বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬, ঢাকা

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে ট্রাম্প কি তার লক্ষ্য অর্জন করেছেন? 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৭ জুন ২০২৬, ০৯:৩৮ পিএম

শেয়ার করুন:

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে ট্রাম্প কি তার লক্ষ্য অর্জন করেছেন? 

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর বিমান হামলা চালানোর পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা থেকে শুরু করে তেহরান যাতে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে তা নিশ্চিত করা পর্যন্ত একাধিক লক্ষ্যমাত্রা তুলে ধরেন।

তবে তিন মাসেরও বেশি সময় পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি প্রাথমিক শান্তিচুক্তি কার্যকর হওয়ার পর প্রশ্ন উঠেছে- ট্রাম্প কী তার লক্ষ্যগুলো অর্জন করেছেন?


বিজ্ঞাপন


ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন

যুদ্ধের আগে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের কাছেই ছিল সবচেয়ে বড় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ভান্ডার, যেখানে বিভিন্ন ধরনের ২৫০০ থেকে ৬০০০ ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। এগুলোর মধ্যে কয়েকটি ২০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত পাল্লার হওয়ায় ইসরায়েলে পৌঁছাতে সক্ষম ছিল এবং কয়েকটিতে ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্র ছিল, যা প্রতিরোধ করা আরও কঠিন।

অন্যদিকে ইরান দূরপাল্লার ড্রোনেরও একটি প্রধান নির্মাতা— বিশেষ করে একমুখী আত্মঘাতী শাহেদ ড্রোন, যা রাশিয়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে এবং ইসরায়েল ও মার্কিন মিক্রদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে তেহরান।


বিজ্ঞাপন


যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রায় এক মাস পর মার্কিন সূত্র রয়টার্সকে জানায়, ইরানের অস্ত্রাগারের এক-তৃতীয়াংশ ধ্বংস করা হয়েছে এবং আরও এক-তৃতীয়াংশ সম্ভবত ক্ষতিগ্রস্ত, ধ্বংস বা মাটির নিচে চাপা পড়েছে।

গত ১৪ মে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার কংগ্রেসকে জানান, ক্ষেপণাস্ত্র ও দূরপাল্লার ড্রোন নির্মাণ এবং মজুদ করার ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা কয়েক বছর পিছিয়ে গেছে। 

তিনি আরও দাবি করেন, যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র ও তার উপসাগরীয় মিত্ররা ১৫০০টিরও বেশি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৬০০০ ড্রোন প্রতিহত করেছে।

ইরানের কাছে কতগুলো ক্ষেপণাস্ত্র অবশিষ্ট আছে তা স্পষ্ট নয়, কিন্তু দেশটির এখনও মার্কিন মিত্রদের হামলার করার যথেষ্ঠ ক্ষমতা রয়েছে— সর্বশেষ ৬ জুন কুয়েত ও বাহরাইন এবং ৭ জুন ইসরায়েলের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় তেহরান। 

ইরানের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা হ্রাস

মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, তারা এই অঞ্চলে শক্তি প্রদর্শন বা মার্কিন অভিযানের জন্য হুমকি সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে ইরানের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা হ্রাস করেছে।

সেন্টকম কমান্ডার কুপার কংগ্রেসকে জানান, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের ১৬১টি নৌ জাহাজ ধ্বংস করেছে এবং দেশটির ৮২ শতাংশ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অকার্যকর করে দিয়েছে। 

তিনি আরও জানান, ইরানের বিমান বাহিনী, যারা যুদ্ধের আগে দৈনিক ১০০টি পর্যন্ত বিমান উড্ডয়ন করত, তারা এখন কোনো অভিযানই পরিচালনা করে না।

তা সত্ত্বেও, যুদ্ধ চলাকালীন স্পিডবোট, মাইন, ড্রোন এবং মিসাইল বোট ব্যবহার করে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে আটকে রেখে হরমুজ প্রণালী কার্যকরভাবে বন্ধ রাখতে সক্ষম হয়েছিল ইরান।

পারমাণবিক কর্মসূচি

ট্রাম্প বারবার বলেছেন, তার প্রধান লক্ষ্য হলো ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা। 

যদিও তেহরান ধারাবাহিকভাবে বলে আসছে, পারমানবিক বোমা তৈরির কোনো ইচ্ছা তাদের নেই এবং তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত। কিন্তু এই যুদ্ধ ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আনেনি। 

