সিনেমায় ফুটবল ও ফুটবলের সিনেমা

পশ্চিমবঙ্গের সিনেমা ‘ধন্যি মেয়ে’। অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত সিনেমাটি মুক্তি পায় ১৯৭১ সালে।

এ সিনেমারই গান ‘সবার সেরা খেলা বাঙালির তুমি ফুটবল’। মান্না দের গাওয়া গানটি আজও জনপ্রিয়। পশ্চিমবঙ্গে একটা সময় মোহনবাগান-ইস্ট বেঙ্গল দুই দলের খেলা নিয়ে দারুণ উত্তেজনা হতো। যেমন আমাদের দেশে আবাহনী-মোহামেডান। একটা প্রবাদের মতো আছে, এমন কোনো বাঙালি নেই যে কবিতা লেখেনি আর ফুটবল খেলেনি। একুশ শতকের তৃতীয় দশকে এসে হয়তো এ কথার সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে মেলানো যাবে না। তবে এর আগে পূর্ব-পশ্চিম দুই বঙ্গেই ফুটবল জনপ্রিয় ছিল। ফুটবল বিশ্বকাপ এলে উত্তেজনা আরো বেড়ে যায়। ফুটবল বিশ্বকাপের শুরুর দিন তাই পাঠকের জন্য ফুটবলবিষয়ক কয়েকটি সিনেমার আলাপ।

ফুটবল নিয়ে সেরা সিনেমা কোনগুলো? এমন প্রশ্ন তুললে থমকাতে হবে। কেননা বিভিন্ন প্লাটফর্ম, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানের আলাদা র‍্যাংকিং থাকতে পারে। আইএমডিবি তাদের সেরা ১০ ফুটবলবিষয়ক সিনেমায় রেখেছে ‘দ্য ড্যামড ইউনাইটেড’, ‘গোল! দ্য ড্রিম বিগিনস’, ‘ভিক্টোরি’, ‘গ্রিন স্ট্রিট হুলিগানস’, ‘শাওলিন সকার’, ‘বেন্ড ইট লাইক বেকহ্যাম’, ‘কিকিং অ্যান্ড স্ক্রিমিং’, ‘ফিভার পিচ’, ‘ইউনাইটেড’ ও ‘গোল টু: লিভিং দ্য ড্রিম’কে। ফুটবল নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ খুব বেশি না। সে কারণে দেশটিকে ফুটবল (সকার) নিয়ে তৈরি হওয়া সিনেমার সংখ্যা ও মান নিয়ে বিতর্ক আছে।

আইএমডিবির তালিকার সেরা সিনেমাটি দ্য ড্যামড ইউনাইটেড। টম হুপার পরিচালিত সিনেমাটি ২০০৯ সালে মুক্তি পায়। এটি নির্মাণ হয়েছে ব্রায়ান ক্লকে নিয়ে। তিনি ৪৪ দিনের জন্য ইংলিশ ক্লাব লিস ইউনাইটেডের কোচের দায়িত্বে ছিলেন। সেখানে তার কোচ হওয়া, কোচিং ও অন্যান্য জটিলতা নিয়ে সিনেমার গল্প। আইএমডিবির রেটিং ৭ দশমিক ৫।

ফুটবল নিয়ে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে জনপ্রিয় সিনেমা সম্ভবত শাওলিন সকার। ২০০১ সালে মুক্তি পায় সিনেমাটি। স্পোর্টস কমেডি জনরার শাওলিন সকার পরিচালনার পাশাপাশি সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন স্টিফেন চৌ। এ সিনেমায় একজন সাবেক ফুটবল খেলোয়াড়ের গল্প এসেছে। ২০ বছর আগের ঘটনার সঙ্গে সিনেমার টাইমলাইন মিলিয়ে এর গল্প। সেখানে একদিকে আছে ফুটবল, একদিকে কুংফু-কারাটে, অন্যদিকে কমেডি। ইমোশনেরও অভাব নেই। সব মিলিয়ে এক বসায় সিনেমাটি উপভোগ করবে যেকোনো বয়সের দর্শক।

গোল শিরোনামে তিনটি সিনেমা নির্মাণ হয়েছে। তিন সিনেমার পরিচালক ভিন্ন। তবে তিনটিতেই অভিনয় করেছেন কুইনো বেকার। প্রথম সিনেমাটি (দ্য ড্রিম বিগিনস) মুক্তি পায় ২০০৫ সালে। ফুটবল দলের অন্দর-বাহির ও একজন খেলোয়ারের চড়াই-উতরাই এ সিনেমায় এসেছে। তবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্ব দর্শক একদমই পছন্দ করেনি।

১৯৮১ সালে মুক্তি পেয়েছিল জন হাসটন পরিচালিত ‘ভিক্টোরি’। এ সিনেমা নানা কারণেই উল্লেখ করার মতো। এতে অভিনয় করেছিলেন মাইকেল কেইন, সিলভেস্টার স্ট্যালোন, ফুটবল কিংবদন্তি পেলে, ববি মুর, অসভালদো আরদাইলস প্রমুখ। বিভিন্ন দেশের খেলোয়াড়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন তারা। সিনেমার গল্পটি চমৎকার। নাৎসি অধিকৃত প্যারিসে ফুটবল খেলা আয়োজন নিয়ে ‘ভিক্টোরি’ এগিয়ে চলে। এতে একদিকে আছে ফুটবল, অন্যদিকে রাজনীতি ও যুদ্ধের কথা।

