সাড়ে আট বছরের প্রেম। তারপর দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে। কিন্তু বিয়ের বয়স মাত্র ছয় মাস পেরোতেই এক রাতে ডাইনিং টেবিলে খাবারের বাটিটা সামনে নামিয়ে রেখে স্বামী বললেন, আমি এ সংসারে সুখী নই। ব্যস, ওখানেই শেষ! কোনো বড় ঝগড়া নেই, মান-অভিমান ভাঙানোর সুযোগ নেই, সম্পর্কটা জোড়া লাগানোর ন্যূনতম কোনো চেষ্টাও নেই।
এ ধরণের ঘটনা এখন আর সুদূর পাশ্চাত্যের কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দক্ষিণ এশিয়া এমনকি বাংলাদেশেও আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে ‘হঠাৎ বিচ্ছেদ’। কোনো রকম পূর্বসংকেত ছাড়াই হুট করে একদিন সঙ্গী বৈবাহিক সম্পর্কের ইতি টেনে দেন। মনোবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হচ্ছে ‘ব্লাইন্ডসাইড ডিভোর্স’ বা ‘আচমকা বিচ্ছেদ’।
কেন ঘটছে এ ‘আচমকা বিচ্ছেদ’?
পারিবারিক বা মানসিক নির্যাতন কিংবা ঘরের ভেতরে কোনো নিরাপত্তাহীনতা থাকলে হুট করে ঘর ছাড়া বা বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেয়াটা সম্পূর্ণ যৌক্তিক ও জীবন বাঁচানোর তাগিদ। তবে আপাতদৃষ্টিতে শান্ত ও ‘সব ঠিকঠাক’ থাকা দাম্পত্যেও কেন এমনটা ঘটছে, তার পেছনে বিশেষজ্ঞরা মনস্তাত্ত্বিক কিছু কারণ দেখিয়েছেন:
১. ‘এড়িয়ে চলার’ মানসিকতা
মানুষের ব্যক্তিত্বের ধরণ এখানে বড় ভূমিকা রাখে। যাদের মধ্যে গভীর আবেগ বা বন্ধনে আটকে যাওয়ার ভয় থাকে, তারা সম্পর্কে কোনো সমস্যা তৈরি হলে তা নিয়ে সঙ্গীর সাথে খোলামেলা আলোচনা করতে পারে না। এরা ভেতরে ভেতরে অসন্তুষ্ট হলেও মুখে ‘সব ঠিক আছে’ এমন ভান করে চলে এবং এক সময় আচমকা সম্পর্ক ছিন্ন করার মতো চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে।
২. বোঝাপড়ার অভাব ও একতরফা সিদ্ধান্ত
দুর্ভাগ্যবশত, ডিভোর্স খুব কম সময়ই উভয়ের পারস্পরিক সম্মতিতে হয়। বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারে এখনো অনেকেই মনে করেন, সমস্যা নিয়ে কথা বললে যদি ঝামেলা আরো বাড়ে? এই ভয় থেকে মনের ভেতরের ক্ষোভ জমিয়ে রাখতে রাখতে একসময় মানুষটি হুট করে রণে ভঙ্গ দেয়। অপর সঙ্গীর কাছে তখন বিষয়টি পুরোপুরি ‘আকাশ থেকে পড়ার মতো’ মনে হয়।
লিঙ্গভেদে বিচ্ছেদের ভিন্ন প্রভাব
আমাদের দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি আচমকা বিচ্ছেদ পুরুষ ও নারীর ওপর সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই ধরনের চাপ তৈরি করে:
- নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট: বাংলাদেশে একজন ডিভোর্সি নারীকে এখনো তীব্র সামাজিক গ্লানি আর কটু কথার মুখোমুখি হতে হয়। আচমকা বিচ্ছেদের পর অনেক নারীই হুট করে অর্থনৈতিক ও আবাসন সংকটে পড়েন। বিশেষ করে যদি সন্তান থাকে, তবে একা হাতে সব সামলানো পাহাড়সম যুদ্ধের মতো হয়ে দাঁড়ায়। তবে বাঙালি নারীরা সাধারণত পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে আবেগ ভাগ করে নিতে পারেন, যা তাদের মানসিকভাবে দ্রুত সামলে উঠতে সাহায্য করে।
- পুরুষদের একাকীত্ব ও মানসিক সংকট: গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষরা অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলে উঠতে পারলেও মারাত্মক মানসিক আইসোলেশন বা একাকীত্বে ভোগেন। তারাসচরাচর বন্ধুদের কাছে মনের কষ্ট প্রকাশ করতে পারেন না। আবেগীয় সমর্থনের জন্য তারা সম্পূর্ণ স্ত্রীর ওপর নির্ভরশীল থাকেন। ফলে স্ত্রী হুট করে চলে গেলে পুরুষদের মধ্যে তীব্র বিষণ্ণতা ও আত্মহত্যার ঝুঁকি নারীদের তুলনায় অনেক বেশি দেখা দেয়।
আধুনিক লাইফস্টাইল ও ‘থ্রো-অ্যাওয়ে’ কালচার
গত এক দশকে মানুষের জীবনযাত্রা ও চিন্তাভাবনায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এর পেছনে আধুনিক পাশ্চাত্য সংস্কৃতির কিছু প্রভাব রয়েছে:
- বিকল্পের প্রাচুর্য ও ‘অপশন’ খোঁজার মানসিকতা: ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা বিভিন্ন ডেটিং বা ম্যাট্রিমোনিয়াল সাইটের যুগে মানুষের সামনে অজস্র ‘অপশন’ বা বিকল্প থাকে। একে বলা হয়, ‘চয়েস প্যারালাইসিস’। যখন মানুষের মনে হয়—এর চেয়েও ভালো কাউকে আমি পেতে পারতাম, তখন বর্তমান সম্পর্কের প্রতি যত্ন বা দায়বদ্ধতা কমে যায়।
- অল্পতে হাল ছেড়ে দেয়া: আগের প্রজন্মের মানুষ যেখানে সম্পর্কের ভাঙন ঠেকাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন, বর্তমানের ‘ইনস্ট্যান্ট’ যুগে মানুষের ধৈর্য কমেছে। একে বলা হচ্ছে ‘থ্রো-অ্যাওয়ে কালচার’ বা ভোগবাদী মানসিকতা। সম্পর্ক একটু কঠিন হলেই তা মেরামত করার পেছনে সময় ও শ্রম না দিয়ে, নতুন কিছু খোঁজা সহজ—এ আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা অজান্তেই অনেকের মনে বাসা বাঁধছে।
- আকাশচুম্বী প্রত্যাশা: এখন মানুষ দাম্পত্যে এমন গভীর মনস্তাত্ত্বিক সংযোগ ও নিখুঁত জীবনসঙ্গী খোঁজে, যা আমাদের দাদা-দাদি বা নানা-নানিদের যুগে কল্পনার বাইরে ছিল। সিনেমার মতো রোমান্স আর সোশ্যাল মিডিয়ার ‘পারফেক্ট কাপল’ দেখার অবাস্তব প্রত্যাশা যখন বাস্তব জীবনের সাধারণ টানাপোড়েনের সাথে মেলে না, তখনই মানুষ দ্রুত হতাশ হয়ে পড়ে।
বিবিসি অবলম্বনে