বিদেশে উচ্চশিক্ষা
স্কলারশিপে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে চাইলে জানতে হবে যেসব বিষয়ে © সংগৃহীত
বর্তমানে প্রায় সব শিক্ষার্থীই স্বপ্ন দেখে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পড়তে যাওয়ার। এর মধ্যে কেউ চায় দেশের বাইরে গিয়ে স্নাতক, কেউ স্নাতকোত্তর, কেউবা আবার সরাসরি পিএইচডি বা ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করতে। বর্তমানে বিদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নজরকাড়া সব স্কলারশিপের সুযোগ প্রদান করে থাকে। যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ফুল-ফান্ডেড বা আংশিক অর্থায়নের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে সক্ষম হয়। এটি শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যাদের বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ নেই তারা এসব স্কলারশিপের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়ে থাকে।
আজকে আমরা জানব বিদেশে উচ্চশিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে স্কলারশিপ পেতে যেসব বিষয় জানা খুবই দরকারি।
১. উচ্চশিক্ষায় স্কলারশিপ প্রদানকারী দেশসমূহ
প্রথমত আপনাকে উচ্চশিক্ষায় স্কলারশিপ প্রদানকারী দেশ সম্পর্কে জানতে হবে। বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের কাছে জনপ্রিয় কয়েকটি দেশ হলো:
*যুক্তরাষ্ট্র;
*যুক্তরাজ্য;
*জার্মানি;
*কানাডা;
*অস্ট্রেলিয়া;
*স্পেন;
*ইতালি;
*আয়ারল্যান্ড;
*জাপান;
*রাশিয়া;
*মালয়েশিয়া;
উক্ত দেশগুলো ছাড়াও বিশ্বের আরও অনেক দেশ রয়েছে যারা উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য স্কলারশিপ প্রদান করে থাকে। যেমন হাঙ্গেরি, চীন, লিথুয়ানিয়া, তুরস্ক, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর ইত্যাদি। এসব দেশের অধিকাংশ স্কলারশিপে সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়, সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি স্কলারশিপ পোর্টাল অথবা দূতাবাসের মাধ্যমে আবেদন করা যায়। কিছু সরকারি বা দ্বিপাক্ষিক স্কলারশিপের ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মনোনয়ন প্রয়োজন হতে পারে।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রের যেসব বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চশিক্ষায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা দেয়
২. বিদেশে উচ্চশিক্ষায় বৃত্তির খোঁজ
স্কলারশিপ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। দেশভেদে ও বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে স্কলারশিপের যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়। তাই আপনাকে আগে থেকেই ঠিক করে নিতে হবে কোন দেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তির জন্য আবেদন করতে চান। এক্ষেত্রে আপনাকে সাহায্য করবে বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট এবং সরকারি শিক্ষা বিষয়ক পোর্টালগুলো।
এ ছাড়াও বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের ওয়েবসাইটে নিয়মিত স্কলারশিপ সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা হয়। সেখানে প্রতি বছরের বিভিন্ন বৃত্তির তথ্য পাওয়া যায়। আপনি চাইলে সরাসরি দূতাবাস বা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারেন। পাশাপাশি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ওয়েবসাইটেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বৃত্তির তথ্য প্রকাশ করা হয়ে থাকে।
৩. প্রয়োজনীয় নথিপত্র
প্রত্যেক দেশের বিশ্ববিদ্যালয় তাদের স্কলারশিপে আবেদনের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয়। আপনাকে ওই সময়ের মধ্যেই প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ অনলাইনে আবেদন করতে হবে। সময়সীমা অতিক্রম করলে সাধারণত আবেদন গ্রহণ করা হয় না। তাই আগে থেকেই প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত করে রাখা জরুরি। যেমন:
*পাসপোর্টের কপি;
*স্নাতক পর্যায়ের স্কলারশিপের জন্য উচ্চ মাধ্যমিকের সার্টিফিকেট ও ট্রান্সক্রিপ্ট;
*স্নাতকোত্তর পর্যায়ের স্কলারশিপের জন্য স্নাতক ডিগ্রির সার্টিফিকেট ও ট্রান্সক্রিপ্ট;
