বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুধু অস্ত্রের লড়াই ছিল না; এটি ছিল চিন্তা, চেতনা ও সংস্কৃতিরও সংগ্রাম। এ সংগ্রামে কলমকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন বহু কবি-সাহিত্যিক। তাদেরই অন্যতম প্রখ্যাত গীতিকার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলাম বাবু।
তিনি জামালপুর জেলার এক প্রত্যন্ত অঞ্চল মাদারগঞ্জ উপজেলায় ১৯৪৯ সালের ১৭ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। পিতৃনিবাস হেমড়াবাড়ি ও নানাবাড়ি চরনগর গ্রামেই তার শৈশব কেটেছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং স্বাধীনতাত্তর পুনরায় অধ্যবসায়, সাহিত্য ও সংগীত চর্চায় মনোনিবেশ করেন। রচনা করেন দেশাত্মবোধের জনপ্রিয় সব গান।
১৯৭৩ সালে তিনি বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনে গীতিকার হিসাবে তালিকাভুক্ত হন। এরপর একে একে লিখতে থাকেন দেশাত্মবোধক ও আধুনিক গান। যার মধ্যে ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’, ‘একটি বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার’, ‘দুই ভুবনের দুই বাসিন্দা’, ‘পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই’, ‘ডাকে পাখি খোল আঁখি’, ‘কাল সারা রাত ছিল স্বপ্নের রাত’, ‘আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে’, ‘কতো যে তোমাকে বেসেছি ভালো’ এমন অসংখ্য কালজয়ী গানের স্রষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলাম বাবু।
১৯৮২ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানের জন্য নির্মিত এটি কালজয়ী দেশাত্মবোধক গান। নজরুল ইসলাম বাবুর গীত রচনায়, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সুরে এবং সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে গানটি শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে নিবেদন করা হয়েছিল। এটি একটি আবেগঘন বিজয়ের গান, যা দেশের স্বাধীনতার প্রতি গভীর ভালোবাসার নির্দশন হিসেবে স্বীকৃত।
‘তারা আসবে চুপি চুপি’ এই চরণে মুক্তিযোদ্ধা শহীদদের আত্মা ফিরে আসার আকুতি ও বিজয়োল্লাস ফুটে উঠেছে। মূলত মুক্তিযোদ্ধাদের বিদেহী আত্মার প্রতি সম্মান জানানোর উদ্দেশ্যেই গানটি লেখা হয়েছিল। গানটির সৃষ্টির পেছনেও রয়েছে একটি আবেগঘন গল্প। সুরকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল তার সহযোদ্ধাদের শহীদ হওয়া এবং স্বাধীনতার পর একে একে মৃত্যুবরণে গভীরভাবে মর্মাহত ছিলেন। তাদের স্মরণে একটি দেশাত্মবোধক গান রচনার ইচ্ছা থেকেই তিনি নজরুল ইসলাম বাবুকে অনুপ্রাণিত করেন।
প্রথমে গানের পঙ্ক্তি ছিল ‘সব ক’টা দরজা খুলে দাও না’, যা পরে সুরকার বুলবুলের পরামর্শে ‘জানালা’ শব্দে পরিবর্তিত হয়। নজরুল ইসলাম বাবুর গানের কথাগুলোকে এক অমর সুরে রূপ দিয়েছিলেন জনপ্রিয় গীতিকার ও সুরকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। আর তাদের কথা ও সুরকে সবার হৃদয়স্পর্শী করে তুলেন জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন।
নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে সাদা-কালো বিটিভির পর্দায় এ গানটি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হত। এমনকি বাংলাদেশ টেলিভিশনের সংবাদ ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সূচনাতেও এই সুর ব্যবহৃত হয়েছে। গীতিকার তার গানে মানুষের অন্তরের জানালা খুলে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগ ও বীরত্বের কথা তুলে ধরেছেন। সবচেয়ে গর্বের কথা হলো এ গানের তিন গুণিজনই পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘একুশে পদক’।
কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৮৪ সালে, বিশিষ্ট গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১০ সালে এবং সংগীতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে নজরুল ইসলাম বাবু নন্দিত এ গীতিকার মৃত্যুর ৩১ বছর পরে ২০২২ সালে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি স্বরূপ ‘একুশে পদক’ লাভ করেন।
এ ছাড়া নজরুল ইসলাম বাবু জীবনদ্দশায় পেয়েছেন আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক। ১৯৯১ সালে ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’ চলচ্চিত্রের গীত রচনার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। ২০১৭ সালে তাকে নিয়ে প্রকাশিত হয় স্মারকগ্রন্থ, যেখানে তার জীবন ও কর্ম নিয়ে বিভিন্ন স্মৃতিচারণ স্থান পেয়েছে।
১৯৯০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর গীতিকার নজরুল ইসলাম বাবু পরলোকগমন বিশেষ করে স্বাধীনতা ও বিজয়ের মাসে তার গান নতুন করে শ্রোতাদের হৃদয়ে আজো নাড়া দেয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছর পেরিয়ে গেলেও এসব দেশাত্মবোধক গান নতুন প্রজন্মের মাঝে স্বাধীনতার চেতনা জাগ্রত করে। আগামি প্রজন্ম এ গানগুলোর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের শিক্ষা লাভ করবে।
কেকে/ এমএস