কারণ ২০২৬ বিশ্বকাপের নতুন ফরম্যাটে এ ম্যাচের ফল নির্ধারণ করে দিতে পারে দুই দলের নকআউট যাত্রার কঠিনতা। সহজ করে বললে, এটি শুধু গ্রুপের শীর্ষস্থান দখল নয়; পরের পর্বগুলোতে স্পেন, ফ্রান্স ও পর্তুগালের মতো পরাশক্তিদের যতটা সম্ভব এড়িয়ে যাওয়ার লড়াইও।
ইংল্যান্ড বা ক্রোয়েশিয়া গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হলে রাউন্ড অব ৩২-এ মুখোমুখি হবে কোনো তৃতীয় স্থানধারী দলের। এরপর শেষ ষোলোতে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হতে পারে মেক্সিকো, জাপান, সুইডেন কিংবা একুয়েডরের মতো দল। কোয়ার্টার ফাইনালে উরুগুয়ে, নেদারল্যান্ডস বা বেলজিয়ামের মতো শক্তিশালী দল সামনে আসতে পারে। অন্যদিকে গ্রুপে দ্বিতীয় হলে পরিস্থিতি অনেক কঠিন। তখন নকআউটের প্রথম ধাপেই প্রতিপক্ষ হতে পারে পর্তুগাল বা কলম্বিয়া। সেই বাধা পেরোতে পারলেও শেষ ষোলোতে অপেক্ষা করতে পারে বর্তমান ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন। এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে দেখা হতে পারে ফ্রান্সের সঙ্গে।
এ কারণেই ইংলিশ গণমাধ্যমগুলো গ্রুপ ‘এল’-এর শীর্ষস্থানকে প্রায় সোনার টিকিট হিসেবে দেখছে। কারণ ১৯৬৬ সালের পর আর কখনো বিশ্বকাপ জেতেনি ইংল্যান্ড। প্রায় ছয় দশক ধরে ‘ফুটবল ইজ কামিং হোম’ স্লোগানটি আশার চেয়ে আক্ষেপের সঙ্গেই বেশি জড়িয়ে আছে। যদিও এবার টমাস টুখেলের দলকে অনেকেই শিরোপার অন্যতম দাবিদার মনে করছেন। স্পেন ও ফ্রান্সের মতো পরাশক্তিদের যত দেরিতে পাওয়া যায়, ট্রফি ঘরে ফেরানোর সম্ভাবনাও তত বাড়ে। তাই ডালাসের ম্যাচটি কেবল গ্রুপের শীর্ষস্থান দখলের লড়াই নয়; ইংল্যান্ডের বহু প্রতীক্ষিত ‘কামিং হোম’ স্বপ্নের পথ মসৃণ করার লড়াইও।
টমাস টুখেলের ইংল্যান্ডকে নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দলটির সামর্থ্য নয়, বরং একাদশ নির্বাচন। বিশ্বকাপের আগে নিউজিল্যান্ড ও কোস্টারিকার বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে ইংল্যান্ড যে তীব্রতা ও মানসিকতা দেখিয়েছে, তাতে সন্তুষ্ট কোচ নিজেও। অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার জর্ডান হেন্ডারসন পর্যন্ত বলেছেন, বড় কোনো টুর্নামেন্ট শুরুর আগে ইংল্যান্ডকে এত ভালো খেলতে তিনি আগে দেখেননি। তবে এত কিছুর পরও টুখেলের প্রথম একাদশ নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি।
বিশেষ করে আক্রমণভাগ ও মাঝমাঠে এখনো কয়েকটি জায়গা নিয়ে প্রতিযোগিতা চলছে। সবচেয়ে বড় আলোচনা নম্বর টেন পজিশন ঘিরে। পুরো বাছাইপর্বে মর্গান রজার্স টুখেলের অন্যতম ভরসা ছিলেন। ইংল্যান্ডের একমাত্র আক্রমণভাগের খেলোয়াড় হিসেবে তিনি আটটি বাছাই ম্যাচেই খেলেছেন। কিন্তু বিশ্বকাপের আগে শেষ কয়েক সপ্তাহে চিত্র বদলেছে। প্রস্তুতি ম্যাচ এবং অনুশীলনে জুড বেলিংহাম নাকি অনেকটাই এগিয়ে গেছেন। ফলে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে রিয়াল মাদ্রিদের তারকাকেই আক্রমণভাগের কেন্দ্রীয় সৃজনশীল ভূমিকায় দেখা যেতে পারে। তবে টুখেলকে নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা কঠিন। শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলানোর অভ্যাস তার পুরনো।
