সাক্ষাৎকার

‘পুরস্কার দিয়ে সফলতা পরিমাপ করা যায় না’

বাংলা গানের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে তার কণ্ঠ দিয়ে এ দেশের কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেছেন।

সম্প্রতি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি এ গুণী শিল্পীকে ভূষিত করেছে বিশেষ ‘কালজয়ী কণ্ঠ’ সম্মাননায়। তার এ সম্মাননা প্রাপ্তি ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে তিনি কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অহিদুর রহমান

শিল্পকলা একাডেমি আপনাকে ‘কালজয়ী কণ্ঠ’ হিসেবে সম্মানিত করল। এ নিয়ে আপনার অনুভূতি কেমন?

দেখুন, আমার বয়স তো কম হলো না। সংগীত জীবনেই পার করে দিয়েছি ৬০ বছরেরও বেশি সময়। দীর্ঘ এ ক্যারিয়ারে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছি। কাজেই পুরস্কার পাওয়াটা আমার জন্য নতুন কিছু না। তাছাড়া এটাকে ঠিক সাধারণ পুরস্কার বলা যাবে না, শিল্পকলা একাডেমি একে ‘বিশেষ সম্মাননা’ হিসেবে অভিহিত করেছে। আমার আগে সাবিনা ইয়াসমিনকে একই রকম সম্মাননা দেয়া হয়েছিল, এবার আমাকে দিল। ভবিষ্যতে হয়তো ধীরে ধীরে অন্যদেরও দেবে। তাই প্রক্রিয়া হিসেবে নতুন না হলেও একজন জ্যেষ্ঠ শিল্পীর জন্য এটি অবশ্যই অত্যন্ত সম্মানের। এটি সারা জীবনের কাজের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। আমি মনে করি, জীবনের এ পর্যায়ে এসে রাষ্ট্রীয়ভাবে এমন সম্মাননা বা ভালোবাসা জানানোটা যেকোনো শিল্পীর জন্যই পরম আনন্দের ও গৌরবের।

আপনি বেশকিছু দিন ধরে গানের জগৎ থেকে দূরে আছেন। গানের সঙ্গে এ দূরত্বের কারণ কী?

এ দূরত্বের পেছনে প্রথমত, কিছু শারীরিক কারণ আছে। দ্বিতীয়ত, মনের ভেতর গান গাওয়ার যে আজন্ম বাসনা বা তাড়না ছিল, তা নানা কারণে বিভিন্ন সময়ে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। এসব কিছু মিলিয়েই আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি যে আর নতুন করে গান গাইব না। বিশেষ করে, করোনা হওয়ার পর থেকে আমার শরীরটা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। এটিও গান থেকে দূরে থাকার অন্যতম বড় কারণ।

শিল্পকলা একাডেমির অনুষ্ঠানে আপনার কালজয়ী গানগুলো নতুনদের কণ্ঠে শুনতে কেমন লেগেছে?

আমার খুবই ভালো লেগেছে। ওরা প্রত্যেকেই গানগুলোকে সাধ্যমতো সুন্দর করে গাওয়ার চেষ্টা করেছে এবং মোটের ওপর বেশ ভালোই গেয়েছে। এ গানগুলোকে আসলে বাংলা গানের ‘ক্ল্যাসিক’ বলা যেতে পারে। এগুলো এখনকার নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা নিজেদের কণ্ঠে ধারণ করছে, এটি অত্যন্ত ইতিবাচক একটি দিক। কারণ গানের ধারা তো এখন পুরোপুরি পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমাদের সময়ের সেই মূল ধারাটি এখন ধীরে ধীরে ক্ষীয়মাণ। তার মধ্যেও ওরা যে এ ক্ল্যাসিক গানগুলোকে এখনো চর্চায় রেখেছে, গেয়ে চলেছে, এটাই তো বড় আনন্দের বিষয়। বর্তমান সময়ে দেখা যায়, একেবারে সাময়িক কিছু সৃষ্টি হচ্ছে—আজকে গানটি তৈরি হলো আর বেশ ধুমধাম হলো, পরদিনই হয়তো তার আর কোনো খোঁজ থাকে না। এটা আসলে যুগেরই প্রভাব, যেখানে সবকিছুই খুব ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু আমাদের সময়ের গানগুলো তো এমন ক্ষণস্থায়ী নয়। সম্মাননার ভেতরেই তো লেখা আছে ‘কালজয়ী কণ্ঠ’, যার অর্থই হলো কালজয়ী গান। এখন তো আর সে অর্থে কালজয়ী গান তৈরি হচ্ছে না।

আজকাল অনেক পুরনো কালজয়ী গান ‘রিমেক’ করা হচ্ছে। এটি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

গান রিমেক বা নতুন সংগীতায়োজনে তৈরি হতেই পারে, এতে কোনো বাধা নেই। তবে আমার মতে, কোনো গান রিমেক করার সময় অন্তত অত্যন্ত সৌজন্যতার সঙ্গে মূল শিল্পী, গীতিকার ও সুরকারের নামটি উচ্চারণ করা এবং তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা প্রয়োজন।

বিটিভির সেই সোনালি দিনগুলোর প্লেব্যাক কিংবা ‘ছায়াছন্দ’ অনুষ্ঠানের কথা কি এখন মনে পড়ে?

