
দুর্যোগে সর্তকবার্তা মানলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমবে
বাংলাদেশে প্রতিবছর মৌসুমি ও আকস্মিক বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, তাপদাহ, শৈত্যপ্রবাহ, অতিবৃষ্টি, খরা, নদীভাঙন ও ভূমিকম্পসহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হয়। উপকূলীয় অঞ্চলে পানি ও মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। একই সঙ্গে বজ্রপাতেও প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। তবে ঝড়, বন্যা, অতিবৃষ্টি ও বজ্রপাতের মতো দুর্যোগে আগাম সতর্কবার্তা প্রচার এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।বৃহস্পতিবার (১১ জুন) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ‘দুর্যোগ বিষয়ক সতর্কতা’ শীর্ষক এক মিডিয়া সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। সংলাপটির আয়োজন করে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ।বক্তারা বলেন, দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা যথাযথভাবে মেনে চললে ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সময়মতো আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তা পৌঁছে দিতে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা এবং সংবাদমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আশরাফ উদ্দিন বলেন, ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। তিনি বলেন, বর্তমানে সংবাদমাধ্যম দ্রুততার সঙ্গে মানুষের কাছে দুর্যোগের আগাম বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে যেখানে লাখো মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল, সেখানে এখন সেই সংখ্যা ২০-এর নিচে নেমে এসেছে—যা আগাম সতর্কবার্তার কার্যকারিতার বড় উদাহরণ। তিনি আরও বলেন, কৃষি ফসল ও গবাদিপশুর ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগাম সতর্কবার্তাকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে। পাশাপাশি মানুষ যেন সহজ ভাষায় সতর্কবার্তা বুঝতে পারে এবং আশ্রয়কেন্দ্রে গেলে তাদের সম্পদের নিরাপত্তা নিয়েও আস্থা পায়—সে বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের ১৩তম দুর্যোগপ্রবণ দেশ হলেও সম্মিলিত উদ্যোগে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে বহুমুখী ব্যবহারযোগ্য আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে, যেগুলো সাধারণ সময়ে বিদ্যালয় এবং দুর্যোগকালে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এসব কেন্দ্রে গবাদিপশু রাখার ব্যবস্থা, রান্নার সুবিধা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য উপযোগী শৌচাগারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে অনেকেই সম্পদ ও গবাদিপশুর নিরাপত্তার উদ্বেগে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে অনাগ্রহ দেখান—তাই এসব সুবিধার তথ্য আরও ব্যাপকভাবে প্রচার করা প্রয়োজন।বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, বন্যার সময় সংবাদমাধ্যম তথ্য জানতে বেশি যোগাযোগ করে। তবে বন্যার আগেই নিয়মিতভাবে আগাম সতর্কবার্তা প্রচার করা গেলে মানুষ প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় পায়।দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পরিচালক (প্রশাসন) ও যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ নাজমুল আবেদীন বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের আগাম সতর্কবার্তা পাওয়ার পর আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষকে নেওয়ার কাজ করে তাঁর মন্ত্রণালয়। এ কাজে প্রায় ৮০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক নিয়োজিত রয়েছেন। তবে মানুষ অনেক সময় সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত তথ্যের ওপর বেশি আস্থা রাখে। তাই আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা এবং আগাম সতর্কবার্তা প্রচারে সংবাদমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোস বলেন, দুর্যোগের প্রভাব সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না। নারী, কিশোরী, বয়স্ক ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই তাদের জন্য দুর্যোগপূর্ব সতর্কবার্তা ও দুর্যোগ-পরবর্তী সেবার নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি বজ্রপাতের আগাম সতর্কবার্তা ও করণীয় বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।স্বাগত বক্তব্যে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মোমেনুল ইসলাম বলেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, আগাম সতর্কবার্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত তথ্য নিয়মিতভাবে জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, সঠিক তথ্য যেমন প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সহায়তা করে, তেমনি ভুয়া তথ্য ও অপতথ্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই সহজ ও বোধগম্য ভাষায় নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রচারে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।মিডিয়া সংলাপে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ৫০ জন সাংবাদিক অংশগ্রহণ করেন।