সবচেয়ে ‘বিধ্বংসী’ মানসিক ব্যাধি সিজোফ্রেনিয়া

সিজোফ্রেনিয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে রোগীরা তীব্র হ্যালুসিনেশন ও ডিলিউশনের কারণে সমাজ ও পরিবার থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। তারা অবাস্তব এক আতঙ্কে ভোগেন যে তাদের চারপাশের মানুষ, এমনকি নিজের সন্তানও তাদের ক্ষতি করতে চাইছে

কিছুতেই মন থেকে ভয় যায় না, আড়াল থেকে কেউ যেন সবসময় তাড়া করে বেড়ায়। চোখের সামনে ভেসে ওঠে অদ্ভুত সব বিচিত্র দৃশ্য। কানে আসে অচেনা কারো অবাস্তব কণ্ঠস্বর। অবচেতনে কেউ একজন প্রতিনিয়ত উত্ত্যক্ত করে চলে। মনের এ চরম জটিল ও অন্ধকার অসুখটিই চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘সিজোফ্রেনিয়া’ নামে পরিচিত। আমাদের দেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা কম থাকায় অসুখটি সম্পর্কে যেমন স্বচ্ছ ধারণা নেই, তেমনি সাধারণ পাঁচটা মনোরোগের সঙ্গে সিজোফ্রেনিয়ার রোগীকে আলাদা করাও সাধারণ মানুষের জন্য বেশ কঠিন।

সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরের একটি ঘটনা বেশ আলোড়ন তুলেছে—'সন্তানের নির্মম অবহেলায় মায়ের মৃত্যু'। তবে পারিবারিক সূত্র ও চিকিৎসাগত তথ্য বলছে, মৃত ওই নারী দীর্ঘদিন ধরে তীব্র ‘সিজোফ্রেনিয়া’ ব্যাধিতে ভুগছিলেন। বাইরে থেকে যা ‘সন্তানের অবহেলা’ বা ‘না খাইয়ে রাখা’ বলে মনে হচ্ছে, তা হয়েতো এ বিধ্বংসী মানসিক রোগেরই ভয়াবহ ও নির্মম বহিঃপ্রকাশ।

আমেরিকার সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের মতে, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় দশমিক ৩২ শতাংশ বা ২ কোটি ৪০ লাখ মানুষ এ দীর্ঘমেয়াদি মস্তিষ্কের ব্যাধিতে আক্রান্ত। আমাদের দেশেও এক বিশাল জনগোষ্ঠী নীরবে এ ব্যাধি বয়ে বেড়াচ্ছেন। হ্যালুসিনেশন (এমন কিছু দেখা বা শোনা যা বাস্তবে নেই), ডিলিউশন (অমূলক বা ভ্রান্ত বিশ্বাস), তীব্র সংশয় বা প্যারানয়া, চিন্তাভাবনার অসংলগ্নতা এবং তীব্র ইচ্ছাশক্তির অভাব এ রোগের প্রধান লক্ষণ।

সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সমাজে সিজোফ্রেনিয়া নিয়ে সবচেয়ে বেশি কুসংস্কার, লোকলজ্জা ও সামাজিক কলঙ্ক জড়িয়ে রয়েছে। সচেতনতার অভাবে এ দেশের সাধারণ মানুষ এ রোগীদের ‘উন্মাদ’, ‘পাগল’ কিংবা ‘জিনে ধরা’ বলে অভিহিত করে। লোকমুখে প্রচলিত আছে, সিজোফ্রেনিয়ার রোগীরা ভীষণ বিপজ্জনক বা হিংস্র হন। অথচ কঠিন সত্য হলো, এ রোগীরা অন্য কারো চেয়ে নিজের জন্যই বেশি ক্ষতিকর বা বিপজ্জনক হয়ে ওঠেন। লোকলজ্জা, ভীতি ও ভুল ধারণার কারণে রোগীরা সময়মতো সঠিক চিকিৎসা পান না, যার কারণে তাদের গড় আয়ু ও জীবনযাত্রার মান মারাত্মকভাবে কমে যায়।

রোগটির আক্রমণ কখন ও কেন হয়?

