ঈদযাত্রা শুরু হয়ে গেছে, স্বপ্নও বাড়ি যাওয়া শুরু করেছে। তবে অনেকের ক্ষেত্রেই এ আনন্দের যাত্রাপথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় ‘মোশন সিকনেস’ বা যাত্রাকালীন বমি ভাব। চলন্ত গাড়ি, বাস বা ট্রেনে উঠলেই মাথা ঘোরা, শরীর ম্যাজম্যাজ করা, অতিরিক্ত ঘাম হওয়া কিংবা বমি হওয়া অত্যন্ত সাধারণ একটি সমস্যা। মূলত আমাদের চোখ, কান এবং মস্তিষ্কের মধ্যে সংকেত আদান-প্রদানের ভারসাম্যহীনতার কারণে এই শারীরিক অস্বস্তি তৈরি হয়। একটু সচেতনতা এবং জীবনযাত্রায় সামান্য কিছু পরিবর্তন আনলেই এ সমস্যা থেকে মুক্তি পেয়ে ভ্রমণকে আনন্দদায়ক করে তোলা সম্ভব।
চিকিৎসকদের মতে, ভ্রমণের সময় মোশন সিকনেস এড়াতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে খাবারের অভ্যাস। যাত্রার ঠিক আগে অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত, গুরুপাক বা ভাজাপোড়া খাবার খাওয়া কোনোভাবেই উচিত নয়। এগুলো হজমে ব্যাঘাত ঘটায় এবং বমি ভাব বাড়িয়ে দেয়। আবার অন্যদিকে একেবারে খালি পেটে ভ্রমণ করাও সমান বিপজ্জনক। তাই বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে হালকা এবং সহজে হজম হয় এমন খাবার।
ভ্রমণের সময় শরীরে পানির ঘাটতি হওয়া ঠিক নয়, তবে গাড়িতে উঠে বমি ভাব শুরু হলে অতিরিক্ত পানি পান করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
গণপরিবহন বা বাসে ভ্রমণের ক্ষেত্রে বসার জায়গা বা সিট নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাসের পেছনের দিকের সিটগুলোতে ঝাঁকুনি অনেক বেশি অনুভূত হয়, যা শরীরের ভারসাম্য দ্রুত নষ্ট করে দেয়। তাই বুকিংয়ের সময় সবসময় বাসের সামনের দিকের সিট বেছে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। জানালার পাশে বসলে বাইরের চলমান দৃশ্য ও দিগন্তের দিকে তাকিয়ে থাকা যায়। এটি মস্তিষ্ককে স্থিরতা অনুভব করতে সাহায্য করে।
চলন্ত অবস্থায় মোবাইল ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা কিংবা বই পড়ার অভ্যাস পরিহার করতে হবে। কারণ যখন কোন স্থির বস্তুর ওপর মনোযোগ দেয়া হয় তখনও শরীর সচল থাকে। ফলে মস্তিষ্ক বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং বমি ভাব তীব্র হয়।
সতেজ বাতাস এবং উপযুক্ত পরিবেশ মোশন সিকনেস দূর করতে কার্যকর। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) গাড়ির বদ্ধ বা গরম পরিবেশ অনেকের ক্ষেত্রে অস্বস্তি বাড়িয়ে দেয়। তাই দূরপাল্লার যাত্রায় এসি বন্ধ রেখে গাড়ির জানালার কাচ খুলে বাইরের খোলা হাওয়া উপভোগ করা প্রয়োজনে মাঝেমধ্যে একটু ভেজা রুমাল দিয়ে মুখ ও চোখ মুছে নিলে দ্রুত সতেজতা ফিরে পাওয়া যায়।
প্রাকৃতিক কিছু উপাদানও যাত্রাপথের অস্বস্তি কমাতে বেশ কার্যকরী। ভ্রমণের পূর্বে সামান্য আদা চিবিয়ে খাওয়া অথবা আদা চা পান করলে উপকার পাওয়া যায়। এছাড়া লেবুর সুগন্ধ, পুদিনাপাতার ঘ্রাণ কিংবা মুখে কয়েকটি এলাচের বীজ বা মৌরি রাখলে বমি ভাব অনেকটাই কেটে যায়। অনেকে স্বস্তির জন্য মিন্ট ফ্লেভারের চুয়িংগামও ব্যবহার করে থাকেন। এক কাপ পানিতে আধা চামচ দারচিনির গুঁড়ো ফুটিয়ে তৈরি করা পানীয়ও যাত্রাপথের ক্লান্তি ও অস্বস্তি দূর করতে সাহায্য করে।
যেকোনো ভ্রমণের আগে পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক প্রশান্তি অত্যন্ত জরুরি। শরীর ক্লান্ত থাকলে এবং মনের মধ্যে বমি হওয়ার ভয় বা দুশ্চিন্তা কাজ করলে মোশন সিকনেসের প্রবণতা দ্বিগুণ হয়ে যায়। তাই যাত্রার আগের রাতে ভালোভাবে বিশ্রাম নেওয়া উচিত। যারা দীর্ঘদিনের ক্রনিক সমস্যায় ভুগছেন, তারা ভ্রমণের পূর্বে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে রাখতে পারেন। সামান্য কিছু পূর্বপ্রস্তুতি ও সতর্কতা মেনে চললে যেকোনো ভ্রমণই হয়ে উঠতে পারে নিরাপদ ও আনন্দময়।