রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় প্রকাশ্যে ছিনতাই, হত্যা, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, মাদক কারবার, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চলছেই। প্রতিনিয়তই এমন সব ঘটনা ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একের পর এক অভিযান চালালেও অপরাধীদের দমানো যাচ্ছে না।
গতকালও এ এলাকায় বিকাশ এজেন্টকে কুপিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনায় অপরাধীদের ধরতে অভিযানের সময় পুলিশের দুই কর্মকর্তাকে কুপিয়ে আহত করা হয়েছে। এমন অবস্থায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তারা এসব ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানান।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ে পুলিশও কঠোর ভূমিকা পালন করছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বাড়ানোর অংশ হিসেবে বসিলায় অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্পও স্থাপন করেছে ডিএমপি।
বিকাশ এজেন্টকে কুপিয়ে ছিনতাই, পুলিশের ওপরও হামলা
আদাবরে বিকাশ এজেন্টকে কুপিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনায় অপরাধীদের ধরতে অভিযানের সময় পুলিশের দুই কর্মকর্তাকে কুপিয়ে আহত করা হয়েছে; এ সময় পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছেন সন্দেহভাজন দুই ব্যক্তি।
ওসি-এসআই আহত, আটক ৪
পুলিশ জানায়, ছিনতাইকারীদের চাপাতির আঘাতে আদাবর থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম এবং এসআই তরুণ আহত হয়েছেন। ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয়েছে রুবেল, কাশেম, আমির ও জয় নামের চারজনকে। তাদের মধ্যে আমির ও রুবেল পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছেন।
এর আগে বেলা ১১টার দিকে শেখেরটেক ৭ নম্বর সড়কের মাথায় এক ‘বিকাশ’ এজেন্টকে কুপিয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকা লুট করে ছিনতাইকারীরা। বিকাশ এজেন্ট শফিকুল ইসলাম বর্তমানে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর) বা পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
শফিকুলের বড় ভাই মুসলিম হোসেন বলেন, দুইজন যুবক আমার ভাইয়ের দোকানে এসে দোকানের ক্যাশে হাত দিয়ে জোর করে টাকা নেওয়ার চেষ্টা করলে ভাই প্রথমে বাধা দেয়। তখন তাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে ক্যাশে থাকা সব টাকা নিয়ে যায়। ক্যাশে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা ছিল বলে শফিকুলের কাছ থেকে জেনেছেন তার ভাই মুসলিম।
আতঙ্কিত স্থানীরা, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
মোহাম্মদপুর থানার বসিলা বড় মসজিদের খতিব আবু তাহের গণমাধ্যমকে বলেন, অটোরিকশা ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ ছিনতাইয়ের ঘটনা বাড়ছে। কিছু অসাধু চালক রাতে ছিনতাইয়ে জড়িত থাকলেও দিনে স্বাভাবিকভাবে অটোরিকশা চালিয়ে নিজেদের আড়াল করে রাখছে। এ কারণে রাতের বেলায় অটোরিকশাগুলোর ওপর নজরদারি জানানো হয়।
স্থানীয়রা বলেন, মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ তিন রাস্তার মোড়ে গভীর রাত পর্যন্ত খোলা থাকা কিছু দোকান অপরাধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এসব দোকান রাত ১২টার মধ্যে বন্ধ করার দাবি তোলা হয়।
অনেকে অভিযোগ করেন এলাকায় মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও অশ্লীল কর্মকাণ্ডে জড়িতদের তালিকা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে দেওয়া হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। গ্রেপ্তার হলেও অল্প সময়ের মধ্যে জামিনে বের হয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে। অপরাধীদের অন্তত ছয় মাস পর্যন্ত জামিন না দেওয়ার মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।
অপরাধ শূন্যের কোটায় নামাতে চায় পুলিশ
যদিও মোহাম্মদপুর এলাকার অপরাধ শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে চায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ লক্ষ্যে বসিলায় অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। ক্যাম্প চালুর পর বসিলা, ঢাকা উদ্যান, চাঁদ উদ্যান ও নবীনগর হাউজিং এলাকায় নিয়মিত চেকপোস্ট ও বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এরপরও থামছে না এ এলাকার অপরাধপ্রবণতা।
আদাবর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হাফিজুর রহমান বলেন, দুর্বৃত্তরা টাকাসহ মোবাইল ফোনও নিয়ে গেছে। আশপাশের সিসি ভিডিও সংগ্রহ করা হয়েছে। অপরাধীদের প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা গেছে। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের এডিসি ফজলুর রহমান বলেন, আসামি ধরতে গিয়ে ঢাকা উদ্যানের কাছে তাদের একটি দল আক্রান্ত হয়েছে। আসামিরা পুলিশ দেখেও হামলা করেছে। তারা ওসি ও একজন এসআইয়ের ওপর হামলা চালিয়েছে। এ ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখানে সংঘটিত অপরাধ কমাতে প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগে থেইে এ এলাকায় অপরাধীরা অবাধ্য। যখন-তখন তারা চাপাতি-ছুরি নিয়ে ছিনতাইয়ে নেমে পড়ে। মানুষের ওপর হামলা করে। একটা ভয়ঙ্কর পরিবেশ সেখানে বিরাজ করছে। মানুষের মধ্যে সব সময়ই আতঙ্ক ভর করে।
তারা বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রায়ই অভিযান চালায়। কিছু অপরাধীকে আটক করে। কিন্তু এর মূল হোতারা বাইরে থেকে যায়। সাড়াশি অভিযানের মাধ্যমে তাদেরকেও আইনের আওতায় আনতে হবে। সরকারকে বিষয়টি নিয়ে আলাদাভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে।
কেকে/ এমএস