বৈশ্বিক সংকট সত্ত্বেও কেন কমছে স্বর্ণের দাম?

সুদহার ও মূল্যস্ফীতি যেন দোলনার দুই প্রান্ত, আর স্বর্ণ রয়েছে মাঝখানে। ২০২৬ সালে এই দুই শক্তিই একসঙ্গে কাজ করছে, তবে আপাতত সুদহারের প্রভাবই বেশি শক্তিশালী হওয়ায় স্বর্ণের দাম নিম্নমুখী রয়েছে

সাধারণত বৈশ্বিক সংকট বা যুদ্ধের সময়ে বিনিয়োগকারীরা আপদকালীন বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকে থাকেন, ফলে ধাতুপণ্যটির দাম বেড়ে যায়। তবে এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক অর্থনীতি চাপের মুখে পড়লেও স্বর্ণের দাম যেন উল্টো পথে হাঁটছে, দাম বাড়ার বদলে কমছে।

আল জাজিরার একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়, চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি প্রতি ট্রয় আউন্স বা ৩১দশমিক ১ গ্রাম স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ৩০৩ ডলারে পৌঁছে। এরপর গত সাড়ে তিন মাস ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংকট দেখছে বিশ্ব। এমন পরিস্থিতিতেও গত শুক্রবার স্বর্ণের দাম কমে ৪ হাজার ২৩৫ ডলারে নেমে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এর প্রধান কারণ হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি। বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদহার কমাবে না, বরং প্রয়োজনে আরো বাড়াতে পারে।

মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থাকে। হামলার জবাবে ইরান এ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচলে সীমিত করায় ব্যাহত হচ্ছে জ্বালানি তেল ও গ্যাস সরবরাহ। ফলে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং সেই প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিতে।

যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ, ৪ দশমিক ২ শতাংশ। একই সময়ে দেশটির শ্রমবাজারও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ফলে দ্রুত সুদহার কমানোর সম্ভাবনা অনেকটাই কমে গেছে।

যদিও স্বর্ণকে মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে সুরক্ষার মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়, উচ্চ সুদহার সাধারণত স্বর্ণের জন্য নেতিবাচক। কারণ স্বর্ণ এমন একটি সম্পদ, যা নিজে থেকে কোনো সুদ বা লভ্যাংশ দেয় না। স্বর্ণে লাভ করতে হলে এর বাজারমূল্য বাড়তে হয়।

অপশনস্প্রেডার্স ডটকমের প্রধান বিশ্লেষক জাস্টিন কার্ডওয়েল বলেন, ‘স্বর্ণ এমন একটি সম্পদ, যা লভ্যাংশ দেয় না এবং দাম না বাড়লে কোনো আয়ও দেয় না। মানুষ মূলত মূল্যবৃদ্ধির আশায় স্বর্ণ কেনে।’

এ কারণে সুদহার ও স্বর্ণ কার্যত প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে থাকে। সুদহার বেশি হলে বিনিয়োগকারীরা ডলারভিত্তিক সম্পদে বেশি আগ্রহী হন, যা স্বর্ণের চাহিদা কমিয়ে দেয়।

মার্কিন ডলারের মানের ওপরও পড়েছে ইরান যুদ্ধের প্রভাব। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ডলার শক্তিশালী হয়েছে। আর যেহেতু স্বর্ণের মূল্য ডলারে নির্ধারিত হয়, তাই ডলার শক্তিশালী হলে সাধারণত স্বর্ণের দাম কমে।

নোবেল গোল্ড ইনভেস্টমেন্টসের প্রধান নির্বাহী কলিন প্লুম বলেন, ‘ডলার শক্তিশালী হলে স্বর্ণের ওপর চাপ বাড়ে, আর ডলার দুর্বল হলে স্বর্ণের দাম বাড়তে থাকে। বর্তমানে ডলার শক্তিশালী, তাই স্বর্ণ চাপে রয়েছে।’

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বছরের বাকি সময় এবং আগামী কয়েক বছরে পরিস্থিতি কী দিকে যাবে, সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কয়েক মাস আগে যেখানে সুদহার কমার সম্ভাবনা ছিল, এখন সেখানে সুদহার বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফেডারেল রিজার্ভকে সুদহার কমানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু বাজার বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সুদহার বাড়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশেরও বেশি।

বিশ্লেষকদের মতে, সুদহার ও মূল্যস্ফীতি যেন দোলনার দুই প্রান্ত, আর স্বর্ণ রয়েছে মাঝখানে। ২০২৬ সালে এই দুই শক্তিই একসঙ্গে কাজ করছে, তবে আপাতত সুদহারের প্রভাবই বেশি শক্তিশালী হওয়ায় স্বর্ণের দাম নিম্নমুখী রয়েছে।

তবে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতার খবর প্রকাশের পর স্বর্ণের দাম সামান্য বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুদ্ধ শেষ হলে মূল্যস্ফীতির চাপ কমতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণবাজারকে কিছুটা সহায়তা করবে। তবে যুদ্ধ শেষ হলেও অন্যান্য অর্থনৈতিক কারণে স্বর্ণের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন দ্রুত ঘটবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

আরও