বেতন নিয়ে নীরবতা: ঠকছেন না তো?

অফিসে কার কত স্যালারি, কার পকেটে কত ঢুকছে—তা নিয়ে জানার কৌতূহল কম-বেশি সবারই থাকে। অথচ সহকর্মীর সামনে নিজের বেতনের অঙ্কটা বলা অনেকের কাছেই চরম অস্বস্তিকর। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছেন কি, যে বিষয়টি একে অন্যকে জানানো বা জানতে চাওয়াকে আমরা স্রেফ ‘অভদ্রতা’ বলে এড়িয়ে যাই, সেটাই হয়তো আপনার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি?

এ দোদুল্যমানতার এক জ্যান্ত উদাহরণ রকিব। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে একটি নামী টেক কোম্পানিতে সফলভাবে ম্যানেজারের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন তিনি। টিমের সবার প্রিয়, কাজেও ১০০ তে ১০০। একদিন দুপুরের খাবারের টেবিলে হোম লোন নেওয়ার গল্প করতে করতে আচমকাই আকাশ থেকে পড়লেন তিনি। জানতে পারলেন, তার অধীনেই কাজ করা এক নতুন জুনিয়র কর্মী—যিনি অভিজ্ঞতায় তাঁর চেয়ে অনেক নিচে—তিনি প্রতি মাসে রকিবের চেয়ে ঢের বেশি বেতন পকেটে পুরছেন!

রকিব বলেন, ‘‌মুহূর্তের মধ্যে আমার কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠেছিল। একই সঙ্গে লজ্জিত আর মারাত্মক ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম। কিন্তু পরক্ষণেই বুঝলাম, ক্ষোভ পুষে রেখে কম বেতনে দাসত্ব করা বোকামি। নিজের ভয়টা ঝেড়ে ফেলে আসল কারণটা জানা জরুরি।’

রকিব দমে যাননি। তিনি শান্ত মাথায় বসের রুমে ঢুকলেন, তবে কোনো ঝগড়া করতে নয়, নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে। ফলাফল? পদোন্নতি আর মোটা অঙ্কের বেতন বৃদ্ধি—দুই-ই মিলল।

নীরবতার আড়ালে করপোরেট চাল

করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো যুগের পর যুগ ধরে আমাদের মগজে খুব সুন্দর করে ঢুকিয়ে দিয়েছে যে বেতন নিয়ে কথা বলা শিষ্টাচার বহির্ভূত। কিন্তু একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবুন তো, কর্মীরা বেতনের ব্যাপারে অন্ধ থাকলে লাভটা আসলে কার? নিশ্চিতভাবেই কোম্পানির!

গবেষণা বলছে, এ তথাকথিত ‘ভদ্রতা’ আর নীরবতার সুযোগ নিয়েই বছরের পর বছর ধরে একই অফিসে সমপদে থাকা কর্মীদের মাঝে বেতনের আকাশ-পাতাল বৈষম্য তৈরি হয়। কেউ হয়তো প্রথম ইন্টারভিউয়ের টেবিলে একটু ভালো দরকষাকষি করতে পেরেছিলেন, ব্যস! ওই এক নম্বরের জোরেই তিনি বছরের পর বছর পার করে দিচ্ছেন, আর তাঁর চেয়ে যোগ্য হয়েও অন্যজন কেবল মুখ বুজে থাকার কারণে ঠকে যাচ্ছেন। অথচ উন্নত বিশ্বের শ্রম আইন কিন্তু কর্মীদের এই অধিকারকে স্পষ্ট সুরক্ষা দেয়।

কৌতূহল যখন অধিকার আদায়ের হাতিয়ার

সহকর্মীর বেতন জানা কোনো অপরাধ নয়, তবে এর জন্য একটু কৌশলি হওয়া প্রয়োজন। হুট করে কারো ডেস্কে গিয়ে ‘আপনার বেতন কত?’ জানতে চাওয়াটা অবশ্যই অভদ্রতা। এই বরফ গলানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হলো আগে নিজের তাসটি টেবিলে ফেলা। আপনি যখন নিজের বেতনের অঙ্কটা আড্ডার ছলে আগে শেয়ার করবেন, অপর প্রান্তের মানুষের অস্বস্তি তখন অনেকটাই কেটে যাবে। এটা কোনো পুলিশি বা গোয়েন্দা জিজ্ঞাসাবাদ নয়, বরং তথ্যের পারস্পরিক আদান-প্রদান।

এছাড়াও, বর্তমান সহকর্মীদের চেয়ে অফিসের প্রাক্তন কর্মীরা কিন্তু তথ্যের দুর্দান্ত উৎস হতে পারেন। যেহেতু তারা চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন, তাই তাদের কোনো লুকোচুরির ভয় থাকে না। নতুন প্রজন্মের ‘জেন-জি’ কর্মীরা অবশ্য এ ট্যাবু ভাঙতে শুরু করেছে। তারা কিন্তু নিজেদের বেতন নিয়ে বন্ধুদের মাঝে আগের জেনারেশনের চেয়ে অনেক বেশি খোলামেলা।

সবচেয়ে বড় ভুল যেখানে হয়

সহকর্মী আপনার চেয়ে বেশি পাচ্ছেন—এই সত্যটি জানার পরের যুদ্ধটা সবচেয়ে কঠিন। বেশিরভাগ মানুষ এ ক্ষোভে ঊর্ধ্বতন বসের কাছে গিয়ে চিৎকার শুরু করেন বা সেই সহকর্মীর সাথে সম্পর্ক নষ্ট করেন। মনে রাখবেন, তথ্যটি আপনার আলোচনার জ্বালানি, এটিকে বসের সাথে যুদ্ধ ঘোষণার হাতিয়ার বানাবেন না।

রকিব যখন বসের রুমে গিয়েছিলেন, তিনি কিন্তু বলেননি যে ‘অমুক জুনিয়র হয়েও কেন বেশি পাচ্ছে?’ বরং তিনি নিজের কাজ দিয়ে বুঝিয়েছেন কোম্পানিকে তিনি কী দিচ্ছেন এবং কেন তিনি আরো বেশি পাওয়ার যোগ্য। ম্যানেজমেন্ট কোনোভাবেই দুই কর্মীর বেতনের তুলনা শুনতে পছন্দ করে না, সেটাকে তারা ‘হিংসা’ বলে উড়িয়ে দেয়। আপনাকে কথা বলতে হবে আপনার নিজের মূল্য নিয়ে।

দিনশেষের হিসাব

সহকর্মীর স্যালারির খবর নেয়া কোনো কৌতূহল বা অনধিকার চর্চা নয়। এটি আসলে করপোরেট সংস্কৃতিরই সুনিপুণ তৈরি করা এক ফাঁদ, যাতে কর্মীরা নিজেদের প্রকৃত বাজারমূল্য জানতে না পারেন। যেখানে অন্ধকার থাকে, সেখানেই বৈষম্য ডালপালা মেলে। তাই সুস্থ কর্মপরিবেশ আর নিজের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করতে ‘ট্যাবু’ ভেঙে ভদ্রোচিত উপায়ে নিজের দাবিটা তুলে ধরাই হবে প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ।

আরও