*পিএইচডি পর্যায়ের স্কলারশিপের জন্য স্নাতকোত্তর ডিগ্রির সার্টিফিকেট ও ট্রান্সক্রিপ্ট;
*রিকমেন্ডেশন লেটার (Recommendation Letter);
*ভাষাগত দক্ষতার সনদ;
*সিভি বা রেজুমে;
*বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম ও অর্জনের সনদপত্র;
আরও পড়ুন: আইইএলটিএস ছাড়াই পড়ুন পোল্যান্ডে, রয়েছে নানা স্কলারশিপ
৪. ভাষাদক্ষতা পরীক্ষা
বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে অধিকাংশ উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষাদক্ষতার প্রমাণ দেখাতে হয়। এটিকে বিদেশে উচ্চশিক্ষার আবেদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়াও কিছু ক্ষেত্রে মান্ডারিন, জার্মান, ফরাসি, আরবি কিংবা জাপানি ভাষার দক্ষতা প্রয়োজন হতে পারে।
ইংরেজি ভাষার দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় IELTS, TOEFL, PTE অথবা Duolingo English Test গ্রহণ করে থাকে। অন্যদিকে GRE ও GMAT হলো উচ্চশিক্ষার নির্দিষ্ট কিছু প্রোগ্রামে ভর্তির জন্য ব্যবহৃত পৃথক ভর্তি পরীক্ষা।
আপনার ইংরেজি দক্ষতা বাড়াতে নিয়মিত Speaking, Writing, Reading ও Listening অনুশীলন করা প্রয়োজন। সঠিক প্রস্তুতি গ্রহণ শেষে ব্রিটিশ কাউন্সিল, আইডিপি (IDP) অথবা অন্যান্য অনুমোদিত পরীক্ষাকেন্দ্রে পরীক্ষা দেওয়া যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে প্রয়োজনীয় IELTS বা সমমানের স্কোর ভিন্ন হয়ে থাকে। সাধারণত ৬.০ থেকে ৭.৫ বা তার বেশি স্কোর প্রয়োজন হতে পারে।
৫. অ্যাকাডেমিক ফলাফল
বিদেশে স্কলারশিপ পাওয়ার ক্ষেত্রে অ্যাকাডেমিক ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মোটামুটি ভালো একটি সিজিপিএ থাকলে স্কলারশিপ পাওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। তবে অ্যাকাডেমিক ফলাফলের পাশাপাশি গবেষণা অভিজ্ঞতা, ভাষাগত দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ ও অন্যান্য অর্জনও মূল্যায়ন করা হয়।
আরও পড়ুন: এক আবেদনেই ইউরোপ সফর: শেনজেন ভিসার আদ্যোপান্ত
৬. স্টেটমেন্ট অব পারপাস (SOP)
অনেকেই বলে থাকেন, স্কলারশিপ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে সবকিছুর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো SOP বা Statement of Purpose। এমন অনেক শিক্ষার্থী আছেন যাদের সিজিপিএ বা ভাষা পরীক্ষার স্কোর তুলনামূলক কম হলেও শক্তিশালী SOP-এর মাধ্যমে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেয়েছেন। তাই কীভাবে একটি ভালো SOP তৈরি করা যায় তা নিয়ে আগে থেকেই ভাবনা-চিন্তা করুন। নিজের অ্যাকাডেমিক লক্ষ্য, গবেষণার আগ্রহ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং অর্জনগুলো সুন্দরভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করুন।
৭. রিকমেন্ডেশন লেটার
স্কলারশিপ পাওয়ার জন্য Recommendation Letter একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বর্তমানে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে রেফারেন্স জমা দিতে হয়। সাধারণত শিক্ষক, গবেষণা সুপারভাইজার অথবা আবেদনকারীর কাজ সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন এমন কোনো অ্যাকাডেমিক ব্যক্তির কাছ থেকে Recommendation Letter নেওয়া উত্তম। একটি শক্তিশালী Recommendation Letter আবেদনকারীর যোগ্যতা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে ভর্তি কমিটিকে ইতিবাচক ধারণা দিতে সাহায্য করে।
আরও পড়ুন: রোডস স্কলারশিপে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে স্নাতকোত্তর-পিএইচডির সুযোগ, করুন আবেদন
৮. প্রকাশনা
যদি আপনি গবেষণাভিত্তিক মাস্টার্স কিংবা পিএইচডি করতে চান, তবে গবেষণা অভিজ্ঞতা এবং গবেষণা প্রকাশনা অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডিতে আবেদনের জন্য গবেষণা প্রকাশনা বাধ্যতামূলক নয়। যদি আপনার কোনো গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত থাকে, তাহলে অবশ্যই তা মানসম্পন্ন ও স্বীকৃত জার্নালে প্রকাশিত হওয়া উচিত। কোনো অপরিচিত বা নিম্নমানের জার্নাল কিংবা শুধু অর্থের বিনিময়ে প্রকাশনা করে এমন জার্নালে প্রকাশিত প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাধারণত কম গুরুত্ব পায়। তাই গবেষণা প্রকাশনার ক্ষেত্রে জার্নালের মানের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।