১৯৬৬ সালের ২০ মার্চ। লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টারের মেথডিস্ট সেন্ট্রাল হলে ডাকটিকিট প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে প্রদর্শন হচ্ছিল বিশ্বকাপের মূল ট্রফি জুলে রিমে ট্রফি। আয়োজনটি ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত।
আজকের পরিচিত ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি তখনো আসেনি। ওই সময় বিশ্বকাপ বিজয়ীদের হাতে উঠত জুলে রিমে ট্রফি। গ্রিক বিজয়ের দেবী নাইকির আদলে নির্মিত সোনালি ট্রফিটি ছিল প্রতিটি ফুটবলারের স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। প্রদর্শনীটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তাও ছিল। স্থানটি ছিল ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ভবনের কাছেই।
তখনই ঘটল বিস্ময়কর ঘটনা। চুরি হয়ে গেল ট্রফিটি। আরো অবাক করার বিষয় হলো, প্রদর্শনীতে থাকা মূল্যবান ও বিরল ডাকটিকিটগুলোর দিকে চোর একবারও তাকায়নি। সেগুলোর অনেকগুলোর আর্থিক মূল্য ট্রফির চেয়েও বেশি ছিল। কিন্তু চোরের লক্ষ্য ছিল একটাই—বিশ্বকাপ ট্রফি। খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয় তীব্র উত্তেজনা।
ব্রিটিশ পুলিশ তদন্ত শুরু করল। সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় উঠে এল ঘটনাটি। ঘটনা আরো রহস্যময় হয়ে ওঠে কয়েক দিন পর। ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান জো মিয়ার্সের কাছে পৌঁছায় মুক্তিপণের চিঠি। চিঠির প্রেরক নিজের পরিচয় দেয় ‘জ্যাকসন’ নামে। তিনি দাবি করেন, ট্রফিটি ফেরত চাইলে দিতে হবে ১৫ হাজার পাউন্ড। অন্যথায় ট্রফিটি ধ্বংস করে ফেলা হবে।
পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে একটি ফাঁদ পাতে। নির্ধারিত স্থানে অর্থ নিতে এলে এডওয়ার্ড বেচলি নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু তদন্তকারীরা দ্রুত বুঝতে পারেন, রহস্যের সমাধান এখনো অনেক দূরে। কারণ বেচলির কাছে ট্রফি ছিল না। সে নিজেকে মধ্যস্থতাকারী দাবি করে। প্রকৃত চোর কে— এ নিয়ে কোনো তথ্য দেয়নি সে। আজও ১৯৬৬ সালের সেই চুরির প্রকৃত নেপথ্য কাহিনি পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। ইতিহাসবিদদের বিতর্কও থেমে নেই।
এদিকে বিশ্বকাপ শুরুর দিন যত এগিয়ে আসছিল, তত বাড়ছিল উদ্বেগ। এত বড় একটি আন্তর্জাতিক আসরের আগে ট্রফি হারিয়ে যাওয়া ছিল ইংল্যান্ডের জন্য ভয়াবহ বিব্রতকর ঘটনা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন গোপনে একটি প্রতিলিপি ট্রফি তৈরি করার উদ্যোগ নেয়। যদি আসল ট্রফিটি আর কখনো খুঁজে পাওয়া না যায়, তাহলে অন্তত বিশ্বকাপের অনুষ্ঠানগুলো কোনোভাবে সম্পন্ন করা যাবে।
তারপর এল ১৯৬৬ সালের ২৭ মার্চ। লন্ডনের দক্ষিণাঞ্চলে নিজের বাড়ির কাছাকাছি এলাকায় সন্ধ্যার হাঁটাহাঁটি করছিলেন ডেভিড করবেট। সঙ্গে ছিল তার চার বছরের কালো-সাদা রঙের মিশ্র জাতের কুকুর-পিকলস। কিন্তু হঠাৎ করেই পিকলস একটি পার্ক করা গাড়ির পাশে থাকা ঝোপের দিকে অস্বাভাবিক আগ্রহ দেখাতে শুরু করল। সে ঘ্রাণ নিতে লাগল, টানাটানি করতে লাগল, যেন সেখানে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু লুকিয়ে আছে। করবেট নিচে তাকিয়ে দেখলেন, ঝোপের নিচে পড়ে আছে একটি প্যাকেট। প্যাকেটটি সংবাদপত্রে মোড়ানো এবং দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা। প্রথমে তিনি কিছুটা দ্বিধায় পড়ে গেলেন। সে সময় ব্রিটেনে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ ছিল, ফলে তার মনে হয়েছিল এটি হয়তো কোনো বিপজ্জনক বস্তু হতে পারে। তবু শেষ পর্যন্ত তিনি প্যাকেটটি খুললেন। আর খুলেই স্তব্ধ হয়ে গেলেন।