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সের মধ্যে—অর্থাৎ তারুণ্যের শুরুতেই এ রোগের লক্ষণগুলো প্রথম প্রকাশ পায়। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সবচেয়ে বিধ্বংসী মানসিক রোগ; কারণ একজন মানুষকে তার ক্যারিয়ার, পড়াশোনা বা জীবনের পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছানোর আগেই এ রোগে আক্রান্ত হন।

কৈশোর থেকে পূর্ণ বয়সে পদার্পণের সময় মস্তিষ্কের যে স্বাভাবিক বিকাশ ঘটে, তাতে কোনো বিঘ্ন ঘটলে এ রোগ হতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে এ সমস্যার বীজ শিশুকাল থেকেই সুপ্ত থাকে, যা ২০ বছর পর মস্তিষ্কের পূর্ণ পরিপক্বতার সময় হঠাৎ প্রকাশ পায়। নারীদের তুলনায় পুরুষদের আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি। তবে নারীদের ক্ষেত্রে মেনোপজের (ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়া) পর ৫০ বছরের কাছাকাছি বয়সে এ রোগের একটি দ্বিতীয় ধাপের ঝুঁকি দেখা যায়।

সিজোফ্রেনিয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি। তবে জিনগত গঠন, মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতা ও প্রসবকালীন জটিলতা আক্রমণের ঝুঁকি দ্বিগুণ করতে পারে। এ ছাড়া অতিরিক্ত মানসিক চাপ, পারিবারিক অশান্তি বা শৈশবের কোনো ট্রমাও এর অন্যতম বড় কারণ।

হ্যালুসিনেশন ও ডিলিউশনের জটিল জগৎ

সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণগুলো রোগীর ভাবনার জগৎকে এমনভাবে ওলটপালট করে দেয় যে, বাস্তব আর কল্পনার পার্থক্য তারা করতে পারেন না। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, সিজোফ্রেনিয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে রোগীরা তীব্র হ্যালুসিনেশন ও ডিলিউশনের কারণে সমাজ ও পরিবার থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। তারা অবাস্তব এক আতঙ্কে ভোগেন যে তাদের চারপাশের মানুষ, এমনকি নিজের সন্তানও তাদের ক্ষতি করতে চাইছে। এ তীব্র ‘প্যারানয়া’ বা অকারণ ভীতির কারণে রোগীরা অনেক সময় সন্তানের দেয়া খাবারকে ‘বিষ’ মনে করে প্রত্যাখ্যান করেন, সুচিকিৎসার জন্য দেয়া ওষুধ ফেলে দেন এবং নিজেকে ঘরের এক অন্ধকার কোণে বা খাটের নিচে বন্দি করে রাখেন।

সবচেয়ে কষ্টদায়ক বিষয় হলো অবাস্তব কণ্ঠস্বর শোনা। অনেক রোগী একসঙ্গে একাধিক মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে পান, যারা প্রতিনিয়ত তাকে নিয়ে নেতিবাচক কথা বলছে বা গালি দিচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, এ অবয়বহীন কণ্ঠস্বরগুলো অনেক সময় রোগীকে আত্মহননের মতো মারাত্মক আদেশ দেয় এবং রোগীরা সেই ঘোর থেকে তা অমান্য করতে পারেন না। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, স্কিজোফ্রেনিয়ার প্রায় ৫ থেকে ১৩ শতাংশ রোগী শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

নিরাময় অসম্ভব হলেও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব

মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, স্কিজোফ্রেনিয়া পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য নয়, তবে সঠিক ওষুধ ও নিয়মিত সাইকোথেরাপির সমন্বয়ে রোগীকে অনেকটাই স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তবে এ চিকিৎসার সবচেয়ে বড় ব্যবহারিক বাধা হলো ‘অ্যানোসোগনোসিয়া’; অর্থাৎ প্রায় ৫০ থেকে ৯৮ শতাংশ রোগী নিজেই বুঝতে পারেন না বা মানতে চান না যে তিনি অসুস্থ। ফলে তারা ওষুধ খেতে তীব্র অস্বীকৃতি জানান।

বর্তমানে আধুনিক চিকিৎসায় কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি ও সামাজিক দক্ষতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রোগীরা এ অবাস্তব কণ্ঠস্বর বা আত্মঘাতী তাড়নাগুলোকে উপেক্ষা করতে শিখছেন। বাংলাদেশেও এখন আধুনিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রসারিত হচ্ছে। কুসংস্কারের বেড়াজাল ভেঙে রোগীকে ‘পাগল’ আখ্যা দিয়ে অবহেলা না করে, প্রাথমিক লক্ষণ দেখামাত্রই যদি অভিজ্ঞ সাইকিয়াট্রিস্ট বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন করা যায়, তবে স্কিজোফ্রেনিয়া জয় করা সম্ভব।

আরও