ডান প্রান্তেও রয়েছে অনিশ্চয়তা। বুকায়ো সাকা পুরোপুরি ফিট হলেও তাকে ৯০ মিনিট খেলানোর বিষয়ে এখনো সতর্ক ইংল্যান্ড। ফলে নোনি মাদুয়েকে শুরুর একাদশে দেখা যেতে পারে। অবশ্য সাকার মতো বড় ম্যাচের খেলোয়াড়কে বেঞ্চে রাখার ঝুঁকি নিতে নাও পারেন টুখেল। সবকিছু নির্ভর করছে তার শারীরিক অবস্থার ওপর।
বাম প্রান্তে মার্কাস রাশফোর্ড ও অ্যান্থনি গর্ডনের লড়াইও কম আকর্ষণীয় নয়। গর্ডন সাম্প্রতিক সময়ে বেশ ভালো খেললেও ইংল্যান্ড শিবিরের ভেতরের খবর বলছে, বহু বছরের মধ্যে সবচেয়ে ফিট, সবচেয়ে আত্মবিশ্বাসী এবং অনুশীলনে সবচেয়ে ধারালো রাশফোর্ডকেই দেখা যাচ্ছে। টুখেল দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই রাশফোর্ড তার বিশেষ আস্থার একজন। ফলে বড় ম্যাচে অভিজ্ঞতার কারণেই হয়তো ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ফরওয়ার্ড এগিয়ে থাকবেন।
সবচেয়ে বড় ধাঁধা অবশ্য রক্ষণভাগে। এতদিন মনে করা হচ্ছিল মার্ক গেহিই নিশ্চিতভাবে প্রথম পছন্দ। কিন্তু কোস্টারিকার বিপক্ষে জন স্টোনস ও এজরি কনসাকে একসঙ্গে খেলিয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছেন টুখেল। বর্তমানে স্টোনসের খেলা প্রায় নিশ্চিত বলেই ধরা হচ্ছে। তার সঙ্গী হিসেবে গেহি নাকি কনসা সেটি হয়তো ম্যাচের দিনই জানা যাবে।
তবে কিছু জায়গা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। গোলবারের নিচে জর্ডান পিকফোর্ড, ডান প্রান্তে রিস জেমস এবং বাম প্রান্তে তরুণ নিকো ও’রাইলির খেলার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। মাঝমাঠে ডেকলান রাইস ও এলিয়ট অ্যান্ডারসন জুটি গড়ে ইংল্যান্ডের ইঞ্জিন রুম সামলাবেন। তাদের সামনে বেলিংহাম এবং আক্রমণের অগ্রভাগে অধিনায়ক হ্যারি কেইন থাকছেন প্রায় নিশ্চিতভাবেই। অর্থাৎ ইংল্যান্ডের মূল কাঠামো ঠিক হয়ে গেলেও চার-পাঁচটি পজিশনে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হচ্ছে টুখেলকে। আর সেই অনিশ্চয়তাই হয়তো ক্রোয়েশিয়ার জন্য বাড়তি সতর্কতার কারণ।
অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়াকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। রাশিয়া বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের স্বপ্ন ভেঙে দেয়া দলটির চেহারা বদলেছে, কিন্তু পরিচয় বদলায়নি। এখনো তারা সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষগুলোর একটি।
কোচ জ্লাতকো দালিচ সম্ভবত ৪-২-৩-১ ছকেই দল সাজাবেন। গোলবারের নিচে থাকবেন দোমিনিক লিভাকোভিচ। রক্ষণভাগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম যোশকো ভার্দিওল। তার পাশে থাকবেন তরুণ লুকা ভুশকোভিচ ও মারিন পংরাচিচ। মাঝমাঠে অভিজ্ঞতার ভার বহন করবেন লুকা মদরিচ ও মাতেও কোভাচিচ। আক্রমণভাগে আন্দ্রেই ক্রামারিচ, ইভান পেরিসিচ ও মারকো পাসালিচকে নিয়ে গড়ে উঠবে সৃজনশীল অংশ, আর সামনে একমাত্র স্ট্রাইকার হিসেবে থাকবেন আন্তে বুদিমির। তবে দলটির পুরো পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন মদরিচ। বয়স এখন ৪০ ছুঁইছুঁই হলেও খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণের দিক পরিবর্তন এবং সঠিক সময়ে ফাঁক খুঁজে বের করার ক্ষমতা এখনো তার সবচেয়ে বড় শক্তি।