্র জানায়, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ হিসেবে তেহরান প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৪০০ বিলিয়ন ডলার দাবি করেছিল। তবে ওয়াশিংটন স্পষ্ট করে দেয় যে তারা এ ধরনের অর্থ দেবে না।

এরপরই রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফান্ড গঠনের ধারণা সামনে আসে।

ইরানি সূত্রটি জানায়, এ ব্যবস্থার আওতায় আঞ্চলিক দেশগুলো বিভিন্নভাবে অবদান রাখবে। এর মধ্যে রয়েছে ঋণ নিশ্চিত, ক্রেডিট লাইন চালু অথবা যুদ্ধক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর পুনর্গঠনে সরাসরি অর্থায়ন।

পুনর্গঠনের সম্ভাব্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে মোবারাকেহ স্টিল কমপ্লেক্স, বিভিন্ন শোধনাগার, বিমানবন্দর ও সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত অন্যান্য অবকাঠামো পুনর্গঠন।

মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলোর একটি হওয়া সত্ত্বেও গত চার দশকে ইরান উল্লেখযোগ্যভাবে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) খুব কমই আকর্ষণ করতে পেরেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ধারাবাহিক প্রভাবে দেশটি কার্যত বৈশ্বিক পুঁজিবাজার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ছিল।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রমাণিত প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদ এবং চতুর্থ বৃহত্তম প্রমাণিত জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে ইরানের।

এ ছাড়া ৯ কোটি ২০ লাখের বেশি তরুণ ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠী, বৈচিত্র্যময় শিল্পভিত্তি এবং পেট্রোকেমিক্যাল, খনিজ, পর্যটন ও কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে বিপুল অপ্রয়োগিত সম্ভাবনা রয়েছে দেশটির।

সূত্রটি আরো জানায়, এই বিনিয়োগ তহবিলের আলোচনা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সার্বভৌম সম্পদ মুক্ত করার সমান্তরাল আলোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।

তার ভাষায়, দুটি সম্পূর্ণ আলাদা আর্থিক কাঠামো, এগুলোর উদ্দেশ্য ও সময়সূচি ভিন্ন। চূড়ান্ত ও সন্তোষজনক চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তহবিলটি গঠন হবে না এবং কার্যক্রমও শুরু করবে না। স্বাক্ষরিত হওয়ার পর সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) আগামী ৬০ দিনের জন্য পুরো প্রক্রিয়ার কাঠামো নির্ধারণ করবে।

সূত্রটি বলেছে, চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের পরই তহবিলটি আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হবে। এ ৬০ দিনের মধ্যে তহবিলের প্রশাসকরা ইরানি কর্তৃপক্ষ ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কাজ করে প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনা ও পরিধি নির্ধারণ করবেন।

বিনিয়োগ তহবিল চুক্তির মধ্যস্থতায় সহায়তাকারী ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধের তাৎক্ষণিক জবাব দেয়নি।

হোয়াইট হাউজের এক মুখপাত্র গত সোমবার সিবিএসে প্রচারিত ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের একটি সাক্ষাৎকারের দিকে ইঙ্গিত করেন। সেখানে ভ্যান্স বলেন, ইরান যদি ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তির শর্ত মেনে চলে, তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থনে গঠিত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিলে প্রবেশাধিকার পেতে পারে।

শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে— ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বিলুপ্তিকরণ, সমৃদ্ধকৃত পারমাণবিক উপাদানের মজুদ সরিয়ে ফেলা এবং কঠোর পরিদর্শন ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থাকে মেনে নেয়া।

তহবিলটি কীভাবে পরিচালিত হবে বা কারা পরিচালনা করবে, সে বিষয়ে সূত্রটি বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

তবে সূত্রটি জানায়, ক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কোম্পানি এরই মধ্যে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যদিও পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।

৬০ দিনের এই সমঝোতা স্মারকটি কোনো চূড়ান্ত চুক্তি নয়; বরং একটি কাঠামো। এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচকরা পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তাসহ একাধিক বিষয়ে সমান্তরাল আলোচনা চালিয়ে যাবেন।

আরও