সন্তানের প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্যের প্রশ্নে কোনো ছাড় নয়—এ কঠোর মনোভাব থেকেই ‘টাইগার প্যারেন্টিং’-এর মতো কঠোর অভিভাবকত্ব ধারণার জন্ম। এ শাসনব্যবস্থায় পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বরের বিনিময়ে ভালোবাসা মেলে আর ভুল করলে জোটে মানসিক ও শারীরিক নিপীড়ন। বাহ্যিক দৃষ্টিতে এ শিশুরা ক্লাসের সেরা হলেও, অতি-নিয়ন্ত্রণ শৈশবকে নিঃশব্দে গ্রাস করে ফেলে। সফলতার অন্ধ মোহে পড়ে সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্য নষ্ট করা হয়।
ধারণার উৎপত্তি
টাইগার প্যারেন্টিংয়ের ধারণাটি নতুন কিছু নয়। এর মনস্তাত্ত্বিক শিকড় পোঁতা রয়েছে খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকের চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াসের শিক্ষার মধ্যে। কনফুসিয়াসের দর্শন পরিবারে কঠোর স্তরবিন্যাস, আনুগত্য, কঠোর পরিশ্রম ও শিক্ষার প্রতি পরম প্রতিশ্রুতির কথা বলে। পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় এখনো এ দর্শনের প্রভাব প্রবল।
বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়নশীল ও অভিবাসী পরিবারগুলোর কাছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক মর্যাদা বৃদ্ধির প্রধান হাতিয়ার উচ্চশিক্ষা। ফলে ফলে বাবা-মায়েরা নিজেদের জীবনের অপূর্ণতা, অধরা স্বপ্ন আর সামাজিক মর্যাদা সন্তানের মাধ্যমে পূরণ করতে চান।
শব্দটিকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করান ইয়েল ল স্কুলের অধ্যাপক অ্যামি চুয়া। ২০১১ সালে তার ‘ব্যাটল হিম অব দ্য টাইগার মাদার’ বইটিতে নিজের দুই মেয়েকে কঠোর শাসনে বড় করার অভিজ্ঞতা লিখতে গিয়ে তিনি দেখান, কীভাবে প্রাচ্যের মায়েরা সন্তানের সফলতার জন্য চরম ত্যাগ স্বীকার করতে পারেন। তবে বইয়ের শেষাংশে যখন তার ১৩ বছর বয়সী মেয়ে এ দমবন্ধ করা শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র বিদ্রোহ ঘোষণা করে, তখন চুয়া নিজেও বুঝতে পেরেছিলেন—শাসন যখন শোষণে রূপ নেয়, তখন সম্পর্ক ভেঙে যায়।
প্রভাব:
বাঘ যেমন তার সীমানার ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখে, ঠিক তেমনি ‘টাইগার প্যারেন্ট’ সন্তানের পুরো জীবন নিজের হাতের মুঠোয় এনে নিয়ন্ত্রণ করতে চান। এ শাসনব্যবস্থায় স্নেহের প্রকাশ ঘটে শর্তসাপেক্ষে— ভালো ফল করো, তবেই তুমি আদর পাবে।
এ ঘরানার অভিভাবকত্বের প্রধান হাতিয়ার চরম কঠোরতা। এখানে সন্তানের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো দাম নেই। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়া, জন্মদিনের পার্টিতে যাওয়া কিংবা ছুটির দিনে একটু অলস সময় কাটানোকে ‘সময় নষ্ট’ বা ‘অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করা হয়।
সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় সন্তানের স্বায়ত্তশাসনে। সে কী পোশাক পরবে, বড় হয়ে কোন পেশায় যাবে, এমনকি অবসরে কী বই পড়বে—সবকিছুই অভিভাবক নির্ধারণ করেন। সন্তানের নিজস্ব কোনো সত্ত্বা, চিন্তা বা আবেগকে মূল্য দেয়া হয় না। সাফল্য বলতে তারা বোঝেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হওয়া কিংবা করপোরেট দুনিয়ার শীর্ষ পদে বসা। গান, কবিতা, ছবি আঁকা কিংবা মানুষের সাথে মিশতে পারার মতো মননশীল গুণগুলো এ কঠিন শাসনে ‘অপ্রয়োজনীয় আবেগ’ হিসেবে অবহেলিত হয়।
শৈশব থেকে শর্তহীন ভালোবাসা না পেয়ে বেড়ে ওঠা এ শিশুরা এক সময় তীব্র ‘অ্যাংজাইটি’ বা দুশ্চিন্তা ও বিষণ্ণতায় ভোগে। ভুল করলেই প্রিয়জন হারানোর ভয় তাদের তাড়া করে বেড়ায়। এ অতিরিক্ত ভীতি তাদের আত্মমর্যাদাবোধ তৈরিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনা ঘটে যখন এই শিশুরা প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে বাস্তব দুনিয়ায় পা রাখে। যেহেতু ছোটবেলা থেকে প্রতিটি ছোট-বড় সিদ্ধান্ত বাবা-মা নিয়ে দিয়েছেন, তাই একা চলার পথে কোনো সমস্যার সম্মুখীন হলে তারা চরম সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে। অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা তাদের ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে যায়। শুধু তা-ই নয়, অতি-নিয়ন্ত্রণের কারণে তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও একাকীত্ব জন্ম নেয়, যা অনেক সময় মারাত্মক আত্মহনন বা আত্মপীড়নের পথ বেছে নিতে বাধ্য করে।
উত্তরণের উপায়:
টাইগার প্যারেন্টিংয়ের এ অন্ধকার বৃত্ত থেকে বের হতে প্যারেন্টিংয়ের ধরনে আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি।
- সন্তান কোনো ভুল করলে বা কম নম্বর পেলে চিৎকার না করে, তার পাশে বসুন। শুনুন তার ভেতরে কী চলছে। তাকে বুঝতে দিন যে, পরীক্ষার নম্বর পাওয়ার চেয়ে তার মানসিক সুস্থতা আপনার কাছে অনেক বেশি মূল্যবান।
- সন্তানকে বোঝানো দরকার, সে ফার্স্ট হোক বা লাস্ট, মা-বাবার ভালোবাসা সবসময় একই থাকবে। এ আশ্বাসটুকু পেলে শিশুরা জীবনের যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করার সাহস পায়।
- সন্তানকে নিজের মতো করে ভাবতে দিন। তার ছোট ছোট মতামতকে গুরুত্ব দিন। সে যদি কোনো বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করে, তবে তাকে ধমক না দিয়ে তার যুক্তিটি বোঝার চেষ্টা করুন। এতে তার সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়বে।
- সন্তান বড় হওয়ার সাথে সাথে তার নিজস্ব একটা জগত তৈরি হয়। তার ওপর গোয়েন্দাগিরি করলে আস্থার সম্পর্ক নষ্ট হয়। দূর থেকে নজর রাখুন, কিন্তু তার ব্যক্তিগত সীমানাকে সম্মান করুন।
- জীবন মানেই ভুল ও শুদ্ধর কোলাজ। সন্তানকে শেখাতে হবে, ব্যর্থতা মানেই জীবনের শেষ নয়, বরং এটি নতুন করে শেখার প্রথম ধাপ। ভুল করলে তাকে সঠিক পথ দেখানোই প্রকৃত অভিভাবকত্ব।
ভেরিওয়েল মাইন্ড অবলম্বনে