ভেতরে ছিল একটি সোনালি ট্রফি। ট্রফিটির নিচের অংশে খোদাই করা ছিল আগের বিশ্বকাপজয়ী দেশগুলোর নাম— উরুগুয়ে, ইতালি, ব্রাজিল, পশ্চিম জার্মানি। মুহূর্তের মধ্যেই বুঝতে পারলেন, তার কুকুরটি বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত নিখোঁজ বস্তুটি খুঁজে পেয়েছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, ট্রফি পাওয়ার পর ডেভিড করবেটকে সঙ্গে সঙ্গে নায়ক হিসেবে স্বাগত জানানো হয়নি। করবেটকে দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তদন্তকারীরা নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন, তিনি কোনোভাবে চুরির সঙ্গে জড়িত কিনা। অবশেষে তাকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ঘোষণা করা হয়। এরপরই শুরু হয় পিকলসের অবিশ্বাস্য জনপ্রিয়তার গল্প।
মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই পিকলস জাতীয় নায়কে পরিণত হয়। সংবাদপত্রগুলো তার ছবি ছাপতে শুরু করে। টেলিভিশন অনুষ্ঠানগুলো তাকে নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রচার করে। দেশজুড়ে মানুষ তার গল্প জানতে চায়। পিকলসকে ন্যাশনাল ক্যানাইন ডিফেন্স লিগ থেকে একটি রৌপ্য পদক দেয়া হয়। এক বছরের জন্য বিনামূল্যে খাবার দেয়া হয় তাকে। এমনকি পরে সে ‘দ্য স্পাই উইথ আ কোল্ড নোজ’ নামের একটি চলচ্চিত্রেও উপস্থিত হয়। অন্যদিকে, ডেভিড করবেট বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত পুরস্কারের অর্থ হিসেবে প্রায় ৫-৬ হাজার পাউন্ড পান— যে অর্থ দিয়ে সে সময় একটি বাড়ি কেনা সম্ভব ছিল।
এর কয়েক মাস পর শুরু হলো বিশ্বকাপ। ১৯৬৬ সালের ৩০ জুলাই, লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে ইংল্যান্ড পশ্চিম জার্মানিকে ৪-২ গোলে পরাজিত করে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র শিরোপা জয় করে। সেদিন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক ববি মুর যখন জুলে রিমে ট্রফিটি মাথার ওপর তুলে ধরেন, তখন সেই দৃশ্য ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আইকনিক মুহূর্তে পরিণত হয়। যদি পিকলস সেটি খুঁজে না পেত, তাহলে হয়তো ববি মুর কখনো আসল ট্রফিটি হাতে তুলতেই পারতেন না।
এই গল্পের শেষেও রয়েছে এক অদ্ভুত মোড়। পিকলসের কারণে ১৯৬৬ সালে জুলে রিমে ট্রফি রক্ষা পেয়েছিল। কিন্তু ট্রফিটির ভাগ্যে আরো একটি চুরি অপেক্ষা করছিল। ১৯৭০ সালে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে ব্রাজিল ট্রফিটির স্থায়ী মালিকানা লাভ করে। তারপর ১৯৮৩ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরো থেকে ট্রফিটি চুরি হয়ে যায়। কিন্তু এবার সেখানে কোনো পিকলস ছিল না। ট্রফিটি আর কখনো উদ্ধার করা যায়নি। ধারণা করা হয়, চোরেরা সেটি গলিয়ে ফেলেছিল। যদিও এখনো কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, হয়তো পৃথিবীর কোথাও কোনো ব্যক্তিগত সংগ্রহে সেটি লুকিয়ে আছে।
পিকলস নিজেও খুব দীর্ঘ জীবন পায়নি। ১৯৬৭ সালে, মাত্র এক বছর পর, একটি বিড়ালকে তাড়া করতে গিয়ে দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার মৃত্যু হয়।