গত মাসে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা অনুমান করেছে, একটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে ইরানের এক বছরেরও কম সময় লাগবে— ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে ২০২৫ সালের জুনে হামলার পর তারা একই সময়সীমা নির্ধারণ করেছিল।

শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে কাঠামো চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি দুই দেশের আলোচকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে।

যদিও ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অবশ্যই দেশ থেকে বের করে নিতে হবে। তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি বলেছেন, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোনো অবস্থাতেই বিদেশে পাঠাবে না তেহরান।

ইরানি সমর্থিত গোষ্ঠী

গত ২ মার্চ হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরাক, লেবানন, গাজা ও ইয়েমেনে ইরানকে সেইসব সশস্ত্র প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র ও অর্থায়ন অব্যাহত রাখতে দেওয়া যাবে না, যাদের ওপর তারা কয়েক দশক ধরে শক্তি প্রদর্শন এবং নিজের শত্রুদের হয়রানি করার জন্য নির্ভর করে আসছে।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান ওই গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করার কোনো আগ্রহ দেখায়নি। কিন্তু মার্কিন সামরিক ও স্বাধীন মূল্যায়নে দেখা গেছে, ইরানের প্রক্সি নেটওয়ার্ক আগের চেয়ে অনেক কম কার্যকর।

যদিও যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে থেকেই ইরানি সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো ঝিমিয়ে পরে। কারণ ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের ভূখণ্ডে হামলার পর দেশটি গাজায় হামাসের অনেক শীর্ষ নেতা ও হাজার হাজার যোদ্ধাকে হত্যা করে এবং লেবাননেও হিজবুল্লাহ অনেক নেতৃত্বকে হত্যা করে। এঝাড়াও ২০২৪ সালে সিরিয়ায় সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের শাসনের পতনের সাথে সাথে হিজবুল্লাহকে পুনরায় রসদ সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হারায় ইরান। তবে নিষেধাজ্ঞা এবং ইরানের অর্থনৈতিক দুর্দশাও এই গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন করার ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়।

এর প্রমাণ পাওয়া যায় ইরান যুদ্ধে এই গোষ্ঠীগুলো বড় কোনো ভূমিকা পালন করেনি। হামাস তার গাজা ছিটমহল থেকে ইসরায়েলে হামলা চালায়নি, অন্যদিকে হুথিরা ইয়েমেন থেকে লোহিত সাগরের নৌচলাচলে উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাঘাত ঘটায়নি।

তবে ব্যতিক্রম ছিল হিজবুল্লাহ, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে ইরানে হামলা শুরু করার পর ২ মার্চ থেকে ইরানের পক্ষে ইসরায়েলে পাল্টা হামলা চালায় গোষ্ঠটি। জবাবে ইসরায়েল বিমান হামলা ও স্থল অভিযান শুরু করে, যা এখনো চলমান। এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত লেবাননে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ জন নিহত এবং ১২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। 

কুপার মে মাসে কংগ্রেসকে বলেছিলেন, প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে নির্ভরযোগ্যভাবে উন্নত অস্ত্র সরবরাহ করার ক্ষমতা ইরানের আর নেই, যদিও এর অর্থ কী তা তিনি নির্দিষ্ট করে বলেননি।

শাসন ​​পরিবর্তন

যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ট্রাম্প ইরানি বিক্ষোভকারীদেরকে তাদের শাসকদের উৎখাত করতে উৎসাহিত করেছিলেন এবং বলেছিলেন যে ২৮ ফেব্রুয়ারি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু ছিল সরকার দখলের জন্য তাদের ‘সবচেয়ে বড় সুযোগ’। 

৬ মার্চ তিনি বলেছিলেন, ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ এবং একজন নতুন, ‘গ্রহণযোগ্য’ নেতার আগমনের মাধ্যমেই কেবল এই যুদ্ধের অবসান ঘটবে।

যদিও এই যুদ্ধ ইরানের ধর্মতান্ত্রিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি তার লক্ষ্য অর্জন করেছেন। 

গত ২৯ মার্চ ট্রাম্প মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির স্থলাভিষিক্ত তার ছেলে মোজতবা খামেনি নেতৃত্বকে ‘একটি নতুন এবং আরও যুক্তিসঙ্গত শাসনব্যবস্থা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। 

তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানি নেতাদের ক্ষমতাচ্যুত করার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করা থেকে বিরত থেকেছেন তিনি।

সূত্র: রয়টার্স

এমএইচআর

 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর