শেয়ারবাজারে স্পেসএক্সের অভিষেকে ইলোন মাস্ক হলেন বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নেয়ার

রকেট কোম্পানি স্পেসএক্সের শেয়ারবাজারে অভিষেকের পর বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নেয়ার বা ১ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদের অধিকারী হলেন ইলোন মাস্ক।

একক মালিকানায় এত বিপুল সম্পদ একসময় কল্পনারও বাইরে ছিল। গত শুক্রবারের আগে ‘১ ট্রিলিয়ন ডলার’ পরিমাণটি মূলত বিশ্বের কয়েকটি বড় অর্থনীতির জিডিপি বা বিপুল ঋণের পরিমাণ বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। এছাড়া অল্পকিছু তালিকাভুক্ত কোম্পানির বাজারমূল্যের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। কিন্তু এখন থেকে সংখ্যাটি আরো বেশি কিছু ইঙ্গিত করবে।

কয়েক বছর ধরে বিশ্বের শীর্ষ ধনী ব্যক্তির তালিকায় রয়েছেন মাস্ক। ফোর্বস সাময়িকীর মতে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে তিনি বিশ্বে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে অর্ধট্রিলিয়ন ডলার বা ৫০০ বিলিয়ন নিট সম্পদ অর্জন করেন। এর এক মাস পর বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি কোম্পানি টেসলার শেয়ারহোল্ডাররা তার জন্য রেকর্ড পারিশ্রমিক প্যাকেজ অনুমোদন করেন, যার সম্ভাব্য মূল্য ১ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে বলে তখন জানানো হয়েছিল। আর স্পেসএক্সের শেয়ারদর উল্লম্ফনের পর শুক্রবার মাস্কের মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার, এর বেশির ভাগই শেয়ারের আকারে রয়েছে।

মাস্কের এ নতুন অবস্থান এমন এক সময়ে এসেছে, যখন বিশ্বের ধনীতম ব্যক্তিদের সম্পদ দ্রুতগতিতে বাড়ছে। অন্যদিকে বিশ্বের অনেক মানুষ প্রতিদিনের খরচ মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছে। অনেকের মতে, প্রথম ট্রিলিয়নেয়ারের আবির্ভাব বৈশ্বিক সম্পদ বৈষম্যের সবচেয়ে স্পষ্ট ও উদ্বেগজনক উদাহরণগুলোর একটি।

মাস্কের বিস্তৃত সাম্রাজ্যে অংশীদার হওয়ার সুযোগ: বাজারে আসা স্পেসএক্সের প্রাথমিক গণপ্রস্তাবে (আইপিও) আরো যুক্ত রয়েছে মাইক্রো ব্লগিং প্লাটফর্ম থেকে ইন্টারনেট কোম্পানি এক্স, গ্রক ও স্টারলিংক। গত শুক্রবার নাসডাকে প্রথম দিনের লেনদেনেই ১৯ শতাংশ লাফ দিয়েছে স্পেসএক্সের শেয়ার। এতে কোম্পানিটির বাজারমূল্য ২ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে যুক্তরাষ্ট্রের ষষ্ঠ বৃহত্তম কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে।

রকেট, স্যাটেলাইট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ঘিরে গড়ে ওঠা মাস্কের বিস্তৃত সাম্রাজ্যে অংশীদার হওয়ার সুযোগ লুফে নিতে মুখিয়ে ছিলেন বিনিয়োগকারীরা। ৭৫ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড আইপিওর পরদিনই ৫১ কোটির বেশি শেয়ার হাতবদল হয়, যার মূল্য প্রায় ৮৪ বিলিয়ন ডলার। যদিও স্পেসএক্স এখনো লাভজনক নয় এবং এর আয় একই মূল্যমানের বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর তুলনায় অনেক কম।

গত শুক্রবার স্পেসএক্সের প্রেসিডেন্ট গুইন শটওয়েল ও প্রধান অর্থ কর্মকর্তা ব্রেট জনসেন নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে নাসডাকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন। অন্যদিকে মাস্ক টেক্সাসে কর্মীদের জন্য আলাদা অনুষ্ঠান আয়োজন করেন। এদিন সকালে নাসডাকে স্বাভাবিকভাবেই লেনদেন শুরু হয়। দিনের শেষে স্পেসএক্সের শেয়ারদর দাঁড়ায় ১৬০ ডলার ৯৫ সেন্ট, ফলে কোম্পানিটির বাজারমূল্য পৌঁছে যায় ২ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারে। এতে ব্রডকমকে পেছনে ফেলেছে স্পেসএক্স, আর সামনে রয়েছে অ্যামাজন—যার বাজারমূল্য প্রায় ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার।

বিনিয়োগকারীদের উচ্ছ্বাস প্রসঙ্গে ইন্ডিয়ানাপোলিসভিত্তিক মাইন্ডসেট ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা সেথ হিকল বলেন, ‘অনেক বিনিয়োগকারীর কাছে স্পেসএক্সে বিনিয়োগ করা মানে শিল্প বিপ্লবের সময় রেলপথে বিনিয়োগ করার মতো। আর সেই সুযোগের জন্য তারা “ইলোন মাস্ক প্রিমিয়াম” দিতেও প্রস্তুত।’

অবশ্য বিশ্লেষক ও পোর্টফোলিও ম্যানেজাররা সতর্ক করে বলেছেন, পাবলিক কোম্পানি হিসেবে স্পেসএক্সের শুরুর সময়টা বেশ অস্থির হতে পারে। কারণ বাজারে কোম্পানিটির শেয়ারের পরিমাণ তুলনামূলক কম এবং মূল্যায়ন অত্যন্ত বেশি। কোম্পানিটির ১৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের আয় ধরে এর প্রাইস-টু-রেভিনিউ অনুপাত প্রায় ১১২, যা অন্যান্য মেগাক্যাপ কোম্পানির তুলনায় অনেক বেশি।

ওয়াশিংটনভিত্তিক ক্রসচেক ম্যানেজমেন্টের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা টড শোয়েনবার্গার বলেন, ‘প্রশ্ন হলো কয়েক সপ্তাহ পর কী হবে। এখন সবাই শেয়ার কিনে দাম বাড়াতে চাইছে, কারণ এটি এখন বিজয়ীর মতো দেখাচ্ছে। কিন্তু সেটি টিকে থাকবে কিনা, তা এখনো দেখার বিষয়।’

ছয় বছরে ২৮ বিলিয়ন থেকে ট্রিলিয়ন ডলার সম্পদ

ইলোন মাস্কের সম্পদের পরিমাণ ২০২০ সালের শুরুতে ছিল ২৮ বিলিয়ন ডলার। ওই সময় বিশ্বের ধনীদের তালিকায় তার অবস্থান ছিল ৩৫তম। এরপর আসে টেসলার শেয়ারের উত্থান, স্পেসএক্সের দ্রুত সম্প্রসারণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স অধিগ্রহণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান এক্সএআইয়ের প্রবৃদ্ধি মিলিয়ে সাড়ে ছয় বছরে এ ধনকুবেরের সম্পদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ১১ ট্রিলিয়ন ডলারে।

২০২০ সালের শুরুতে বিশ্বের ৩৫তম ধনী ব্যক্তি ছিলেন ইলোন মাস্ক। পরের বছরের জানুয়ারিতে ১৯৫ বিলিয়ন ডলার সম্পদ নিয়ে জেফ বেজোসকে টপকে সাময়িকভাবে হন বিশ্বের শীর্ষ ধনী। একই বছরের নভেম্বর নাগাদ টেসলার শেয়ারের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধির কারণে মাস্কের সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৪০ বিলিয়ন ডলার। তবে ২০২২-২৩ সালে বড় অংকের সম্পদ হারানোর পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে কিছুটা পুনরুদ্ধার হয়, ২৬৪ বিলিয়ন ডলার। গত মে মাসে মার্কিন সরকারের বিশেষ পদ থেকে সরে দাঁড়ান ইলোন মাস্ক, তখন তার সম্পদের আকার ছিল ৩৮৭ বিলিয়ন ডলার। এরপর ডিসেম্বরে স্পেসএক্স শেয়ারবাজারে আসবে এমন গুঞ্জন ছড়ায়, তখন সম্পদের আকার দাঁড়ায় ৬৩৮ বিলিয়ন ডলার। গত ফেব্রুয়ারিতে স্পেসএক্স ও এক্সএআই একীভূত হওয়ার পর ৬৭০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে। এরপর চলতি মাসে পুঁজিবাজারে স্পেসএক্সের ঐতিহাসিক অভিষেকের পর বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নেয়ার ইলোন মাস্ক।

বিশ্বের দ্বিতীয় ধনী ব্যক্তির চেয়ে ৭০৬ বিলিয়ন ডলার বেশি

ফোর্বসের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় ধনী ব্যক্তি গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ। গত শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত তার সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৯৪ বিলিয়ন ডলার। আর মাস্কের পরের চার ব্যক্তির সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক শূন্য ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ সম্মিলিত সম্পদেও পিছিয়ে আছেন তারা। ল্যারি পেজের পরে রয়েছেন সের্গেই ব্রিন (২৭১ বিলিয়ন), জেফ বেজোস (২৪৯ বিলিয়ন) ও ল্যারি এলিসন (২৩২ বিলিয়ন ডলার)।

রয়টার্স, এপি ও বিবিসি অবলম্বনে

আরও