যেভাবে গানে মেঘের আবহ তৈরি করেছিলেন এআর রহমান

মুক্তির ২৫ বছর পেরিয়েও ‘লগান’ চলচ্চিত্রটি ভারতীয় সংস্কৃতির এক অনন্য মাইলফলক।

তবে এ সিনেমার সার্থকতা শুধু এর গল্পে নয়, বরং এর অবিস্মরণীয় সাউন্ডট্যাকেও। এর নেপথ্যের কারিগর ছিলেন সুরের জাদুকর এআর রহমান। সম্প্রতি সিনেমার মূল সৃজনশীল দল আমির খান, আশুতোষ গোয়ারিকর ও জাভেদ আখতার একত্র হয়ে এর সংগীত নির্মাণের স্মৃতিচারণ করেন, যেখানে রহমানের সুর সৃষ্টির এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অনন্য রূপ উন্মোচিত হয়েছে।

চলচ্চিত্রের গৎবাঁধা ব্যাকরণকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সুর করাই ছিল রহমানের অনন্যতা। গীতিকার জাভেদ আখতারের মতে, সে যুগে অধিকাংশ সংগীত পরিচালকের স্থায়ী ও অন্তরার একটি নির্দিষ্ট ছক থাকত। কিন্তু রহমান ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী। তার গানের প্রতিটি লাইনের মাত্রা আলাদা হতো, ফলে পরের লাইনটি কত বড় বা ছোট হবে তা আগে থেকে অনুমান করা অসম্ভব ছিল। এ নিয়ম ভাঙার খেলাই তার সুরকে অনন্য করে তুলেছিল।

শুধু সুরের ধরনেই নয়, রহমানের কাজের পদ্ধতিও ছিল ভীষণ বৈচিত্র্যময়। আমির খান স্মৃতিচারণ করে জানান, প্রথাগত সংগীত পরিচালকদের মতো রহমান সরাসরি কোনো সুর গেয়ে শোনাতেন না। তিনি স্টুডিওর যান্ত্রিক আবহ দূর করতে একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে কিবোর্ড ও রেকর্ডার চালু করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সুরের সাগরে ডুবে যেতেন। সেই ২-৩ ঘণ্টার রেকর্ডিং থেকে পরিচালক আশুতোষ গোয়ারিকর নিজের পছন্দের টুকরাগুলো বেছে নিতেন এবং এভাবেই ধাপে ধাপে তৈরি হতো একেকটি কালজয়ী গান।

রহমানের এ অনন্য প্রতিভার সবচেয়ে বড় স্বাক্ষর ‘লগান’ সিনেমার ‘ঘনন ঘনন’ গানটি। পরিচালক আশুতোষ গোয়ারিকর যখন কোনো কৃত্রিম সাউন্ড এফেক্ট বা বজ্রধ্বনি ছাড়াই গানে মেঘ আসার অনুভূতি তৈরি করতে চাইলেন, তখন ভোর ৪টায় রহমান এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড করেন। তিনি গায়ক শঙ্করের গাওয়া ‘ঘনন’ শব্দটিকে বহুবার লুপ করে সেটির ভলিউম কম-বেশি করে মেঘ ডাকার এক জাদুকরী আবহ তৈরি করলেন।

এ বিপুল প্রশংসার জবাবে রহমান বরাবরের মতোই বিনয়ী। তার মতে, দক্ষিণ ভারত থেকে এসে উত্তর ভারতের এ গল্পের সুর অনুভব করা এবং জাভেদ আখতার ও আমিরের মতো প্রতিভাদের অনুপ্রেরণাকে স্রেফ নিজের ভেতর ধারণ করাই ছিল তার কাজ। এ বিনয় ও সৃজনশীলতাই এআর রহমানকে সাধারণ কোনো সংগীত পরিচালক নয়, বরং সুরের এক চিরন্তন জাদুকর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।

আরও