এসব গ্যাস ক্ষেত্রে অন্তত ১০০ ট্রিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস মজুদ থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে মিয়ানমার সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়। যদিও আবিষ্কৃত গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর নাম প্রকাশ করেনি দেশটির সরকার। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় গ্যাস ক্ষেত্রটি আন্দামান সাগরে তানিনথারিই উপকূলের দক্ষিণে কাদান দ্বীপসংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত।
মিয়ানমার এমন সময় এ গ্যাস পেল যখন দেশটির শিল্প খাতের ভোক্তারা তীব্র গ্যাস সংকটের মুখোমুখি। এমনকি জান্তা সরকারের রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার কারণে দীর্ঘদিন দেশটির গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমও স্থির হয়ে পড়ে। এছাড়া দেশটির প্রতিবেশী থাইল্যান্ড ও চীনে গ্যাস রফতানির কারণে মিয়ানমার অব্যাহতভাবে গ্যাস সংকটের মুখেও রয়েছে কয়েক বছর ধরে।
মিয়ানমারের গণমাধ্যম ইরাওয়াদ্দির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মিয়ানমারের শাসকগোষ্ঠী বৈদেশিক মুদ্রার আয় নিশ্চিত করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে চারটি নতুন অফশোর গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যে আয়েয়ারওয়াদি ও তানিনথারিই অঞ্চলের রিজার্ভ ব্লকগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। নতুন আবিষ্কৃত চারটি গ্যাস ক্ষেত্রে সম্মিলিতভাবে প্রায় ১০৯ টিসিএফ প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তারা জানিয়েছে যে সবচেয়ে বড় ক্ষেত্রটি তানিনথারিইর গভীর সমুদ্র অঞ্চলে অবস্থিত। সেখানে ৯০ শতাংশ সম্ভাবনায় প্রায় ৯৫ টিসিএফ গ্যাস মজুদ রয়েছে। এছাড়া আয়েয়ারওয়াদি নতুন ক্ষেত্রটিতে ১০০ শতাংশ সম্ভাবনায় সর্বোচ্চ ১৪ টিসিএফ গ্যাস থাকার কথা বলা হয়েছে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক কানাডিয়ান কোম্পানি কানাডিয়ান ফোরসাইট গ্রুপ (সিএফজি) এ ব্লকের দরপত্রে জয়ী হয় এবং ২০১৫ সালের ৩০ মার্চ প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনের প্রশাসনামলে সামরিক সরকারের মালিকানাধীন মিয়ানমার অয়েল অ্যান্ড গ্যাস এন্টারপ্রাইজের (এমওজিই) সঙ্গে একটি উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তি (প্রডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট) সই করে। ২০১৭ সালের সিএফজির একটি প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে বিবিসি বার্মিজ জানায়, এ প্রকল্প থেকে মিয়ানমারের মোট বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ সমপরিমাণ রাজস্ব অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে। তৎকালীন বাজারদরের ভিত্তিতে সিএফজি ব্লকটির গ্যাস মজুদের মূল্য প্রায় ২৮০ বিলিয়ন ডলার বলে জানায়। তানিনথারিই গ্যাস ক্ষেত্রটি এম-১৫ ব্লকের অন্তর্ভুক্ত। এ গ্যাস ক্ষেত্রে প্রায় ৯৪ দশমিক ৬ টিসিএফ গ্যাস আবিষ্কৃত হয়েছে, যা সম্ভাব্যভাবে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গ্যাস মজুদ হতে পারে। আন্দামান সাগরে তানিনথারিই উপকূলের দক্ষিণে কাদান দ্বীপের কাছে অবস্থিত এ ব্লকের আয়তন প্রায় ১৩ হাজার বর্গকিলোমিটার।
গত বছর এমওজিই এবং থাইল্যান্ডের গালফ পেট্রোলিয়াম মিয়ানমার (জিপিএম) মিয়ানমারের প্রথম অফশোর প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন চুক্তি স্বাক্ষর করে। মত্তামা উপসাগরে মিন ইয়ে থু প্রকল্প (এম-১০ ব্লক) সংক্রান্ত এ চুক্তি ২০২৫ সালের ৩০ মে মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোতে সই হয়। এটি মিয়ানমারের সপ্তম বৃহৎ গ্যাস প্রকল্প, যেখানে ইয়াদানা, ইয়েতাগুন, জাওটিকা, শে এবং আরো দুটি ছোট প্রকল্প এরই মধ্যে চালু রয়েছে। দেশটির সরকার দাবি করেছে, এসব গ্যাস প্রকল্প বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার উৎপাদন এবং শিল্প খাতের উৎপাদন কার্যক্রমের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিকে সহায়তা করছে।
