রক্তের টান কী আসলেই সবকিছুর ঊর্ধ্বে? সাম্প্রতিক সময়ে প্রশ্নটি আমাদের চেনা সমাজব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছে। আমাদের সংস্কৃতিতে পরিবারকে ভাবা হয় পরম মমতার নিরাপদ আশ্রয়। অথচ বর্তমান সময়ে এসে যৌথ পরিবারের দেখা মেলা তো ভারই, উল্টো একক পরিবার থেকেও সন্তানরা ক্রমান্বয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। সন্তানদের এ সিদ্ধান্তকে সমাজ সাধারণত বেয়াদবি বা পাশ্চাত্যের হাওয়া বলে খুব কঠোরভাবে বিচার করে।
পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা
আমাদের দেশে পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার পরিমাণ প্রায় শূন্য। বিষয়টি এখনো চরম সামাজিক ট্যাবু, যা লোকলজ্জার ভয়ে সবাই এড়িয়ে চলেন। তবে বৈশ্বিক চিত্রটি বেশ উদ্বেগজনক। ২০২২ সালে আমেরিকায় করা এক গবেষণায় দেখা যায়, ২৬ শতাংশ মানুষ বাবার থেকে আর ৬ শতাংশ মায়ের থেকে বিচ্ছিন্ন। জার্মানির সমীক্ষা অনুযায়ী, বাবার সঙ্গে সম্পর্ক নেই ২০ শতাংশ মানুষের।
সমাজবিজ্ঞানী কার্ল পিলেমারের মতে, বিশ্বজুড়ে এ প্রবণতা বাড়ছে। আজকের শহরকেন্দ্রিক বাঙালি পরিবারগুলোর দিকে তাকালে এ সত্য আর এড়ানো যায় না। অনেক পরিবারে এখন সন্তানরা একই ছাদের নিচে থেকেও সম্পূর্ণ আবেগহীন ও বিচ্ছিন্ন জীবন কাটাচ্ছে, যা এক নীরব মহামারির রূপ নিচ্ছে।
বন্ধন ভাঙার পেছনের কারণ
বাঙালি পরিবারে আনুগত্যের যে ঐতিহ্য ছিল, তা বর্তমান প্রজন্মের কাছে এসে ধাক্কা খাচ্ছে। এর পেছনের মূল কারণগুলো হলো:
- ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট জোশুয়া কোলম্যানের মতে, পরিবারকে সুখী করতে ‘নিজেকে বিসর্জন দেয়ার’ পুরোনো তত্ত্বে বর্তমান প্রজন্ম আর বিশ্বাসী নয়। আজকের তরুণরা নিজের মানসিক শান্তি ও সুখ নিয়ে অনেক বেশি সচেতন। সম্পর্কটি রক্তের হলেও তা যদি ‘টক্সিক’ বা ক্ষতিকর হয়, তবে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার্থেই তারা দূরত্ব বজায় রাখছে।
- যুগে যুগে সন্তান লালন-পালনের সংজ্ঞা বদলেছে। আগের যুগে শৈশবে বাবা-মায়ের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ বা কড়া শাসনকে সমাজ স্বাভাবিক বলত। কিন্তু বর্তমান সময়ে সচেতনতার কারণে এ আচরণগুলো মানসিক নির্যাতন, ট্রমা বা অবহেলা হিসেবে গণ্য হচ্ছে, যা নতুন প্রজন্ম আর মুখ বুজে মেনে নিতে পারছে না।
- ক্যারিয়ার, জীবনসঙ্গী বাছাই,কিংবা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মতাদর্শের অমিলের কারণে পরিবারে তীব্র দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে। সন্তান যখন দেখে তার আবেগকে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে, তখন সে দূরে সরে যায়।
- বাংলাদেশে ভাইবোনের মধ্যে বা বাবা-মার সঙ্গে বিচ্ছিন্নতার একটি বড় কারণ পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব। এছাড়া বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদের জেরে সন্তানকে যেকোনো এক পক্ষ নিতে বাধ্য করাও এ দূরত্বের অন্যতম কারণ।
- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আজকাল ‘প্যারেন্টাল ট্রমা’, ‘টক্সিক প্যারেন্টিং’ বা ‘বাউন্ডারি’র মতো মনস্তাত্ত্বিক শব্দের ব্যবহার বেড়েছে। ইন্টারনেটের বিভিন্ন ইনফ্লুয়েন্সার ও থেরাপিস্টরা মানসিক ক্ষতি এড়াতে ক্ষতিকর মানুষ বর্জন করার পরামর্শ দেন, যা সন্তানদের এ কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।