হ্যাঁ, মনে পড়ে। তবে অনেক আগের কথা তো, স্মৃতিগুলো এখন কিছুটা ঝাপসা হয়ে এসেছে। তবে সেই সুন্দর দিনগুলোর কথা অবশ্যই মনের মণিকোঠায় রয়ে গেছে।

তৎকালীন সময়ে নায়ক রাজ্জাক কিংবা আলমগীরের সিনেমায় আপনার গান থাকত এবং পর্দায় তাদের লিপসিংয়ের সঙ্গে আপনার কণ্ঠ চমৎকারভাবে মিলে যেত। এ নিখুঁত সমন্বয়টা কীভাবে সম্ভব হতো?

তখনকার সময়ে কাজের পরিবেশটা অন্য রকম ছিল। আমরা সবাই মিলেমিশে একসঙ্গে কাজ করতাম। যেমন আলমগীরের সিনেমার কোনো গানের রেকর্ডিং যখন স্টুডিওতে হতো, তখন প্রায়ই সে নিজেও রেকর্ডিংয়ের সময় স্টুডিওতে উপস্থিত থাকত। এটা আসলে গাইতে গাইতে এবং একসঙ্গে কাজ করতে করতে একধরনের বোঝাপড়া তৈরি হয়ে যায়। তাছাড়া যাদের জন্য গান গাওয়া হচ্ছে, পর্দায় তাদের ম্যানারিজম আচরণ ও স্টাইল, তাদের অভিনয়শৈলী—সবকিছুই আমাদের জানা থাকত। গান গাওয়ার সময় সে বিষয়ের ওপর সংগতি রেখে গায়কির একটা নিখুঁত সমন্বয় করার চেষ্টা করতাম বলেই কণ্ঠটি পর্দায় চরিত্রটির কণ্ঠে অত সুন্দরভাবে মিলে যেত।

আপনার গানের শ্রোতা যারা এখনো আছেন, তাদের উদ্দেশে আপনি কী বলবেন?

আমি সারা জীবন গান গেয়েছি এবং আমার শ্রোতারা আমার গানকে মনে-প্রাণে ভালোবেসেছে। সেই শুরুর সময় থেকে আজ পর্যন্ত তারা আমাকে যে অকৃত্রিম ভালোবাসা দিয়েছে, এটাই তো একজন শিল্পীর জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া এবং সবচেয়ে বড় সার্থকতা। আমি সবসময় বলি, কোনো পুরস্কার কিন্তু একজন মানুষকে প্রকৃত শিল্পী করে তুলতে পারে না। সাধারণ মানুষ যদি কোনো শিল্পীর সৃষ্টিকে ভালো না বাসে, তবে হাজারো পুরস্কার দিয়েও তাকে জোর করে শিল্পী হিসেবে টিকিয়ে রাখা যাবে না। মানুষ মন থেকে গানকে ভালোবাসলেই কেবল শিল্পী সার্থক হন। তাই পুরস্কার দিয়ে সফলতা পরিমাপ করা যায় না। তবে হ্যাঁ, পুরস্কার ও সম্মাননা মানুষকে মানসিকভাবে উৎসাহিত করে এবং আনন্দিত করে।

আজকের প্রজন্মের যারা নতুন শিল্পী আছেন, তাদের উদ্দেশে আপনার কোনো পরামর্শ বা উপদেশ আছে কি?

সত্যি বলতে, তাদের উপদেশ দেয়ার মতো ক্ষমতা আমার নেই। কারণ আমি যে যুগের মানুষ, সে যুগের আদর্শ অনুযায়ী যদি আজ কোনো কথা বলি, তবে তা এ আধুনিক যুগে টিকবে না। তাছাড়া এখনকার তরুণদের কোনো উপদেশ দিলে হয়তো তাদের মনঃপূতও হবে না।

কাজেই বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে তারাই তাদের সবচেয়ে বড় উপদেশদাতা। আমাদের পক্ষে তাদের ওপর কোনো নিয়ম বা আদর্শ চাপিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। আমাদের যুগের মতো আদর্শ নিয়ে চললে তারা হয়তো বর্তমান ইন্ডাস্ট্রিতে টিকতেই পারবে না। তাই যুগ যেভাবে বদলাচ্ছে, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়েই তাদের চলতে হবে এবং এটাই স্বাভাবিক। এতে তাদের কোনো অপরাধ বা দোষ নেই—যেমন যুগ, তেমনই তার চলন।

আরও