নতুন সিম কার্ডের ওপর আরোপিত ৩০০ টাকার কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব ঘিরে রাজস্ব খাতে বড় ধরনের প্রভাবের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এ কর বাতিলের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে সরকার বছরে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার রাজস্ব হারাতে পারে বলে জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মোবাইল সেবা আরও সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতকে আরো সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সরকার কর, ভ্যাট ও লাইসেন্সিং কাঠামোয় ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন সিমের ওপর আরোপিত ৩০০ টাকার কর প্রত্যাহার সেই উদ্যোগেরই অংশ।
বিজ্ঞাপন
বর্তমানে দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, স্বাস্থ্যসেবা এবং সরকারি বিভিন্ন সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশে রূপান্তরের বিভিন্ন উদ্যোগের ক্ষেত্রেও মোবাইল সংযোগকে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কিন্তু নতুন সিম নিবন্ধনের সময় অতিরিক্ত কর আরোপের কারণে অনেক গ্রাহকের জন্য সংযোগ গ্রহণের ব্যয় বেড়ে যায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন সিম কেনার ক্ষেত্রে কর আরোপ করায় একজন গ্রাহককে শুধু সেবার মূল্যই নয়, অতিরিক্ত করও পরিশোধ করতে হয়। ফলে নতুন সংযোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেকেই নিরুৎসাহিত হন। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ, শিক্ষার্থী এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য এটি একটি বাড়তি আর্থিক চাপ হিসেবে কাজ করে।
মোবাইল খাত সংশ্লিষ্টরা দীর্ঘদিন ধরে নতুন সিম সংযোগের ওপর আরোপিত কর কমানো বা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছেন। তারা বলেন, বিশ্বের অনেক দেশেই মোবাইল সংযোগকে মৌলিক ডিজিটাল অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে সেখানে নতুন সংযোগের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করা হয় না অথবা সীমিত রাখা হয়।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোবাইল গ্রাহকের সংখ্যা কয়েক কোটিতে পৌঁছেছে। তবে এখনো একটি বড় জনগোষ্ঠী নিয়মিত ডিজিটাল সেবার বাইরে রয়েছে। নতুন সিমের ওপর কর প্রত্যাহার করা হলে এই জনগোষ্ঠীকে ডিজিটাল নেটওয়ার্কে যুক্ত করার সুযোগ বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকার আইসিটিকে সর্বাধিক অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। এজন্য এ খাতে ট্যাক্স, ভ্যাট ও লাইসেন্সিং নীতিমালা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারের ধারণা, করের বোঝা কমানো গেলে প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ এবং ডিজিটাল সেবার ব্যবহার বাড়বে।
সম্প্রতি বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমানে টেলিযোগাযোগ খাতে করের বোঝা প্রায় ৫০ শতাংশ এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রায় ২৫ শতাংশ। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় এই হার অনেক বেশি। ফলে খাতটির বিকাশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। এ কারণে সরকার ধাপে ধাপে কর কাঠামোকে আরও যৌক্তিক করার উদ্যোগ নিয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সাধারণ মানুষের কাছে মোবাইল সেবা আরও সহজলভ্য করার লক্ষ্যে প্রতিটি মোবাইল সিমের ওপর আরোপিত ৩০০ টাকার কর সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে নতুন গ্রাহকরা কম খরচে সিম কিনতে পারবেন এবং মোবাইল সংযোগ গ্রহণ আরও সহজ হবে।
তবে এই সিদ্ধান্তের একটি আর্থিক প্রভাবও রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাব অনুযায়ী, নতুন সিমের ওপর আরোপিত ৩০০ টাকার কর তুলে দিলে আগামী অর্থবছরে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার রাজস্ব আয় কমতে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলছে, সিম কর প্রত্যাহার করা হলে নতুন গ্রাহক যুক্ত হওয়ার হার বাড়তে পারে। একই সঙ্গে মোবাইল ফোন অপারেটরদের গ্রাহকভিত্তিও সম্প্রসারিত হবে। ফলে ডিজিটাল আর্থিক সেবা, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন শিক্ষা, ই-কমার্স এবং সরকারি ডিজিটাল সেবার ব্যবহার আরও বাড়বে। তবে এর বিপরীতে স্বল্পমেয়াদে সরকারের রাজস্ব আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি স্বল্পমেয়াদে রাজস্ব কমিয়ে দিতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেলে সরকারের জন্য নতুন রাজস্বের উৎসও তৈরি হতে পারে। কারণ বেশি সংখ্যক মানুষ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হলে লেনদেন, ব্যবসা এবং সেবার পরিধি বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি এখন শুধু যোগাযোগের বিষয় নয়; এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আর্থিক সেবা এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে সিম কর প্রত্যাহারকে কেবল রাজস্ব কমার দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবের আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, সরকারের কর বা শুল্ক ছাড়ের সিদ্ধান্তকে শুধু তাৎক্ষণিক রাজস্ব ক্ষতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে হবে না। নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে কর প্রত্যাহার বা হ্রাস বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিভিন্ন ধরনের সেবা কার্যক্রমকে উৎসাহিত করে। ফলে স্বল্পমেয়াদে রাজস্ব কমলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কর ছাড়ের ফলে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়তে পারে, নতুন ব্যবসা গড়ে উঠতে পারে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও), ফ্রিল্যান্সিংসহ প্রযুক্তিনির্ভর খাতগুলো এ ধরনের সুবিধা থেকে উপকৃত হতে পারে।
মোস্তাফিজুর রহমান আরো বলেন, কর ছাড় দিলেই বিনিয়োগকারীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিনিয়োগে ঝাঁপিয়ে পড়বেন, বিষয়টি এমন নয়। এর সুফল পেতে হলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিবেশ, সুশাসন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ব্যবসাবান্ধব নীতিমালা, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চাহিদাসহ বিভিন্ন অনুষঙ্গও অনুকূল থাকতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে, উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে কর ছাড়ের কারণে প্রাথমিকভাবে যে রাজস্ব হারাতে হয়, পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির মাধ্যমে তার চেয়েও বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব হয়। তবে এর জন্য কর ছাড়ের পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করাও জরুরি।
এদিকে সিম কর প্রত্যাহারের প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে দেশের মোবাইল অপারেটরগুলো। তাদের মতে, এ সিদ্ধান্ত নতুন গ্রাহক বৃদ্ধির পাশাপাশি টেলিযোগাযোগ খাতের সম্প্রসারণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন এমটবের মহাসচিব লে. কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার বলেন, সিম কর প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের সম্প্রসারণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বর্তমানে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এখনো টেলিযোগাযোগ সেবার আওতার বাইরে রয়েছে। নতুন এই উদ্যোগ তাদের ডিজিটাল সংযুক্তির সুযোগ বাড়াবে এবং দেশের ডিজিটাল অগ্রযাত্রাকে আরও গতিশীল করবে।
তিনি আরো বলেন, খাতটির দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকারের উচিত আরও কিছু নীতিগত বিষয় পুনর্বিবেচনা করা। ডিজিটাল রূপান্তরের গতি বাড়াতে কর ও নীতিগত কাঠামোয় প্রয়োজনীয় সংস্কারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
এএইচ/এমআর