এমওজিই মিয়ানমার সরকারের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম একটি সংস্থা। নিজ দেশের জনগণের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত সামরিক বাহিনীকে অর্থায়নের অভিযোগে এমওজিই ২০২২ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে। মানবাধিকার পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন জাস্টিস ফর মিয়ানমার (জেএফএম) জানিয়েছে, জিপিএমের মূল প্রতিষ্ঠান নর্দার্ন গালফ পেট্রোলিয়াম বারমুডা, ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ এবং সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত একাধিক শেল কোম্পানির নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মিয়ানমারের সামরিক সরকারকে অর্থ প্রদান করে থাকতে পারে।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর নিরাপত্তা ও মানবাধিকার পরিস্থিতির উদ্বেগের কারণে ফ্রান্সের টোটাল এনার্জিস, অস্ট্রেলিয়ার উডসাইড এবং যুক্তরাষ্ট্রের শেভরনের মতো বিশ্বের বড় বড় জ্বালানি কোম্পানি মিয়ানমার থেকে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়। টোটাল এনার্জিস এবং শেভরন উভয়ই আনুষ্ঠানিকভাবে দেশটির সবচেয়ে বড় গ্যাস সম্পদ ইয়াদানা প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ায়।
মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তি হয় ২০১২ সালে। এরই মধ্যে ১৪ বছর পেরিয়ে গেছে। দীর্ঘ এ সময়ের মধ্যে গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস উত্তোলনে কোনো সাফল্যেরই দেখা পায়নি বাংলাদেশ। অথচ বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার নিকটবর্তী মিয়ানমার তাদের সাগরে বিপুল পরিমাণ গ্যাস আবিষ্কার করেছে। শুধু আবিষ্কারই নয়, তা চীনে রফতানিও করছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, সীমানা নিষ্পত্তির পর গভীর সমুদ্রে জ্বালানি অনুসন্ধানে মনোযোগ দিয়েছে মিয়ানমার। বিনিয়োগ করেছে বিভিন্ন পর্যায়ে। ফলে প্রয়োজনমতো বিদেশী বিনিয়োগও পেয়েছে। আর বাংলাদেশ সময়ক্ষেপণ করেছে আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি বাস্তবায়নে। গভীর সাগরে নিজ সীমানায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিভিন্ন সময়ে বিদেশী বিনিয়োগের মৌখিক প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হলেও এ নিয়েও দেখা যায়নি কার্যকর কোনো উদ্যোগ। ফলে দেশের বিশাল সমুদ্র এলাকার জ্বালানি সম্ভার এখনো অনাবিষ্কৃতই থেকে গেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরূল ইমাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির পর মিয়ানমার বিপুল পরিমাণ গ্যাসের আবিষ্কার করেছে। অথচ বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় তাদের সাগরে বড় কোনো গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার করতে পারেনি। প্রধান কারণ অনুসন্ধানে অনাগ্রহ ছিল। আমদানির প্রতি মনোযোগও ছিল অনেক বেশি। ফলে গ্যাস ব্যবহার হয়েছে কিন্তু রিজার্ভের বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এক্ষেত্রে নানা সময়ে অভ্যন্তরীণ ও ভূরাজনীতিও কাজ করেছে। মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের পর সমুদ্রে বড় আকারে গ্যাস অনুসন্ধানের সুযোগ ছিল। কিন্তু সেটি করা যায়নি। সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির পর বিদেশী তেল-গ্যাস কোম্পানি এনে মিয়ানমার কূপ খনন করে গ্যাস পেয়েছে। বাংলাদেশ নানা অজানা কারণে গ্যাস অনুসন্ধান করতে পারেনি। কেন করেনি বা করা যায়নি সেটি মোটা দাগে বলতে গেলে এক ধরনের অনাগ্রহ ও আমদানিনির্ভরতায় মনোযোগী হওয়াকেই দায়ী করতে হয়।’
অবশ্য বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ১ জুন থেকে দরপত্রের প্রয়োজনীয় নথি কেনার সুযোগ অবারিত করেছে পেট্রোবাংলা। একই সঙ্গে সমুদ্রে পরিচালিত জরিপের তথ্যও কিনতে পারবে কোম্পানিগুলো। দরপত্র কেনা ও জমা দিতে আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সময় দেয়া হয়েছে। ৫৫টি কোম্পানিকে সরাসরি মেইল করে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে পেট্রোবাংলা।