এ শতকের শুরুতে একটা সিনেমা বেশ আলোচনা তুলেছিল। ‘বেন্ড ইট লাইক বেকহ্যাম’। ২০০২ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি নির্মাণ করেন গুরিন্দর চাড্ডা। অভিনয় করেছেন পরমিন্দর নাগরা, কিউরা নাইটলি, অনুপম খের প্রমুখ। ডায়াসপোরার গল্প এটি। জেস ভামরা (পরমিন্দর) পেশাদার ফুটবল খেলতে চায়। তার পছন্দের খেলোয়াড়, আইডল ও ক্রাশ ডেভিড বেকহ্যাম। তার ঘরে বেকহ্যামের ছবি ও জার্সি ভরা। কিন্তু তার শিখ বাবা-মা তাকে খেলতে দিতে চায় না। এমন সময় জুল (কিইরা) তাকে স্থানীয় ক্লাবে খেলার আমন্ত্রণ জানায়। এরপর জেসের ফুটবল খেলা, পরিবারের সঙ্গে লুকোচুরি ইত্যাদি নিয়েই সিনেমার গল্প এগোয়।

বেন্ড ইট লাইক বেকহ্যামকে ভারতীয় সিনেমা বলা যায় না। তবে ফুটবল নিয়ে বলিউডে বেশকিছু সিনেমা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এগিয়ে থাকবে ‘ধান ধানা ধান গোল’। ২০০৭ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি পরিচালনা করেন বিবেক অগ্নিহোত্রী। অভিনয়ে ছিলেন জন আব্রাহাম, আরশাদ ওয়ার্সি, বোমান ইরানি ও বিপাশা বসু। সিনেমায় একটি ফুটবল ক্লাব ও তার প্র্যাকটিস মাঠের প্রসঙ্গ আসে। জায়গাটি একটা সময় বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহার হতে থাকে। কিছু ফুটবল খেলোয়াড় সেখানে প্র্যাকটিস করে, কিন্তু তারা জানতে পারে এটি লিজ দেয়া হয়েছে। তারা ক্লাব ও ক্লাবের জায়গা বাঁচানোর পাশাপাশি ফুটবলকেও এগিয়ে নেয়।

এ সিনেমায় ভারতের স্থানীয় ফুটবলের দুরবস্থার বাস্তব ছবি উঠে এসেছে। ২০০৯ সালের ‘সিকান্দার’ সিনেমাটিতে এসেছে এক কিশোরের ফুটবলার হয়ে উঠতে চাওয়ার পথে নানা লড়াইয়ের গল্প। ২০২২ সালে মুক্তি পায় ‘ঝুন্ড’। নাগরাজ মঞ্জুলে পরিচালিত সিনেমাটিতে অমিতাভ বচ্চন কিছু বখে যাওয়া ছেলেদের ফুটবল কোচ হয়ে ওঠেন। অমিত রবীন্দ্রনাথ শর্মার ২০২৪ সালের সিনেমা ‘ময়দান’। ১৯৫২ সালে ভারতীয় ফুটবল দলের কোচ ছিলেন সৈয়দ আবদুল রহিম। তার গল্প নিয়েই এ সিনেমা। তবে সিনেমাটি বক্স অফিসে ভালো করতে পারেনি। এছাড়া দক্ষিণ ভারতের বেশকিছু সিনেমায় ফুটবল প্রসঙ্গ আছে। এর মধ্যে অ্যাটলি পরিচালিত ‘বিগিল’ (২০১৯) অন্যতম।

এছাড়া পশ্চিমবঙ্গের সিনেমার ক্ষেত্রে ‘ধন্যি মেয়ে’র কথা তো বলা হলো। এছাড়া একজন গরিব ফুটবলারের গল্প নিয়ে বিজয় বসুর ‘সাহেব’ (১৯৮১), ইস্ট ইয়র্কশায়ারের সঙ্গে মোহনবাগানের ১৯১১ সালের ম্যাচ নিয়ে অরুণ রায়ের ‘এগারো’ (২০১১), পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত ‘লড়াই: প্লে টু লিভ’ (২০১৫), রিংগো পরিচালিত ‘মেসি’ (২০১৭) ও ধ্রুব ব্যানার্জি পরিচালিত ‘গোলন্দাজ’ (২০২১) ফুটবলবিষয়ক সিনেমা।

বাংলাদেশের সিনেমা ও নাটকেও ফুটবল প্রসঙ্গ আছে। এর মধ্যে বড় পরিসরে বা ফুটবলকে কেন্দ্র করে নির্মিত দুটি সিনেমার নাম না করলেই নয়। ২০১০ সালে মুক্তি পায় খিজির হায়াত খানের ‘জাগো’। ফুটবল নিয়ে এটি বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সিনেমা। বলা হয়, স্বাধীনতার সময়কার স্বাধীন বাংলা ফুটবল টিমের গল্পের আদলে সিনেমাটি নির্মাণ হয়েছে। সিনেমায় একটি দলের গড়ে ওঠা ও নানা টানাপড়েন দেখা যায়। অভিনয় করেছেন ফেরদৌস আহমেদ, বিন্দু, আরিফিন শুভ, তারিক আনাম খান, রওনক হাসান প্রমুখ।

২০২২ সালে রায়হান রাফীর পরিচালনায় মুক্তি পায় ‘দামাল’। এটি একটি পিরিয়ড ড্রামা। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গল্প নিয়ে এগিয়েছে সিনেমাটি। অভিনয় করেছেন শরিফুল রাজ, বিদ্যা সিনহা মিম, সিয়াম আহমেদ, শাহনাজ সুমি, নাসির উদ্দিন খান প্রমুখ।

আরও